চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

সেই বানরটিকে বাঁচানো গেল না

সীতাকুণ্ড সংবাদদাতা

৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ | ৯:৫৮ অপরাহ্ণ

বাঁচার আকুতি নিয়ে নিজেই চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হাসপাতালে ছুটে এসেছিলো শরীরে দগদগে ক্ষত হওয়া একটি বানর। শুধু একদিন নয়, পরপর তিন দিন হাসপাতালে এসে চিকিৎসকদের কাছে প্রাথমিক চিকিৎসাও নেয় অবলা প্রাণীটি। এ সংবাদ পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশনে তোলপাড় সৃষ্টি করলে উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রাম ভেটিরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স (সিভাসু) হাসপাতালে। কিন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নিয়েও বানরটিকে বাঁচানো গেল না।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত আগস্টের শেষ দিকে পাহাড় থেকে খাদ্যের সন্ধানে সীতাকুণ্ড পৌরসদরে নেমে আসে একদল বানর। বানরগুলো খাদ্যের জন্য বিভিন্ন দোকান ও বসতঘরে গিয়ে হাত পাতছিল। কিছু লোক তাদেরকে খাবার দিলেও কেউ কেউ তাদের খাবার না দিয়ে উল্টো ধাওয়াও করেন। এতে ভয় পেয়ে একটি বানর পালিয়ে যাবার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে অনেক উপর থেকে পড়ে যায়।

 

২৮ আগস্ট দুপুরে বানরটিকে আহত অবস্থায় তিন জন যুবক পৌরসদর থেকে একটি রিকশাযোগে সীতাকুণ্ড প্রাণী সম্পদ কার্যালয়ের উদ্দেশ্যে নিয়ে গেলেও অজ্ঞাত কারণে তারা বানরটিকে পথিমধ্যে ছেড়ে দিয়ে আসেন। এরপর শরীরে দগদগে ক্ষত নিয়ে বানরটি ঘুরতে থাকে নানাস্থানে। ২ সেপ্টেম্বর বানরটিকে দেখা যায় সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। বানরটি ক্ষতস্থানের যন্ত্রনায় অতিষ্ঠ হয়ে হাসপাতালের সামনে চিকিৎসার জন্য ঘুরতে থাকলে বিষয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নুর উদ্দিন রাশেদের নজরে আসে। তিনি বানরটিকে লোকজন দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে এসে ক্ষতস্থানে প্রাথমিক ঔষুধ লাগিয়ে দেন।

 

কিন্তু পরদিন ৩ সেপ্টেম্বর বিকাল ৫টার দিকে বানরটি আবারও স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে এসে উপস্থিত হন। এতে তারা বানরটিকে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে সেখানে ঔষুধ দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেন। চিকিৎসা শেষে বানরটি বাগানের গাছে ফিরে গেলেও ৪ সেপ্টেম্বর সকালে ফের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে। এদিনও তাকে ব্যান্ডেজ করে দেন চিকিৎসক। এ সময় প্রাণী সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা তাহমিনা আরজুসহ কয়েকজন এসে বানরটির অবস্থা দেখেন। তারা উন্নত চিকিৎসার জন্য বানরটিকে চট্টগ্রাম ভেটিরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্স (সিভাসু) হাসপাতালে নিয়ে যান। সেই থেকে বানরটি সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলো।

 

চট্টগ্রামের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্য্য পূর্বকোণকে বলেন, সিভাসুতে নিয়ে আসার পর চিকিৎসকরা দেখেন এটির শরীরের অবস্থা তেমন ভালো নয়। ক্ষতটা অনেক গভীর। আর পরিচ্ছন্ন জায়গায় না থাকায় বানরটির ক্ষতে ইনফেকশন হয়ে যায়। তবুও তারা নিয়মিত চিকিৎসা শুরু করেন। ৪ সেপ্টেম্বর আউটডোরে চিকিৎসা শেষে পরদিন চিকিৎসক প্রফেসর ডা. ভজন দাশ ও প্রণব পাল চিকিৎসা করেন। ৬ তারিখ পর্যন্ত বানরটি খাওয়া দাওয়া করে। এরপর খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেয়। ৭ তারিখ তাকে স্যালাইন ও তরল খাবার দেয়া হয়। কিন্তু সেটি নিঃস্তেজ হয়ে পড়ে। শেষে আজ দুপুরে বানরটি মারা যায়।

 

বানরটিকে প্রথম তিন দিন চিকিৎসা দেয়া সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিববার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নুর উদ্দিন রাশেদ পূর্বকোণকে বলেন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে উপর থেকে পড়ে শরীরে গভীর ক্ষত হবার পর যন্ত্রনায় অতিষ্ঠ হয়ে বাঁচার প্রবল আকুতি নিয়ে বানরটি আমাদের হাসপাতালে আসে। এখানে বণ্যপ্রাণী চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকলেও আমরা সাধ্যমত চিকিৎসা দিই। বানরটিও খুব করে চিকিৎসা চেয়েছে। এ কারণে পরপর তিন দিন সে আমাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসে। আমরা চিকিৎসা দেবার পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ ও বনবিভাগকে খবর দিই। এখানে চিকিৎসা তৃতীয় অর্থাৎ শেষদিনে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তাহমিনা আরজু এসে বানরটিকে সিভাসুতে নিয়ে যান। সেদিনও বানরটিকে হাসপাতালের পুরোনো একটি বেডের উপর থেকে ধরে আনা হয়। কয়েকদিনেই বানরটি একটি মায়া দিয়ে গেছে আমাদের। আমরা আশায় ছিলাম সিভাসু থেকে এটি সুস্থ হয়ে উঠবে। কিন্তু আজ সেটি মারা গেছে। তাই এ মৃত্যু মেনে নিতে খুবই কষ্ট হচ্ছে।

 

পূর্বকোণ/সৌমিত্র/জেইউ/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট