চট্টগ্রাম শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০২৪

আত্মহত্যায় দ্বিতীয় চট্টগ্রাম

মরিয়ম জাহান মুন্নী

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ | ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ

এইচএসসি পরীক্ষার্থী রিমঝিম দাশগুপ্ত (২০) শুধুমাত্র প্রবেশপত্র হারিয়ে ফেলার কারণে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। মর্মান্তিক এ ঘটনাটি ঘটেছে ২৬ আগস্ট নগরীর সদরঘাট এলাকায়। ১০ আগস্ট বোনের বাসায় প্রেমঘটিত কারণে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন আশরাফ হোসেন জোবাইর (২৪) নামে এক কলেজছাত্র। একই মাসে খুলশীতে পোষা পাখির মৃত্যুশোকে আত্মহত্যা করে ১৩ বছরের কিশোরী জান্নাতুল ফেরদৌস।  পরিবারের সাথে অভিমান করে মিশকাতুল আলম (১৭) নামের আরেক কলেজ ছাত্রও আত্মহত্যা করে।

 

বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত এক মাসে শুধু চট্টগ্রাম জেলায় এমন তুচ্ছ কারণে স্কুল-কলেজে পড়–য়া শিক্ষার্থীসহ আত্মহত্যা করেন ১০ জন। উপরে কয়েকটি আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রেমঘটিত কারণে, পরিবারের সাথে মান-অভিমান, মানসিক রোগে আক্রান্ত, পারিবারিক কলহের জের, পরীক্ষার প্রবেশপত্র হারিয়ে ফেলায় এবং পোষা পাখির মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন তাঁরা। এদের বয়স ১৩ বছর থেকে ২৪ বছরের মধ্যে।

 

এদিকে, তরুণদের আত্মহত্যা প্রতিরোধ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সেবামূলক সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, আত্মহত্যার দিক থেকে দেশে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা। এ জেলায় গত আট মাসে শিক্ষার্থীসহ ৫১ জন নারী-পুরুষ বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করেছেন। এরমধ্যে ৩৪ জনই ছিলেন নারী। বাকি ১৭ জন পুরুষ। তথ্যে দেখা যায় আত্মহত্যায় এগিয়ে আছে নারীরা।

 

চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ নগরীতে এসময় ১২ বছরের নিচে ১০ জন শিশু পরিবারের সাথে অভিমানসহ বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করেছে। ১৩ থেকে ১৯ বছরের ২৪ জন তরুণ-তরুণী এবং ২০ থেকে ৩৫ বছরের ১৭ জন যুবক-যুবতী আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এদের বেশিরভাগই প্রেমঘটিত এবং মানসিক হতাশার কারণেই আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন।

 

বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতে বেশিরভাগ আত্মহত্যার পেছনে কোনো না কোনো মানসিক রোগ রয়েছে। যেমন-বিষন্নতা, মদ্যপান ও মাদকের অপব্যবহার, সিজোফ্রেনিয়া ও ব্যক্তিত্বের রোগ। এছাড়াও চিকিৎসা বিজ্ঞানে বর্তমানে জন্মগত কারণকেও আত্মহত্যার কারণ মনে করা হয়।

 

সারাদেশের সমীক্ষা : আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংক্রান্তে সচেতনতা বাড়াতে বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশন চলতি বছরের গত আট মাসে দেশব্যাপী একটি জরিপ করে। গতকাল (শনিবার) বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ‘শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার ক্রমবর্ধমান : কোন পথে সমাধান?’ শীর্ষক একটি সমীক্ষা প্রকাশ করা হয়। সমীক্ষায় দেখা যায়, সারাদেশে জানুয়ারি থেকে আগস্ট এই আট মাসে ৩৬১ জন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। শুধু স্কুল শিক্ষার্থী ছিল ১৬৯ জন, কলেজ শিক্ষার্থী ৯৬ জন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ৬৬ জন এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থী রয়েছেন ৩০ জন। এসব শিক্ষার্থীর মাঝে পুরুষ শিক্ষার্থী ছিলেন ১৪৭ জন, নারী শিক্ষার্থী ছিলেন ২১৪ জন। এখানেও আত্মহত্যায় মৃত্যুর সংখ্যা নারীদের বেশি।

 

আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে যে কারণে : আঁচল ফাউন্ডেশনের সমীক্ষায় বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, প্রেমে ব্যর্থতা, একাকীত্ব, রাগ-অভিমান, ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি, মিথ্যা অপবাদ, অতিচঞ্চলতা, মানসিক চাপ, আত্মবিশ্বাসের অভাব, ভাল ফলাফলের চাপ, মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত আসক্তি, বিনোদনের অভাব, পারিবারিক মেলবন্ধন তৈরি না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে শিক্ষার্থী তথা নারী-পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে।

 

শিক্ষাবিদ প্রফেসর হাসিনা জাকারিয়া বেলা বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার যে ঘটনাগুলো ঘটছে এগুলোর প্রথম এবং প্রধান কারণ পারিবারির অসচেতনতা। যদি পরিবার একটু সচেতন হয় তবে আত্মহত্যার প্রবণতা অনেকাংশে কমে যাবে। সন্তান বাবা-মায়ের মধ্যে কলহ দেখে বড় হলে তারমধ্যে এর একটি খারাপ প্রভাব পড়বেই। ব্যক্তি জীবনে সে মানসিকভাবে অসুস্থ থাকবে। আবার বাবা-মা দু’জনে চাকরিজীবী হওয়ায় সন্তানদের সময় না দেয়া। এছাড়া ঘরে ফিরলেও তারা মোবাইলে আসক্ত হয়ে পড়ে। এসব কারণে বাবা মায়ের সাথে সন্তানের দূরত্ব তৈরি হয়। এদিকে আবার সন্তানের কাছে তাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকে। যখন সন্তান তা পূরণ করতে পারে না তখন তাকে অন্যের সাথে তুলনা করে নানাভাবে ছোট করে। পড়াশোনার চাপ দিতে থাকে। একান্নবর্তী পরিবারের অভাবে সন্তানরা একা একা বেড়ে উঠে। এসব কারণেই তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে গেছে। শিশুদেরকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা পড়ালেখা বা সম্পর্কের ব্যর্থতাকে মেনে নিতে পারে। সন্তান যেন তাদের দুঃখ-কষ্ট মা-বাবার সাথে শেয়ার করে এমন সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। তাদের সময় দিতে হবে। বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাদের সংযুক্ত করতে হবে।

 

আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস আজ

আজ রবিবার (১০ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস। বিশ্বে আত্মহত্যা প্রতিরোধে ২০০৩ সাল থেকে প্রতিবছর ১০ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক আত্মহত্যা প্রতিরোধ সংস্থা দিবসটি পালন করে আসছে। ২০০৩ সাল থেকে দিবসটি পালন করা শুরু হলেও ২০১১ সালে প্রায় ৪০টি দেশ এই দিবসটি উদযাপন করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আত্মহত্যা প্রবণতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দশম। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও আজ এই দিবস পালিত হচ্ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৪ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে ৮ লাখেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে। সংস্থাটির মতে, প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন মানুষ আত্মহত্যা করে। এছাড়াও এর প্রায় ১৫ থেকে ২০ গুণ মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট