চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই, ২০২৪

অবৈধ মাছ শিকারিদের শিকল পরাবে কে?

মোহাম্মদ আলী 

১৭ মে, ২০২৩ | ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ

হালদার অবৈধ মাছ শিকারিদের শিকল পরাবে কে? এ প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে নদীর দুই ধারে মানুষের। প্রতিদিন নদীতে নামছে শিকারিরা। শিকার করছে রুই জাতীয়সহ বিভিন্ন জাতের মাছ। প্রশাসন ও নৌ-পুলিশের একের পর এক অভিযানেও থামানো যাচ্ছে না তাদের।

 

প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ হালদা নদী থেকে সারাবছরই মাছ শিকারে সরকারি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নদীতে ফেলা যাবে না কোন ধরনের জাল। চালানো যাবে না ইঞ্জিনচালিত নৌকাও। এতসব নিষেধাজ্ঞার পরও হালদা মোহনা কচুখাইন, মোহরা, মাদার্শা এলাকা থেকে উজানে ছিপাতলী ও নাঙ্গলমোড়া পর্যন্ত দিনে-রাতে যে কোন সময় তৎপর থাকে অসাধু মাছ শিকারিরা। এর মধ্যে হালদার কিছু কিছু এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে মা মাছ শিকারিদের আনাগোনা এতই বেড়েছে, একের পর এক অভিযানের পরও তাদের থামানো যাচ্ছে না। ডিম সংগ্রহকারীদের অভিযোগ, এ বছর নদীর অবস্থা তেমন ভাল না। একদিকে সাগরের লবণ পানির আগ্রাসন, অপরদিকে মাছ শিকারিদের উৎপাতে হুমকির মুখে পড়েছে রুই জাতীয় (রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউশ) মাছের প্রজনন। প্রজননের আগে নদীতে মা মাছের আনাগোনা বাড়ে। তাতে চোখ পড়ে মাছ শিকারিদের। তাদের পাশাপাশি নদীতে নামছে অসাধু কিছু জেলেও। তাই মাছ শিকারিদের উৎপাতে অতিষ্ঠ নদীর দুই পাড়ের বাসিন্দা ও ডিম সংগ্রহকারীরা। হালদার ডিম সংগ্রহকারীরা জানায়, সাধারণত হালদা নদীতে হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলা প্রশাসন, নৌ-পুলিশ, আইডিএফ স্বেচ্ছাসেবক ও নদীর দুই পাড়ের জনপ্রতিনিধিরা অবৈধভাবে মাছ শিকারিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে থাকেন। এজন্য ২০১৮ সাল থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে আইডিএফ’র একটি স্পিড বোট। এছাড়াও একই সংস্থার জনবল প্রশাসন ও নৌ পুলিশকে সহযোগিতা দিয়ে থাকেন।

 

হালদায় অভিযান প্রসঙ্গে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শাহিদুল আলম দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘হালদায় এখন রুই জাতীয় মাছের প্রজননের সময়। এ সময়ে নদীতে মা মাছের আনাগোনা বাড়ে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে মাছ শিকারিরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাই প্রশাসনও এ সময়ে নিয়মিত টহল, মনিটরিং ও অভিযান জোরদার করে। নদীর তীরবর্তী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের এ কাজে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। আইডিএফ’র স্পিডবোট ও লোকবলের সহযোগিতা নিয়ে আমিও হালদার অবৈধ মাছ শিকারিদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছি।’

 

বেসরকারি সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (আইডিএফ) নির্বাহী পরিচালক জহিরুল আলম দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘হালদার অবৈধ মাছ শিকারিদের শনাক্ত করতে হালদা পাড়ে সিসি ক্যামেরা বসিয়েছে আইডিএফ। মা মাছ রক্ষায় আইডিএফ’র রয়েছে নিজস্ব লোকবলও। তাছাড়াও তাৎক্ষণিক অভিযানের জন্য রয়েছে একটি স্পিড বোট। এটি দিয়ে প্রশাসনকে সার্বক্ষণিক অভিযান পরিচালনায় সহযোগিতা দেওয়া হয়।’

 

এদিকে ২০২০ সাল থেকে হালদা নদীতে কার্যক্রম শুরু করে নৌ পুলিশ। এজন্য হাটহাজারীর উত্তর মাদার্শা রামদাশ মুন্সির হাটে বসানো হয়েছে অস্থায়ী নৌ-পুলিশ ক্যাম্প। সেখান থেকে হালদায় অবৈধ মাছ শিকারিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এছাড়া সদরঘাট নৌথানা থেকেও সরাসরি অভিযান পরিচালনা করা হয়।

 

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নৌ-পুলিশের সদরঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ একরাম উল্লাহ দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘২০২২ সালের এপ্রিল থেকে চলতি ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত হালদা নদীতে দেড় শতাধিক অভিযান পরিচালনা করে ১৯ লাখ ৩১ হাজার ৫০০ বর্গমিটার অবৈধ জাল উদ্ধার করা হয়। এসব জালের বাজার মূল্য আনুমানিক ১ কোটি ৬০ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। অভিযানের পরপরই অবৈধ উদ্ধারকৃত জাল পুড়িয়ে ফেলা হয়। এছাড়া অভিযানে বড়শি, ঠেলাজাল উদ্ধার, নৌকা ও ট্রলার আটক করা হয়। এ সংক্রান্ত একটি মামলা ও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।’

 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিচার্স ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘হালদা সংরক্ষণে অন্যতম সমস্যা মা মাছ শিকার। ইতোমধ্যে মা মাছ রক্ষায় আইডিএফ’র সহযোগিতায় নদীর দুইপাড়ে স্কুল ও মসজিদ-মন্দিরে সচেতনতামূলক সভা করেছি। কিন্তু তেমন একটা সফলতা আসেনি। এখনো নদীতে অভিযানে নামলে প্রশাসন ও নৌপুলিশ প্রচুর পরিমাণের অবৈধ জাল উদ্ধার করে। ডিমসংগ্রহকারীরা নদীর প্রজনন থেকে উপকৃত হয়। তাদেরকে এ কাজে সম্পৃক্ত হতে হবে বেশি। এ ব্যাপারে প্রশাসন উদ্যোগ নিতে পারে।’

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট