চট্টগ্রাম রবিবার, ২১ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

‘বাচ্চা দুটোর জন্য আমি আবার হাঁটতে চাই’

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৩ জুলাই, ২০২৩ | ১১:৪৩ পূর্বাহ্ণ

১ জুন সহকর্মীদের বিদায় জানিয়ে নিজের কর্মস্থল থেকে হেঁটে বেরিয়ে বাড়ির পথ ধরেছিলেন মোহাম্মদ নুরুল আলাল। তারই প্রায় দেড় মাস পর ১৮ জুলাই তিনি ফিরলেন কর্মস্থলে। এবার আর নিজের পায়ে ভর দিয়ে অফিসে যাওয়ার সাধ্য হয়নি এই তরুণের। দুটি স্ক্র্যাচের ওপর শরীরকে ভর দিয়ে তিনি গেলেন কাতরাতে কাতরাতে! হবেই বা কি করে? মাঝখানের এই সময়টাতেই যে পুরো পৃথিবীটাই তছনছ হয়ে গেছে নুরুল আলালের। দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে এই তরুণের ডান পা, আর দিয়েছে সন্তানদের কোলে নিতে না পারার দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা।

 

দিনটি ছিল গত ২ জুন, ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ৩ টা। সম্প্রতি ভালো বেতনে আলালের চাকরি হয়েছে ঢাকার একটি বেসরকারি সংস্থায় (এনজিও)। সেজন্য এতদিন গ্রামের বাড়ি মহেশখালীতে থাকা স্ত্রী আর দুই শিশু সন্তানকে একেবারে ঢাকায় নিজের কাছে নিয়ে যেতে ফিরছিলেন গ্রামে। সেই ফেরাটাই আলালের জীবনে নিয়ে এল একজীবনের দুঃখ।

 

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের জোরারগঞ্জের সোনাপাহাড় এলাকার ফেবো ফিলিং স্টেশনের সামনে আলালদের বহনকারী সৌদিয়া বাসটি একটি ট্রাককে পেছন দিক থেকে সজোরে ধাক্কা দেয়। সেই সংঘর্ষে মারা যান একজন। আর বাসের মুচড়ে যাওয়া অংশে পেঁচিয়ে যায় আলালের ডান পা। পরে দুই দফা অস্ত্রোপচার করে সেই পা’টি হাঁটুর উপর পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়।

 

এখন আলালের বেশিরভাগ সময় কাটছে হাসপাতালে। কেননা ক্ষণে ক্ষণে ফিরে আসে ব্যথা। ১৮ জুলাই কর্মস্থলে যোগদান করলেও তাই দুই ঘণ্টার বেশি সেখানে থাকতে পারেননি। ব্যথার কারণে ছুটতে হয় হাসপাতালে। অবশ্য আলালের এই দুর্দিনে পাশে দাঁড়িয়েছে তার কর্মস্থল আর বন্ধুরা। কিন্তু যাদের অবহেলায় আলাল আজ পঙ্গু সেই সৌদিয়া পরিবহনের কেউ একবারের জন্যও খবরও নেয়নি তাঁর।

 

৩৫ বছরের নুরুল আলালের বাড়ি কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার বড় মহেশখালী এলাকার বড় মিয়াজি পাড়ায়। বাবা-মা এবং চার ভাই-বোনের পরিবারের হাল ধরেছিলেন বড় ছেলে আলালই। বর্তমানে তারও সংসার হয়েছে। আছে দুই বছরের মেয়ে তাসনিয়া আলাল, দশ মাসের পুত্র তাসনিম আলাল।

 

বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাল আইন বিষয়ে স্নাতক এবং সাউদার্ন বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পারিবারের আর্থিক অনটনের কারণে আইন পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য দীর্ঘ কয়েক বছর অপেক্ষা করতে পারেননি। জীবন-জীবিকার তাগিদে বেসরকারি সংস্থায় চাকরিতে যোগদান করেন। ফিরে এনেছেন পরিবারে স্বচ্ছলতা। আলাল যখন তিল তিল করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং দুই অবুঝ শিশুর ভবিষ্যত গড়ার লক্ষ্যে স্বপ্নে বিভোর তখনি তাঁর জীবনে নেমে এল অন্ধকার। আলালের সময় কাটছে এখন দুঃসহ যন্ত্রণায়। চিকিৎসাধীন স্বামীকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ করতে করতে ক্লান্ত আলালের স্ত্রী। দুই অবুঝ শিশুরও সময়ও কাটছে তাই অনাদরে।

 

সেদিন কী ঘটেছিল-জানতে চাইলে আলাল বলেন, ‘নতুন চাকরির সুবাদে ঢাকায় বউ বাচ্চাকে নিয়ে আসার জন্য ফ্যামিলি বাসা ভাড়া করেছিলাম। জুন থেকে নতুন বাসায় ওঠার কথা ছিল। তাই পহেলা জুন অফিস শেষে রাত ১১ টা ১৫ মিনিটে সৌদিয়া পরিবহনের একটি বাসে করে ঢাকা থেকে মহেশখালীর উদ্দেশ্যে রওনা দেই। পথিমধ্যে রাতে মাত্র কয়েক মিনিটে, সম্পূর্ণ সৌদিয়া বাসের চালকের অবহেলায় বাসটি ট্রাককে ধাক্কা দিলে দুমড়ে-মুচড়ে যায়। আর এতেই ভেস্তে গেছে আমার পরিবারের স্বপ্ন। আর অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে ছোট ছোট দুটি মাসুম বাচ্চার ভবিষ্যৎ।’

 

আলাল তাই ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘সরকার থেকে শুরু করে যানবাহনের মালিক সমিতি বা ইউনিয়নগুলো কেউই দুর্ঘটনায় আমার পাশে দাঁড়ায়নি। পাইনি কোনো ক্ষতিপূরণও। সৌদিয়া পরিবহনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো সাড়া দেয়নি। এরমধ্যে চিকিৎসায় আমার তিন লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। কর্মস্থল আর বন্ধুরা ব্যবস্থা করেছেন পুরোটা।’

 

শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি আলালের মনের অবস্থাও এখন তথৈবচ। সামনের দিনগুলো কীভাবে পার করবেন, সেই চিন্তায় হারিয়ে গেছে তাঁর ঘুম।

 

আলাল বলেন, ‘এখন পুরোপুরি পরনির্ভরশীল হয়ে বেঁচে আছি। আমার বাচ্চাদের কোলে নিতে পারি না। দুই বছরের মেয়ে বারবার জিজ্ঞেস করে, বাবা তুমি আর হাঁটতে পারবে না। আমি কোনো জবাব দিতে পারি না। বাচ্চা দুটার জন্য আমি আবার হাঁটতে চাই। হোক সেটি কৃত্রিম পা লাগিয়ে। এ জন্য সে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণ প্রত্যাশা করছি।’

 

আর কথা বাড়াতে পারেননি আলাল। সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো পায়ের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে থাকেন অঝোরে। পাশে বসে স্ত্রী হিনুয়ারা কোথায় স্বামীকে সান্ত্বনা দেবেন উল্টো তাঁর চোখ ফেটেও নামে জলের ধারা। দুই সন্তানকে জড়িয়ে ধরে এই নারী আহাজারি করতে থাকেন এই বলে, ‘আমার সাজানো- গোছানো সংসারটা আর রইল না! আমার দুই সন্তান যেন আবারও বাবার বুক ফিরে পায় সবাই সেই ব্যবস্থা করুন।

 

পূর্বকোণ/মাহমুদ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট