চট্টগ্রাম রবিবার, ২১ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

টানা বর্ষণে প্লাবিত চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা

পূর্বকোণ ডেস্ক

৫ আগস্ট, ২০২৩ | ১:০২ অপরাহ্ণ

বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চলগুলো গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে প্লাাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে হাজারো মানুষ। একরকম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে থানচির দুই ইউনিয়ন। তলিয়ে গেছে পুকুর, বিল ও আমন ক্ষেত। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।

 

বোয়ালখালী সংবাদদাতা জানান, ভারী বর্ষণে প্লাবিত হয়ে পানিবন্দী কধুরখীল কৈবর্ত্যপাড়ার শতাধিক বাড়িঘর। কৈবর্ত্য খালের মাঝে পাকা দেয়াল থাকায় পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে এ প্লাবন। ভারী বর্ষণের পানি নামতে পারছে না খালে। জোয়ারের পানি ফুলেফেঁপে উঠছে মানুষের বাড়ি ঘরে। ডুবে গেছে ফসলি জমি, মাছের পুকুর ও রাস্তাঘাট।

 

গতকাল ভারী বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। কৈবর্ত্যপাড়ার একমাত্র পানি প্রবাহের পথ হচ্ছে কৈবর্ত্যখাল। এই খালটি কর্ণফুলী নদী সংযুক্ত। পশ্চিম কধুরখীল কালিবাড়ি সড়কের কৈবর্ত্যপাড়া ব্রিজের নিচের একপাশ পাকা দেয়াল তুলে দিয়ে খালের পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর কৈবর্ত্যপাড়া ব্রিজ থেকে কধুরখীল কৈবর্ত্যপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত খালের অংশটি বালি দিয়ে ভরাট করে ফেলা হয়।

 

এ ঘটনায় ইউএনও মোহাম্মদ মামুন সরেজমিন পরিদর্শন করে খালের পাকা দেয়াল ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেন। এনিয়ে গত ২ জুন দৈনিক পূর্বকোণ পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।

 

তবে ইউএনওর সেই উদ্যোগ অদৃশ্য কারণে থমকে যায়। বিষয়টি গড়ায় স্থানীয় সাংসদ পর্যন্ত। সাংসদ সরেজমিন পরিদর্শন করে দেয়ালটি দেখার কথা ছিলো। গ্রামবাসীর স্বার্থে ইউএনও মামুন নাছোড়বান্দা হওয়ায় শেষতক পানি যাতায়াতের জন্য ভরাট খালের মাঝে ৩ ফুট প্রস্থের একটি নালা নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। তবে সেই পাকা দেয়াল ভাঙা হয়নি। ফলে ভারী বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়ে কৈবর্ত্যপাড়া।

 

কৈবর্ত্যপাড়ার বিশ্বজিৎ দাস বলেন, শতাধিক ঘর-বাড়িতে ঢুকে পড়েছে পানি। খাল ভরাট ও খালের মাঝে দেয়াল দেওয়ায় জোয়ারের পানি, বৃষ্টির পানি নামতে পারছে না। রাস্তা-ঘাট, উঠোন ঘাটা, পুকুর ও জমি সব ঢুবে গেছে।

 

ইউএনও মোহাম্মদ মামুন বলেন, দেয়াল নির্মাণকারী সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে দেয়ালটি ভেঙে ফেলার জন্য বলা হয়েছিল। আগামীকাল সরজমিনে পরিদর্শন করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

রাজস্থলী সংবাদদাতা জানান, রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার তিন নং বাঙালহালিয়া ইউনিয়নে টানা বর্ষণে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যার দেখা দিয়েছে। এতে অন্তত কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ড্রেনের বাঁধ ভেঙে প্রবল স্রোতে পানি প্রবেশ করছে। এতে ঢলের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে প্রায় সম্পূর্ণ বাঙালহালিয়া বাজার ও গ্রাম। পানিবন্দী হয়ে পড়ছে কয়েক পরিবারের মানুষ। পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর দিন কাটছে সাধারণ মানুষের। অনেকের ঘরে পানি থাকায় রান্নাবান্না করতে পারছে না। শুকনো খাবার খেয়ে দিন কাটছে তাদের।

 

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, শুক্রবার সকালে উপজেলার তিন নং বাঙালহালিয়া ইউনিয়নের বাণিজ্যিক এলাকা বাঙালহালিয়া বাজার ও মহিলা সদস্যা বাপ্পি দেবের বাড়ি সংলগ্নে পাহাড়ি ঢলের পানির প্রবল স্রোতে পানি ঢুকছে নিচু এলাকায়। এছাড়া পাহাড়ি ঢলে বাজারের পাশের কেন্দ্রীয় শ্রী শ্রী দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের আশপাশ টানা বর্ষণে প্লাবিত হয়েছে।

 

বাজারের কিছু অসাধু ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা মাফিক দোকান ঘর নির্মাণ ও পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করায় এলাকায় ভাঙন অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করছে। ভাঙনের পর থেকেই হু হু করে পানি বেড়ে সম্পূর্ণ বাঙালহালিয়া বাজারসহ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

 

উপজেলার বাঙালহালিয়া বাজার ও কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়ে  মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছে। গবাদিপশু নিয়ে পড়েছে বেকায়দায়। ঢলের পানিতে তলিয়ে ভেসে গেছে অসংখ্য পুকুর ও রাস্তাঘাট।

 

৩নং বাঙালহালিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আদোমং মারমা বলেন, বন্যায় প্লাবিত এলাকা পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। বিষয়টি ইউএনওকে জানানো হয়েছে।

 

রাজস্থলীর ইউএনও শান্তনু কুমার দাশ জানান, মানুষ যাতে পানিবন্দী না হয় সে বিষয়ে চেয়ারম্যানের সাথে আলাপ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেই সঙ্গে পানিবন্দীদের সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে সাহায্য চাওয়া হবে।

 

থানচি সংবাদদাতা জানান, ভারী বর্ষণ ও একটানা চার দিনব্যাপী বৃষ্টির কারণে সাঙ্গু নদীর পানির বৃদ্ধি পাওয়ায় থানচি উপজেলা সদর হতে অপর দুর্গম দুই ইউনিয়ন যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে গেছে। শুক্রবার সকালে এ অবস্থা সৃষ্টি হয় বলে তিন্দু ইউপি চেয়ারম্যান ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা নিশ্চিৎ করেছেন।

 

স্বাধীনতার আগে-পরে থানচি সদর হতে দুর্গম তিন্দু ও রেমাক্রী ইউনিয়নের যাতায়াতে একমাত্র মাধ্যম সাঙ্গু নদী বা নৌপথ। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকারের দায়িত্বরত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিংয়ের প্রচেষ্টায় থানচি থেকে লিটক্রে পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। সড়কের নির্মাণ কাজের বাস্তবায়ন কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট।

 

অপরদিকে থানচি আলিকদম সড়কের (ক্রাউডং) ডিমপাহাড় এলাকা হতে তিন্দু গ্রোপিং পাড়া পর্যন্ত এইচবিবিকরন রাস্তা নির্মাণ করা হলেও বর্তমান পর্যন্ত উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ বেঁয়ে হালকা মোটরসাইকেল চলাচল বর্ষায় বিপদজনক। সর্বোপরি নৌপথই একমাত্র অবলম্বন।

 

টানা চারদিন অতি ও ভারী বৃষ্টি ভর্ষণে কারণে সাঙ্গু নদীর পানি প্রবাহ বেড়ে যাওয়া নৌপথ চলাচল বন্ধ রয়েছে। শুক্রবার সকল থেকে টানা বর্ষণে পানি গতি প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে ২ ইউনিয়নের কেউ থানচি উপজেলা সদরে যাতায়াত করতে  পারছে না।

 

তিন্দু ইউপি চেয়ারম্যান ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা জানান, আমি উপজেলা সদরে অবস্থান করছি। শুক্রবার সকালের  ৩ নং ওয়ার্ডের মেম্বার খ্যাইসাপ্রু মারমা ও ৯ নং ওয়ার্ডে মেম্বার গান্ডিজয় ত্রিপুরা উচু পাহাড় থেকে মুঠোফোনের আমাকে জানিয়েছেন, ভারী বর্ষণ প্রচুর বৃষ্টি বিভিন্ন ঝিড়ির ঝর্ণা, খাল নদীতে প্রচুর পানি বৃদ্ধি পাওয়া আজকের জরুরি কাজের থানচি সদরে যাতায়াত অতিরিক্ত ঝুকিপূর্ণ হয়ে গেছে বলে তারা জানান।

 

চন্দনাইশ সংবাদদাতা জানান, টানা ৭২ ঘণ্টা বৃষ্টির ফলে পাহাড়ি ঢলে উপজেলার ধোপাছড়ি ইউনিয়ন ও দোহাজারী পৌরসভার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে শঙ্খনদীতে পানি থৈ থৈ করছে। অপরদিকে গতকাল বিকেলে জোয়ারের পানিতে শঙ্খনদী ও চানখালী খালের তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায়।

 

জানা যায়, গত ২ আগস্ট থেকে টানা ৭২ ঘণ্টার বৃষ্টিপাতে চন্দনাইশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি শঙ্খনদী ও চানখালী খালের পানি বিপদ সীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হচ্ছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে যে কোন সময় বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।

 

ফলে নদের উপকুলবর্তী দোহাজারী পৌরসভা, বৈলতলী, বরমা, বরকল, সাতবাড়িয়া, পাশের ইউনিয়ন কালিয়াইশ, মাইঙ্গাপাড়া, ধর্মপুরসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ ভয়াবহ বন্যা আতঙ্কে রয়েছে। উপজেলার নিম্নাঞ্চলসমূহের বিস্তীর্ণ বর্ষাকালিন সবজি ক্ষেত পানিতে ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় আউশ ধানের বীজতলা নিয়েও দুশ্চিতায় রয়েছেন কৃষকরা।

 

সরেজমিন গতকাল বিকেলে উপজেলার দোহাজারী শঙ্খনদীর পাড়ে দেখা যায়, পাহাড়ি ঢলের পানি নেমে আসায় শঙ্খনদের পানি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানির তীব্রতা বাড়ছে, ফলে যে কোন মুহুর্তে পানি উপচে লোকালয়ে প্রবেশ করবে। এতে পুরো উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে।

 

শঙ্খনদীতে পানি বাড়তে থাকলে বর্ষাকালিন সবজি ঢেড়শ, বরবটি, মিষ্টি কুমড়া, ঝিঙ্গা, চিচিংগা, করলা, তিত করলা, শষা, মূলা ও বেগুন ক্ষেত পানির নীচে তলিয়ে যাবে।

 

শঙ্খচরের কৃষক মোস্তফা জামান জানান, ক্ষেতে পানি জমলে সবজি গাছ নষ্ট হয়ে যায়। ইতিমধ্যে নিম্নাঞ্চলের সবজি ক্ষেতগুলোর কাছাকাছি চলে এসেছে পানি।

 

মহেশখালী সংবাদদাতা জানান, বৈরী আবহাওয়ায় জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে তিন থেকে চার ফুট উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। যার কারণে মাতারবাড়ির পশ্চিমে বেড়িবাঁধে নতুন করে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ঢেউয়ের আঘাতে উপড়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, তলিয়ে যাচ্ছে জিওব্যাগ, তছনছ হচ্ছে বেড়িবাঁধ রাস্তা ও হুমকির মুখে আমন ধানের চাষাবাদ।

 

সরেজমিন দেখা গেছে, চারদিকে থৈ থৈ করছে পানি। এতে মাতারবাড়ি ইউনিয়নের শত শত চাষির ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পশ্চিমের ভাঙা বেড়িবাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকছে লোকালয়ে। এতে জোয়ারের লবণাক্ত পানিতে আমন ক্ষেত থৈ থৈ করছে। নষ্ট হয়ে গেছে বীজতলা ও চারা গাছ। এর সঙ্গে কৃষকদের স্বপ্নও তলিয়ে গেছে পানিতে। এতে কৃষকদের পরিবারে চলছে হাহাকার। অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে আমন চাষ।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাতারবাড়ি ইউনিয়নের নয়াপাড়া, সাইট পাড়া, পশ্চিম তিতা মাঝির পাড়া, মিয়াজীর পাড়া, বলির পাড়াসহ বিভিন্ন গ্রামের কিছু কিছু আমন ক্ষেত লবণাক্ত পানিতে এখনও নিমজ্জিত রয়েছে।

 

স্থানীয় কৃষক বাদশা মিয়ার স্ত্রী সবুরা খাতুন জানান, অনেক কষ্টে ধারদেনা করে তারা পৌঁনে এক একর জমিতে আমন ধানের চারা লাগিয়েছেন। জমিতে সারও দেওয়া হয়েছে। ধানের ক্ষেতে সবুজের সমারোহ ছিলো। কিন্তু বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের পানির কারণে তাদের ফসলি ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষেত থেকে যে ধান পেতেন, তা দিয়ে তাদের কয়েক মাসের সংসার চলতো।

 

স্থানীয় কৃষি অফিসার এন এইচ এম তৈয়ব পূর্বকোণকে জানান, অনেক কৃষক তাদের ধানের ক্ষেত লবণাক্ত পানিতে নষ্ট হওয়ার খবর মুঠোফোনে আমাকে জানিয়েছেন চলতি মৌমুমে এসব ক্ষেতে আর কোনো ধানের চারা লাগানো সম্ভব নয় বলে জানান।

 

পূর্বকোণ/মাহমুদ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট