চট্টগ্রাম বুধবার, ২৪ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

ডেঙ্গু প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন মেডিকেল এন্টোমলজিস্টরা

অনলাইন ডেস্ক

২৪ জুলাই, ২০২৩ | ৭:৪২ অপরাহ্ণ

জনস্বাস্থ্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ও পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্য স্থির রেখে তখনই সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব যখন জনস্বাস্থ্যের সব গুরুত্বপূর্ণ শাখায় যথাযথ জ্ঞান অর্জন নিশ্চিত করা যায়। মানবদেহের অতি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন-হার্ট, কিডনি, ফুসফুস, মস্তিষ্ক, চোখ ইত্যাদি ছাড়া সুস্থ থাকা যেমন অসম্ভব, ঠিক তেমনি মেডিকেল এন্টোমলজির মতো এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ রেখে কীভাবে পাবলিক হেলথ শিক্ষা পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে?

গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে এডিস মশা ও এডিসবাহিত রোগ ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইয়ালো ফিভার, জিকা ভাইরাসের ভয়াবহতাসহ অনেক রোগ আমাদের সুস্থ জীবনযাপনে চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখা দিয়েছে। এসব রোগের কারণে অনেক প্রাণহানিও হয়েছে। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয়, এই মশা বা অন্য পোকামাকড়বাহিত রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অতি জরুরি যে বিষয়টি আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও তাৎপর্যের সঙ্গে পড়ানো ও গবেষণা করানোর কথা ছিল, তা এখনো পর্যন্ত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চালু তো দূরের কথা, অনেকে এর নামই জানে না।

অথচ ০.০৪ হেক্টর মাথাপিছু আবাদি জমির দেশে গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যশস্যে ১৩৩টি পোকামাকড়, ডাল ফসলে ৮৩টি, তৈলবীজ ফসলে ১২৫টি, আঁশ ফসলে ৭৬টি, চিনি ফসলে ৬৯টি, কন্দাল ফসলে ৩৯টি, সবজি ফসলে ১৯০টি, ফল ফসলে ৩১৩টি, মসলা ফসলে ৭৫টি, ফুলের ফসলে ৮৭টি, বনের গাছে ৫৪৬টি, মাদকদ্রব্য ও পানীয় ফসলে ৭১টিসহ অগণিত প্রকারের ইনসেকট পেস্টের হাত থেকে সুরক্ষা করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছেন প্লান্ট এন্টোমলজির গবেষকরা।

গরু-ছাগলের এন্ডো বা এক্টোপ্যারাসাইট দমন করে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন নিশ্চিত করেছে ভেটেরিনারি গবেষকরা। তাহলে মানুষের জন্য মশাবাহিত বা ভেক্টরবাহিত রোগ ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইয়ালো ফিভার প্রভৃতির উৎপত্তি, ট্রান্সমিশন, ইনকিউবিশন প্রতিরোধী ক্ষমতা বৃদ্ধি প্রভৃতির জন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে মেডিকেল এন্টোমলজি নামক বিষয়টি অন্তর্ভুক্তকরণ কতটা গুরুত্বের দাবি রাখে তা ভেবে দেখা দরকার।।

কোভিড-১৯ যেমন পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিয়েছে ভেক্টরবাহিত রোগকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া উচিত; ঠিক তেমনি মশাবাহিত ডেঙ্গুর চোখ রাঙানি বুঝিয়ে দিচ্ছে মেডিকেল এন্টোমলজির তাৎপর্য, গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা। দুই দশক ধরে মশক নিধনের জন্য যেসব পরামর্শক মহোদয়ের পরামর্শে কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তারা সবাই এক বাক্যে স্বীকার করবেন প্রাণিবিদ্যা বা প্লান্ট এন্টোমলজির চেয়ে পাবলিক হেলথে বিশেষ করে ভেক্টরবাহিত রোগের জন্য মেডিকেল এন্টোমলজির গুরুত্ব কতটুকু। দেশে আর্থসামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে যেমন নগরায়ণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনই বৃদ্ধি পেয়েছে শহুরে পোকামাকড়বাহিত রোগের প্রকোপ ও ভয়াবহতা। নগরায়ণের সব সুযোগ-সুবিধার মধ্যে এনথ্রোপোজেনিক হেমাটোফেগাস প্রাণী মশকেরও বংশবৃদ্ধি ও রোগ ছড়ানোর ক্ষমতাও যুগপৎভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

মশকসহ অন্যান্য ভেক্টর দমনে শুধু ক্ষতিকারক কীটনাশকের সর্বনাশা ব্যবহার পরিহার করে সমন্বিত বাহক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির উন্নততর ব্যবহার নিশ্চিত করতে দেশে শিগগির গড়ে তুলতে হবে অত্যাধুনিক গবেষণাগার। আর এ বিষয়ক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির বিকল্প নেই। আজ ডেঙ্গুর ভয়াবহতার জন্য মূলত আমরাই দায়ী। কারণ দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় অত্যন্ত উন্নত মানের ইনস্কেটেরিয়াম যেমন তৈরির অত্যাবশ্যকতা ছিল, তেমনি মশা ও মশার মধ্যে বেড়ে ওঠা ভয়ংকর ভাইরাসের সেরোটাইপ অনুযায়ী আক্রমণের তীব্রতার জন্য প্রয়োজনীয় জিনোম সিকুয়েনসিং করে মশার প্রতিরোধী হওয়ার লেভেলের ওপর ভিত্তি করে ব্যবস্থাপনার ধরন ও প্রয়োগ নির্ণয় করতে অবশ্যই মেডিকেল এন্টোমলজিস্টদের বিকল্প কিছু আছে বলে আমি মনে করি না।

আমাদের দেশে এডিস মশার দুই প্রজাতির মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়ায় বলে আমরা জানি। এরা এডিস এজিপ্টি ও এডিস এলবোপিকটস। এগুলো ছাড়াও অন্য কোনো প্রজাতি এই ভাইরাস বহন করছে কিনা তাও গবেষণার দাবি রাখে। স্ত্রী এডিস মশা যখন আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত পান করে ভাইরাস তার নিজের শরীরে গ্রহণ করে, তারপর এই ভাইরাসের একটি নির্দিষ্ট সময় মশকের শরীরে অতিবাহিত করে; যাকে আমরা ইনকিউবেশন পিরিয়ড বলে থাকি। ঠিক এই সময় ভাইরাসটি মশকের শরীরের সব শরীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যবহার করে নিজেকে শক্তিশালী করে।

এখন প্রশ্ন হলো পরিবেশের দূষণ বা পরিবর্তনের ফলে অথবা উপর্যুপরি কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মশক যখন তার শরীরবৃত্তীয় কার্যক্রমের পরিবর্তন ঘটিয়ে প্রতিরোধী হয়ে উঠছে; ঠিক তখন তার ভেতর বেড়ে ওঠা ভাইরাসটির কী মাত্রায় পরিবর্তন হচ্ছে তা পরিমাপ করতে পারলেই আমরা ব্যবস্থাপনার ধরন ও প্রয়োগ সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারব। মেডিকেল এন্টোমলজিস্ট গড়ে তোলা ছাড়া এই কাজগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

ডেঙ্গুসহ অন্যান্য ভেক্টরবাহিত রোগ বর্তমানে চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড় করিয়েছে আমাদের। জানি না প্রয়োজনীয় ঢাল-তলোয়ার ছাড়া কীভাবে সম্ভব এই আক্রমণাত্মক পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। এই অপরিণামদর্শী প্রবল শত্রুর বিরুদ্ধে ঝটিকা অভিযানের জন্য যেমন প্রয়োজন অস্ত্রাগার ও প্রশিক্ষিত সৈন্যবাহিনী, তেমনি প্রয়োজন সময়মতো আক্রমণ। এর জন্য দরকার উন্নত মানের ল্যাব, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গবেষক ও বিজ্ঞানী এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা। সর্বোপরি এ কাজে সাধারণ জনগণেরও নিবিড় সম্পৃক্ততার প্রয়োজন রয়েছে। তথ্যসূত্র: যুগান্তর

লেখক: ড. মো. গোলাম ছারোয়ার, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত্ব বিভাগ, জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম)।

 

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট