চট্টগ্রাম শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

সাঁতার হোক জীবন বাঁচানোর শিক্ষা

সাঁতার হোক জীবন বাঁচানোর শিক্ষা

প্রকৌশলী মো. আনোয়ার কবির

২৪ অক্টোবর, ২০২৬ | ১১:৩২ পূর্বাহ্ণ

নদীমাতৃক বাংলাদেশে পানির অভাব নেই। আছে বিস্তীর্ণ সমুদ্রসৈকত, নদী, খাল-বিল ও অসংখ্য জলাশয়। অথচ পানির দেশে বেড়ে ওঠা অনেক শিশু, কিশোর ও তরুণই জানে না সাঁতার। ফলে আনন্দভ্রমণে গিয়ে কিংবা পানির কাছাকাছি অসতর্ক মুহূর্তে প্রাণ হারাতে হচ্ছে অনেককে। অথচ সাঁতার শুধু শরীরচর্চা নয়, এটি জীবন রক্ষারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা। আজ ২৪ অক্টোবর বিশ্ব সাঁতার দিবস। দিবসটির মূল বার্তা হতে পারে-সাঁতার শিখুন, নিরাপদ থাকুন, জীবন বাঁচান।

সাঁতার শরীর ও মনের সুস্থতার জন্য অত্যন্ত উপকারী। পানির প্রতিরোধের বিপরীতে শরীরের প্রায় সব পেশি সক্রিয় থাকায় পেশিশক্তি ও সহনশীলতা বাড়ে। হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা, ফুসফুসের সক্ষমতা এবং শরীরের নমনীয়তা উন্নত করতেও সহায়তা করে সাঁতার। একই সঙ্গে এটি ওজন নিয়ন্ত্রণ, জয়েন্টের ওপর চাপ কমানো এবং মানসিক প্রশান্তি অর্জনে ভ‚মিকা রাখে। তবে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার চিকিৎসায় সাঁতারের উপকারিতা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে; প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অনুশীলন করা উচিত।

সাঁতারের সঙ্গে মানুষের পরিচয় জন্মেরও আগে। মায়ের গর্ভে ভ্রুণ অ্যামনিওটিক তরলে অবস্থান করে। তবে গর্ভের সেই ভাসমান অবস্থাকে সাঁতার শেখার সমতুল্য ভাবার সুযোগ নেই। বাস্তব জীবনে পানিতে নিরাপদ থাকার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, সচেতনতা ও উপযুক্ত তত্ত্বাবধান।

বিশ্বব্যাপী সাঁতারে অংশগ্রহণ বাড়ানো, পানির নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং সাঁতার শেখানোর উদ্যোগকে উৎসাহিত করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক সাঁতারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মাইসুইমপ্রো বিশ্ব সাঁতার দিবস চালু করে। প্রতিবছর অক্টোবরের চতুর্থ শনিবার দিবসটি পালিত হয়। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক জলক্রীড়া সংস্থা ওয়ার্ল্ড অ্যাকুয়াটিক্স-যা আগে ফিনা নামে পরিচিত ছিল-সাঁতারসহ বিভিন্ন জলক্রীড়ার আন্তর্জাতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এই মৃত্যুর বড় অংশ ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। ২০২১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। এতে সচেতনতা, নিরাপত্তা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। অথচ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সাঁতার ও পানির নিরাপত্তাবিষয়ক শিক্ষা কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন এখনো প্রবল।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে পানির নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনা ও শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে অনেক শিক্ষার্থী জানান, পানিতে নিরাপদ থাকার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে তারা প্রথমবারের মতো জানতে পেরেছেন। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও জীবন রক্ষাকারী এই জ্ঞান কতটা সীমিত।

সমুদ্রসৈকতেও নিরাপত্তা সচেতনতার ঘাটতি উদ্বেগজনক। কক্সবাজারের মতো পর্যটনকেন্দ্রে বিপজ্জনক স্রোত, বিশেষ করে রিপ কারেন্ট সম্পর্কে পর্যটকদের যথেষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। এ ধরনের স্রোত মানুষকে তীর থেকে গভীর পানির দিকে টেনে নিতে পারে। তাই সৈকতে দৃশ্যমান সতর্কতামূলক নির্দেশনা, বিপজ্জনক এলাকার চিহ্ন, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী এবং নিয়মিত প্রচারণা থাকা প্রয়োজন।

পানির প্রতি মানুষের আকর্ষণ শুধু বিনোদনের নয়, মানসিক প্রশান্তিরও। পানির কাছাকাছি সময় কাটানো মনকে সতেজ করতে পারে। কিন্তু নিরাপত্তার জ্ঞান ছাড়া সেই আকর্ষণই কখনো বিপদের কারণ হয়ে ওঠে।

সাঁতারকে জনপ্রিয় করা এবং পানিতে ডুবে মৃত্যু কমাতে তিন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। স্বল্প মেয়াদে পোস্টার, বিলবোর্ড, সভা-সেমিনার ও গণসচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে। মধ্য মেয়াদে সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশনে নিয়মিত সাঁতার, পানির নিরাপত্তা ও জরুরি করণীয় বিষয়ে অনুষ্ঠান প্রচার করা যেতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে স্কুলের পাঠ্যক্রমে পানির নিরাপত্তা, সাঁতারের প্রাথমিক শিক্ষা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের বড় শক্তি। সেই শক্তিকে নিরাপদ ও সুস্থ রাখতে সাঁতার শেখার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। নদী-সমুদ্রের দেশে সাঁতার না জানা শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, এটি জননিরাপত্তারও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব সাঁতার দিবসে তাই প্রত্যাশা-সাঁতারকে বিলাসিতা নয়, জীবন রক্ষার মৌলিক দক্ষতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কারণ, পানির দেশে সাঁতার জানা মানে শুধু ভালো থাকা নয়, বিপদের মুহূর্তে নিজের জীবন বাঁচানোর সক্ষমতা অর্জন করা।

লেখক: সভাপতি লাইফ সেভিং সোসাইটি, চট্টগ্রাম

পূর্বকোণ/মিফতা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট