চট্টগ্রাম শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০২৪

মৎস্য সপ্তাহ ২০২৩ ও মৎস্য খাতে স্মার্ট প্রযুক্তি

অনলাইন ডেস্ক

২৫ জুলাই, ২০২৩ | ১১:৫৩ অপরাহ্ণ

‘নিরাপদ মাছে ভরব দেশ, গড়ব স্মার্ট বাংলাদেশ’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে গতকাল ২৪ থেকে ৩০ জুলাই দেশব্যাপী মৎস্য সপ্তাহ উদযাপিত হচ্ছে।

মৎস্য সপ্তাহের এবারকার অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সড়ক রেলি, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বঙ্গভবনের পুকুরে পোনা অবমুক্তি, কর্মশালা ইত্যাদি। বিজ্ঞানভিত্তিক মাছ চাষে উদ্বুদ্ধকরণসহ স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে মৎস্য খাতের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা সম্পর্কে জনগণকে অবহিতকরণ, মৎস্য চাষ ও উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় আধুনিক ও ডিজিটাল যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সামগ্রিকভাবে বিষয়টিকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়াই মৎস্য সপ্তাহের মূল লক্ষ্য।

দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও রপ্তানি আয়ে মৎস্য খাতের অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। প্রাণিজ আমিষের ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে। তাছাড়া, দেশের ১৪ লাখ নারীসহ জনসংখ্যার ১২ শতাংশের বেশি অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করে যাচ্ছে। ইনস্টিটিউট থেকে ইতিমধ্যে মৎস্য চাষ ও ব্যবস্থাপনা-বিষয়ক ৭৫টি লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং উদ্ভাবিত প্রযুক্তি মৎস্য অধিদপ্তর ও বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের ফলে সাম্প্রতিক কালে দেশে মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইনস্টিটিউট থেকে উদ্ভাবিত এসব প্রযুক্তির মধ্যে বিপন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ সংরক্ষণ ও চাষ, কই মাছের রোগ নিরাময়ে ভ্যাকসিন তৈরি, অ্যাকোয়াপনিক পদ্ধতিতে স্বাস্থ্যসম্মত মাছ ও সবজি উৎপাদন, নোনা পানির চিত্রা ও দাতিনা মাছের পোনা উৎপাদন, অধিক উৎপাদনশীল বিএফআরআই সুবর্ণ রুই, তেলাপিয়া, কই, পাঙাশ, সরপুঁটি ও কালিবাউশ মাছের উন্নত জাত উদ্ভাবন, অপ্রচলিত মৎস্যসম্পদ যেমন কুচিয়া ও কাঁকড়ার পোনা উৎপাদন ও চাষ, মিঠা পানির ঝিনুকে ইমেজ মুক্তা উৎপাদন, সাগর উপকূলে সিউইড চাষ ও এর ব্যবহার, বিএফআরআই মেকানিক্যাল ফিশ ড্রায়ার ব্যবহারের মাধ্যমে গুণমানসম্পন্ন শুঁটকি মাছ উত্পাদন এবং ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সংরক্ষণে মা-ইলিশ ও জাটকা ধরা নিষিদ্ধকাল নির্ধারণ, ইলিশের ছয়টি অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি অন্যতম।

বাংলাদেশ বর্তমানে অর্ধশতাধিক দেশে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করছে। মানসম্মত মৎস্য ও মৎস্য পণ্য রপ্তানির লক্ষ্যে পরীক্ষার জন্য মৎস্য অধিদপ্তরের আওতায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় আন্তর্জাতিক মানের তিনটি মান নিয়ন্ত্রণ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মাছের আহরণোত্তর ক্ষতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে আমাদের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক পরিচর্যা ও বাজারজাতকরণের অভাবে মাছে শতকরা ৩০-৪০ ভাগ পুষ্টি কম পাওয়া যায়। সামুদ্রিক মৎম্যসম্পদের স্মার্ট ব্যবস্থাপনার অভাবে আমরা কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাচ্ছি না।

মৎস্য খাতে স্মার্ট প্রযুক্তি, যেমন—রিমোট কনট্রোল অপারেটেড ফিশ ফিডার, অটোমেটিক পদ্ধতিতে পানির গুণাগুণ নির্ণয়, স্মার্ট সেনসর, স্মার্ট আন্ডারওয়াটার ক্যামেরা, আইওটিভিত্তিক স্মার্ট মৎস্য খামার ব্যবস্থাপনা, রিমোট সেনসিং এবং জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগের পূর্বাভাস প্রদান ও দমন, রোবটিক্সের ব্যবহার ইত্যাদি অন্যতম। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে আমাদের কম সময় ও কম খরচে বেশি ফলন বৃদ্ধির জন্য এসব স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সমুদ্রতল/মুক্ত জলাশয় পর্যবেক্ষণ ও জরিপ, গবেষণা পরিচালনার জন্য বিভিন্ন ধরনের ডুবোযান, যেমন—Automated Underwater Vehicle (AUV), Remotely Operated Vehicle (ROV), Deep Submergence Vehicle (DSV) Gas Underwater Gliders (GUG) ব্যবহার করা যেতে পারে। বর্তমানে মুক্ত জলাশয়ে মাছের পরিভ্রমণ পথ, বাসস্থান, মৃত্যুহার ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের জন্য Fish Tagging প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া মৎস্য খাতে এআই পরিচালিত ড্রোন, ভিএমস (Vessel Monitoring System) প্রযুক্তি, ভিআর (Virtual Reality) ও এআর (Artificial Reality) প্রযুক্তির ব্যবহার এখন বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।

এসব প্রযুক্তির ব্যবহার দেশে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন অটোম্যাটিক ফিস ফিলেটিং মেশিন, অটোমেটিক ফিশ ইনস্পেকশন সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আমাদের মৎস্য প্রক্রিয়াজাত কারখানায় এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়। স্মার্ট বাজার ব্যবস্থাপনায়ও বিভিন্ন ধরনের অ্যাপস ও ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। অনুরূপভাবে, দেশের মত্স্যচাষি ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারমনস্ক ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। এতে মৎস্য খাতে আধুনিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে, মাছের উৎপাদন বাড়বে এবং অর্থনীতির ভিত মজবুত হবে।

লেখক: বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক।

 

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট