
বাজারে চাল, ডাল, তেলের মতো নিত্যপণ্যের দাম যেন নীরবে উপরের দিকে উঠছে। পরিবহন ভাড়া বেড়েছে, বিদ্যুতের বিল বেড়েছে, শিল্প উৎপাদনের খরচ বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে সাধারণ ব্যাখ্যায় বলা যায় সরবরাহ ঘাটতি, বাজার সিন্ডিকেট বা নীতিগত দুর্বলতা। কিন্তু এই ব্যাখ্যা এখন আর যথেষ্ট নয়। বাস্তবতা আরও গভীর এবং আরও বৈশ্বিক। বাংলাদেশের বাজার এখন একটি ‘লোকাল মার্কেট’ নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির এক সংবেদনশীল প্রান্তে দাঁড়িয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, জ্বালানি রুটের অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক শিপিং ব্যয়ের উল্লম্ফন এবং নতুন শুল্কযুদ্ধ; এসব মিলিয়ে এক ধরনের অদৃশ্য অর্থনৈতিক যুদ্ধ চলছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যে ২০২৬ সালের মার্চে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, টানা প্রায় ৪০ মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। এটি আর সাময়িক চাপ নয়; বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক বাস্তবতা। এই চাপের অন্যতম উৎস মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের মোট তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে যায়। এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার ফলে জাহাজ চলাচলের বীমা ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে জ্বালানি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য প্রতিটি চালান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যয়বহুল।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ৯০ থেকে ১০০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে, যা সাম্প্রতিক উত্তেজনার সময়ে একাধিকবার ১০০ ডলারের সীমাও ছুঁয়েছে। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি বিল কার্যত অদৃশ্যভাবে ফুলে উঠছে। যদিও সরকারিভাবে মূল্য কিছুটা নিয়ন্ত্রিত রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৬/৭ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি করে। এই বাড়তি ব্যয় বিদ্যুৎ খাতে সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে জ্বালানি ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ১৫ শতাংশ অব্যবহৃত ছিল। এর প্রভাব পড়েছে শিল্পে। গার্মেন্টস, টেক্সটাইল ও ক্ষুদ্র শিল্পেও উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে সীমিত আকারে জ্বালানি রেশনিং ও লোড ম্যানেজমেন্টে যেতে বাধ্য হয়েছে। এর কারণে যেসব বিষয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তা হলো, পরিবহন ব্যয় বেড়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ, সেচ ব্যয় বেড়েছে ১২ শতাংশের বেশি এবং শিল্প উৎপাদন খরচ বেড়েছে গড়ে ৮ থেকে ১০ শতাংশ।
খাদ্যপণ্যের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়েছে চালের দামে। গত এক বছরে চালের দাম গড়ে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতির বড় অংশই চালনির্ভর। উৎপাদনে সামান্য ঘাটতি থাকলেও মূল চাপ এসেছে আমদানি ব্যয়, জ্বালানি খরচ এবং শিপিং ব্যয় বৃদ্ধির কারণে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টন চাল আমদানির পরিকল্পনা নিতে হয়েছে। অর্থাৎ, বাংলাদেশের খাদ্য বাজার এখন আর শুধু কৃষকের উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি মূল্য, ডলার বিনিময় হার এবং শিপিং খরচের ওপর।
একই সঙ্গে তৈরি পোশাক খাতও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যে চাপ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি ব্যয় বাড়লে অর্ডার স্থানান্তরের ঝুঁকি তৈরি হয়। ২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় কমে ৫ থেকে ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, একদিকে আমদানি ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে রপ্তানি আয় অনিশ্চিত। এটি একটি স্পষ্ট দ্বিমুখী চাপ তৈরি করছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন ডলার থেকে নেমে এখন প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে অবস্থান করছে, যা আমদানি ব্যয় মেটাতে চাপ বাড়াচ্ছে।
এই পরিস্থিতিকে অর্থনীতির ভাষায় বলা যায় ‘ডাবল শক’। একদিকে সরবরাহ ধাক্কা, জ্বালানি সংকট, শিপিং ব্যয়, সরবরাহ ব্যাঘাত। অন্যদিকে চাহিদায় ধাক্কা, রপ্তানি অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক বাণিজ্য শ্লথতা। এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাব এখন বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্নবাস্তব আয়, এবং বিনিয়োগে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এই সংকট দৃশ্যমান নয়। মানুষ বাজারে দাম বাড়তে দেখে, কিন্তু দেখে না একটি তেলবাহী জাহাজের বীমা কত বেড়েছে, একটি কনটেইনার কতদিন বিলম্বিত হয়েছে, কিংবা একটি আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত কীভাবে দেশের কাঁচাবাজারে প্রভাব ফেলছে। এই অদৃশ্য সংযোগই এখন অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
এ পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারণেও মৌলিক পরিবর্তন জরুরি। জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যকরণ, কৌশলগত খাদ্য মজুদ বৃদ্ধি, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং সরবরাহ চেইনের দক্ষতা বাড়ানো, এসব এখন আর বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য। কারণ আজকের বিশ্বে যুদ্ধ আর শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জ্বালানি, খাদ্য ও বাণিজ্যের ভেতরে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ এখন সেই নতুন বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে হাজার মাইল দূরের একটি সংঘাত নির্ধারণ করছে দেশের বাজারের চালের দাম, গার্মেন্টস কারখানার অর্ডার, এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়। যে যুদ্ধ আমরা দেখি না, সেটিই এখন আমাদের জীবনের সবচেয়ে দৃশ্যমান সংকট।