প্রতি অক্টোবরে স্টকহোম থেকে নোবেলজয়ীদের নাম ঘোষণা হয়, আর বেশির ভাগ মানুষের কাছে খবরটা দ্রুত হারিয়ে যায়। কিন্তু এ বছর চিকিৎসা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও অর্থনীতির পুরস্কার আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে জড়িত – চাল-ডালের দাম, ওষুধের দাম আর মনের স্বাস্থ্য। তাই প্রশ্ন শুধু তাঁরা কী আবিষ্কার করেছেন নয়, বরং আমরা এটা কীভাবে কাজে লাগাতে পারি।
চিকিৎসা: আলো জ্বালিয়ে স্নায়ুকোষ চালু-বন্ধ
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন কার্ল ডাইসেরথ (স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র), পিটার হেগেমান (হুমবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়, বার্লিন, জার্মানি) ও গেয়র্গ নাগেল (ভুর্ৎসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানি)। হেগেমান ও নাগেল সবুজ শৈবালে এমন প্রোটিন খুঁজে পান, যা আলো পেলে সাড়া দেয়। ডাইসেরথ দেখান, এই প্রোটিন মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে বসালে শুধু আলো ফেলে নির্দিষ্ট কোষকে সুইচের মতো চালু বা বন্ধ করা যায়। এই পদ্ধতির নাম অপটোজেনেটিক্স, যা আজ সারা বিশ্বের গবেষণাগারে ব্যবহার হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছেন স্মৃতি, ভয়, আসক্তি ও মন-মেজাজ কীভাবে কাজ করে। তবে এটি এখনো মূলত গবেষণার হাতিয়ার, হাসপাতালের চিকিৎসা নয়। কিছু বংশগত অন্ধত্বে আংশিক দৃষ্টি ফেরানোর প্রাথমিক পরীক্ষা হয়েছে, কিন্তু তা এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে।
পদার্থবিজ্ঞান: বরফের নিচে এক দূরবীন
পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল এককভাবে পেয়েছেন বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া মার্কিন বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন (ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন–ম্যাডিসন, যুক্তরাষ্ট্র)। নিউট্রিনোকে বলা হয় ‘ভূতুড়ে কণা’ – প্রতি সেকেন্ডে কোটি কোটি নিউট্রিনো আমাদের শরীর ভেদ করে চলে যায়, কোনো চিহ্ন না রেখে। হালজেনের ভাবনা ছিল দক্ষিণ মেরুর স্বচ্ছ বরফকেই যন্ত্র বানানো। আইসকিউব নামের এই পর্যবেক্ষণাগার এক ঘন কিলোমিটার বরফ, যার ভেতরে পাঁচ হাজারের বেশি আলো-সেন্সর বসানো। কোনো নিউট্রিনো বরফে ধাক্কা খেলে ক্ষীণ আলোর ঝলক তৈরি হয়, সেন্সরগুলো তা ধরে ফেলে। ২০১৩ সালে এটি প্রথম মহাকাশের গভীর থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনোর প্রমাণ পায়, খুলে দেয় মহাবিশ্বকে দেখার নতুন পথ।
রসায়ন: অণুকে ‘ডান’ বা ‘বাম’ বেছে নিতে শেখানো
রসায়নে নোবেল পেয়েছেন অঁরি কাগঁ (প্যারিস-সুদ বিশ্ববিদ্যালয়, ফ্রান্স) ও কেনসো সোয়াই (টোকিও ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স, জাপান)। আমাদের দুই হাত একে অপরের আয়নার প্রতিবিম্ব; অনেক অণুও তেমনি দুই রূপে থাকে, অথচ প্রকৃতি সাধারণত একটি রূপই ব্যবহার করে। কেন এমন হয়, তা লুই পাস্তুরের সময় থেকে এক রহস্য। কাগঁ ও সোয়াই দেখিয়েছেন, রাসায়নিক বিক্রিয়ায় একটি রূপকে কীভাবে বাড়িয়ে তোলা যায়। ওষুধে এর গুরুত্ব বিশাল: অর্ধেকের বেশি ওষুধের অণুর এমন দুই রূপ আছে, যার একটি রোগ সারায়, অন্যটি অকেজো বা ক্ষতিকর হতে পারে। ১৯৬০-এর দশকে থ্যালিডোমাইড ওষুধে হাজারো শিশুর জন্মগত ত্রুটি এর দুঃখজনক উদাহরণ। এই গবেষণা ওষুধকে আরও নির্ভুল ও নিরাপদ করতে সাহায্য করে।
অর্থনীতি: দাম সামলানোর বিজ্ঞান
অর্থনীতিতে নোবেল পেয়েছেন রবার্ট ই. হল (স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র) ও মাইকেল উডফোর্ড (কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র)। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতি কমাতে ও মন্দা সামলাতে যে মডেল ব্যবহার করে, তার ভিত্তি গড়তে তাঁরা বড় ভূমিকা রেখেছেন। উডফোর্ডের মূল কথা: মানুষ ভবিষ্যতে দাম কেমন হবে বলে আশা করে, সেটাই দামকে অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষ যদি বিশ্বাস করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দাম স্থির রাখবে, তাহলে ব্যবসায়ীরাও সেভাবে দাম ও মজুরি ঠিক করেন, আর কম কষ্টে মূল্যস্ফীতি কমে আসে। হলের কাজ দেখিয়েছে, অর্থনৈতিক ধাক্কায় চাকরির বাজার ও বেকারত্ব কীভাবে বদলায়।
বাংলাদেশ কী নিতে পারে
মূল্যস্ফীতি: আস্থাই বড় অস্ত্র। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ। কয়েক বছর ধরে মজুরি বাড়ছে দামের চেয়ে ধীরে। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশে রেখে সতর্ক করেছে, তাড়াহুড়া করে সুদ কমালে মানুষের মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা আবার বেড়ে যেতে পারে। হল-উডফোর্ডের শিক্ষা হলো, শুধু সুদহার দিয়ে হবে না – দরকার মূল্যস্ফীতির স্পষ্ট লক্ষ্য, সহজ বাংলায় সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক চাপমুক্ত ধারাবাহিক নীতি এবং জ্বালানি, রাজস্ব ও ব্যাংক খাতের সংস্কার।
ওষুধশিল্প: রসায়নের সুযোগ। নভেম্বর ২০২৬-এ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর পেটেন্ট-সংক্রান্ত ট্রিপস ছাড় ধীরে ধীরে উঠে যাবে। অথচ ওষুধের কাঁচামাল (এপিআই) প্রায় পুরোটাই ভারত ও চীনের মতো দেশ থেকে আমদানি হয়। শিল্প-সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ সতর্ক করেছেন, ছাড় উঠে গেলে ইনসুলিনের মতো জরুরি ওষুধের দাম অনেক বেড়ে যেতে পারে। দেশে কাঁচামাল, বিশেষ করে সঠিক রূপের অণু তৈরি করতে ঠিক কাগঁ-সোয়াইয়ের ধারার রসায়ন লাগে। তাই এপিআই শিল্পপার্কে উৎপাদন বাড়ানো, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের যৌথ গবেষণাগার গড়া এবং মান নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা জরুরি।
মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য: আগে বিজ্ঞান গড়া। মানসিক রোগ, মৃগী, স্ট্রোক ও স্মৃতিভ্রংশ অনেক পরিবারের নীরব বোঝা, অথচ শহরের বাইরে চিকিৎসা খুবই কম। অপটোজেনেটিক্স শিগগির হাসপাতালে আসবে না, কিন্তু তরুণ স্নায়ুবিজ্ঞানী ও গবেষণাগার তৈরি করলে নতুন চিকিৎসা এলে দেশ তা দ্রুত গ্রহণ করতে পারবে। পাশাপাশি দরকার এলাকাভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কুসংস্কার দূর করা।
পদার্থবিজ্ঞান: যৌথ বিজ্ঞানের শক্তি। নিউট্রিনো দিয়ে চালের দাম কমবে না, এমন দাবি করা সৎ হবে না। এর শিক্ষা হলো, আইসকিউব সফল হয়েছে ধৈর্যশীল অর্থায়ন আর ১৪টি দেশের সহযোগিতায়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন আন্তর্জাতিক গবেষণায় যুক্ত হলে শিক্ষার্থীরা সেন্সর, বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ ও কম্পিউটিং শিখবে – যা কাজে লাগবে বন্যার পূর্বাভাস ও জলবায়ু মোকাবিলায়।
বড় শিক্ষা
এ বছরের নোবেলজয়ীরা বাংলাদেশের জন্য কাজ করেননি। তবু প্রতিটি আবিষ্কার মূল্যবান হয়েছে, কারণ কোনো না কোনো দেশ সেই মানুষ ও প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছিল, যারা একে কাজে লাগাতে পেরেছে। এলডিসি উত্তরণ আর নাছোড় মূল্যস্ফীতির এই সময়ে কথাটি আমাদের জন্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। স্টকহোম থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে কাজের শিক্ষা কোনো একক আবিষ্কার নয় – বরং গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠান আর মৌলিক বিজ্ঞানকে জাতীয় শক্তিতে রূপ দেওয়ার ধৈর্য।
লেখক-
ড. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন
অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়;
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ ২% বিজ্ঞানীদের একজন।


















