চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৯ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

নদী-খালের বালু গিলে খাচ্ছে প্রভাবশালীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

৮ জুন, ২০২৩ | ১২:০৮ অপরাহ্ণ

সরকারের তালিকায় কর্ণফুলী নদীর বোয়ালখালীতে কোনো বালুমহাল নেই। কিন্তু বোয়ালখালীর চরণদ্বীপ ও খরণদ্বীপ এলাকায় রাত-দিন সমানতালে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। যত্রতত্র-অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনে তীব্র হয়েছে কর্ণফুলীর ভাঙন। নদী ভাঙনে সাধারণ মানুষ নিঃস্ব হলেও ফুলে-ফেঁপে ওঠেছে বালুখেকোরা। একইভাবে জেলা প্রশাসনের বালুমহালের তালিকায় আনোয়ারা উপজেলায়ও বালুমহাল নেই। তারপরও শঙ্খ নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

 

জেলা প্রশাসন চট্টগ্রামের বিভিন্ন নদী ও খালে ৫৩টি বালুমহাল ইজারার দরপত্র আহ্বান করে। এরমধ্যে রাঙ্গুনীয়া উপজেলায় নয়টি, ফটিকছড়িতে ১৭টি, লোহাগাড়ায় দুটি, সাতকানিয়ায় চারটি, পটিয়ায় তিনটি, রাউজানে ১০টি, মিরসরাইয়ে দুটি, চন্দনাইশে ছয়টি মহাল রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২৪টি বালুমহালের ছাড়পত্র দেওয়া হয়।

 

স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসন সূত্র জানায়, প্রভাবশালী নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা একটি মহাল ইজারা নিয়ে আশপাশের আরও কয়েকটি মহাল থেকে বালু উত্তোলন করে। আবার স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে বড় বালুমহাল নিয়ে নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। অনেক সময় বালুমহাল দখল-বেদখল নিয়ে রাজনৈতিক দলের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। স্থানীয় সূত্র জানায়, বোয়ালখালী ও সাতকানিয়া উপজেলা বালুমহাল নিয়ে একাধিকবার সংঘাত-সংঘর্ষ ও বন্দুক যুদ্ধ হয়েছে।

 

এলাকাবাসীর অভিযোগ, যত্রতত্রভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদী ভাঙন তীব্র রূপ ধারণ করে। অন্যদিকে বালু পরিবহনের কারণে গ্রামীণ সড়ক-রাস্তাঘাটের অবস্থা বেহাল হয়ে পড়েছে। তাদের অভিযোগ, সরকারি দলের নেতারা অবৈধ বালু উত্তোলনে জড়িত থাকায় প্রশাসন অনেকটা না দেখার ভান করে থাকেন। প্রশাসনের নীবরতায় বালুখেকোরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

 

সরেজমিনে দেখা যায়, কর্ণফুলী নদীর বোয়ালখালীর চরণদ্বীপ ও খরণদ্বীপ ইউনিয়ন অবৈধ বালু বাণিজ্যের নিরাপদ জোনে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এ বালু বাণিজ্য। দুই ইউনিয়নে কর্ণফুলী নদীর তীরে ১০-১২টি বালু বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, কর্ণফুলী নদী থেকে বালু উত্তোলন করে এসব বিক্রয়কেন্দ্রে বালু বিক্রয় করা হয়। প্রভাবশালী স্থানীয় নেতারা অবৈধ উত্তোলনে জড়িত থাকায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এলাকাবাসীর।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে পূর্বকোণকে বলেন, বোয়ালখালীতে কর্ণফুলী নদীর পাড় এলাকায় থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে হুমকিতে পড়েছে নদীর তীর ও পাউবোর নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ। জেলা প্রশাসকের সভায় বিষয়টি উত্থাপন করা হবে বলে জানান তিনি।

 

বোয়ালখালীর পশ্চিম গোমদ-ীর চরখিজিরপুর অংশে নদী ড্রেজিং করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। ড্রেজিংয়ের সুযোগে প্রভাবশালী চক্র অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, নদীর পাড় ও চর থেকে মাটি কেটে নেয়। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনে নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। ভাঙনে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এ কারণে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন স্থানীয় লোকজন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন ও নদীর পাড় থেকে মাটি কেটে নেওয়ায় দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপের জমি ভেঙে পড়ে। পরবর্তীতে চর থেকে মাটি কেটে সেই জমি ভরাট করে দেয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান।

 

সরকারিদলের নেতাদের অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইলে বোয়ালখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. নূরুল আমিন চৌধুরী পূর্বকোণকে বলেন, ‘কর্ণফুলী নদী থেকে বালু উত্তোলন ও বিক্রয়ে আওয়ামী লীগের নাম দেওয়া হয়। কিন্তু আমরা তো বালু উত্তোলনে জড়িত নই। তাই দলের ভাবমূর্তি যাতে ক্ষুণœ না হয় সেজন্য আইনশৃঙ্খলা ও সমন্বয় কমিটির সর্বশেষ সভায় (গত ২৫ মে) জেলা প্রশাসনের অনুমোদনহীন বালুমহাল বন্ধ করে দেওয়ার জন্য ইউএনওকে আমরা পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছি। কোনো ব্যক্তির চেহারা না দেখে দলমত নির্বিশেষ অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছি। কোনো ব্যক্তির অপকর্মের দায় কেন দল বহন করবে।’ আইনশৃঙ্খলা কমিটির ওই সভায় চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য নোমান আল মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন।

 

গত মঙ্গলবার আনোয়ারা উপজেলার শঙ্খ নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের দায়ে মোহাম্মদ জোবাইর নামের এক ব্যক্তিকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। হাইলধর ইউনিয়নের বরকল ব্রিজ এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মুমিন।

 

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বোয়ালখালীর খরণদ্বীপ এলাকায় অভিযান চালিয়ে মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন ও আহমদ মনসুর নামে দুই ব্যক্তিকে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেছেন ইউএনও মোহাম্মদ মামুন। এর আগে ২৬ জানুয়ারি চরণদ্বীপ এলাকার জয়নাল আবেদীন নামে এক বালু ব্যবসায়ীকে ৮০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। কর্ণফুলী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

 

সরেজমিনে দেখা যায়, কালুরঘাট সেতুর উভয় তীর ঘেঁষে বালু বিক্রয়কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। নদীর ধার ও নদী সংলগ্ন খালের তীর দখল করে ড্রেজার ও নৌকা থেকে বালু উত্তোলন করা হয়। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল দীর্ঘদিন ধরে নদী ও খালের তীর দখল করে বালু বাণিজ্য করে আসছে।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট