চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬

ক্যানসার হাসপাতালের পাশে ‘রোগীনিবাস’: একটি সহজ কিন্তু জরুরি সমাধান

প্রফেসর ডা. খন্দকার এ কে আজাদ

১৬ অক্টোবর, ২০২৬ | ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ

দেশের আটটি বিভাগে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার হাসপাতাল চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। এসব হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বিশেষায়িত ক্যানসার চিকিৎসাকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে যাওয়ার একটি বড় সুযোগ তৈরি হবে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিনিয়োগ। কিন্তু এই অবকাঠামো গড়ে ওঠার সময়ই সরকারের সামনে আরেকটি ছোট অথচ অত্যন্ত মানবিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, প্রতিটি বিভাগীয় ক্যানসার হাসপাতালের পাশে দরিদ্র ও প্রান্তিক রোগী এবং তাঁদের সঙ্গে আসা স্বজনদের জন্য একটি স্বল্পমূল্যের ‘রোগী নিবাস’ গড়ে তোলা। এটি বিলাসিতা নয়- comprehensive cancer care- এর একটি মানবিক ও প্রয়োজনীয় অংশ।

 

যে দৃশ্য আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে : একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন সেই দৃশ্যগুলোর কথা, যা সংবাদমাধ্যমে বারবার আমাদের সামনে আসে। ঢাকার জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালের সামনে খোলা আকাশের নিচে মাদুর বিছিয়ে রাত কাটাচ্ছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা। কেউ কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি নিয়ে দুর্বল শরীরে, বমিভাব ও ক্লান্তি নিয়ে শক্ত মাটিতে শুয়ে আছেন,পরদিন আবার চিকিৎসা নেওয়ার অপেক্ষায়। পাশে জেগে আছেন স্ত্রী, স্বামী কিংবা সন্তান। এটি শুধু একটি দিনের ছবি নয়। বছরের বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের অসহায় দৃশ্য আমাদের চোখে পড়ে। আহারে জীবন,সত্যিই, কী কঠিন বাস্তবতা! কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বাস্তবতা কি আমরা বদলাতে পারি না? একটি নিরাপদ আশ্রয় কি সত্যিই এত ব্যয়বহুল? এর জন্য জাঁকজমকপূর্ণ ভবন বা দামি যন্ত্রপাতির প্রয়োজন নেই।

দরকার মাথার ওপর নিরাপদ ছাদ ও পরিচ্ছন্ন বিছানা, নারী-পুরুষের পৃথক থাকার ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার ও বিশুদ্ধ পানি, স্বল্পমূল্যের খাবার বা যৌথ রান্নাঘর, রোগীর সঙ্গে আসা পরিচর্যাকারীর সীমিত থাকার সুযোগ, প্রাথমিক নার্সিং সহায়তা এবং জরুরি প্রয়োজনে হাসপাতালের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা,এটুকু কি আমাদের সামর্থ্যের বাইরে? নাকি একই দৃশ্য বারবার দেখতে দেখতে তা আর আমাদের স্পর্শ করে না? ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই একজন মানুষের জন্য কি যথেষ্ট কঠিন নয়? এর সঙ্গে আশ্রয়ের জন্য আরেকটি লড়াই কেন যোগ হবে?

 

চিকিৎসার অদৃশ্য ব্যয় : ক্যানসার চিকিৎসার ব্যয় বলতে আমরা সাধারণত অপারেশন, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, পরীক্ষা ও ওষুধের খরচ বুঝি। কিন্তু একজন রোগীর বাস্তব চিকিৎসাযাত্রার ব্যয় এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির জন্য অনেক রোগীকে কয়েক সপ্তাহ ধরে নিয়মিত হাসপাতালে আসতে হয়। দূরের জেলা থেকে আসা স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য তখন থাকা, খাওয়া, যাতায়াত এবং সঙ্গে থাকা স্বজনের ব্যয়ও চিকিৎসার আর্থিক বোঝার অংশ হয়ে দাঁড়ায়।
২০২৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশের তিনটি হাসপাতালভিত্তিক একটি গবেষণায় একজন ক্যানসার রোগীর পরিবারের গড় বার্ষিক out-of-pocket ব্যয় প্রায় ৬,৫০৪ মার্কিন ডলার, যা গড় বার্ষিক পারিবারিক আয়ের দ্বিগুণেরও বেশি। মোট ব্যয়ের প্রায় ১৭ শতাংশ ছিল সরাসরি চিকিৎসাবহির্ভূত ব্যয়; এর মধ্যে থাকা, যাতায়াত, খাবার এবং রোগীর সঙ্গে থাকা পরিচর্যাকারীর খরচ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই আর্থিক চাপের মধ্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ,শুধু চিকিৎসা সাশ্রয়ী করলেই হবে না; রোগী যেন চিকিৎসাটি শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন করতে পারেন, সেই পরিবেশও তৈরি করতে হবে। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন সেই পরিবেশেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

আটটি ক্যানসার হাসপাতালের পাশে আটটি রোগী নিবাস,সিদ্ধান্তটি হোক এখনই : সরকার যখন আটটি বিভাগীয় শহরে ক্যানসার চিকিৎসার নতুন অবকাঠামো গড়ে তুলছে, তখন প্রতিটি হাসপাতালের পাশে একটি স্বল্পমূল্যের রোগী নিবাসের জন্য জায়গা ও পরিচালন কাঠামো নির্ধারণ করা যেতে পারে। এই সাধারণ ব্যবস্থাটুকুই একজন অসহায় মানুষকে ফুটপাত থেকে তুলে একটি নিরাপদ বিছানায় নিয়ে আসতে পারে। একইসঙ্গে চিকিৎসার পুরো সময়টুকু হাসপাতালে যাতায়াত ও ধারাবাহিক চিকিৎসা অনেক সহজ করতে পারে।
আমরা বিপুল অর্থ ব্যয়ে ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণ করছি, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি কিনছি। এর সঙ্গে সামান্য কিছু অতিরিক্ত ব্যয় করলেই একজন অসহায় রোগীর জন্য একটি নিরাপদ বিছানার ব্যবস্থা করা সম্ভব, যেখান থেকে তিনি নিশ্চিন্তে তাঁর পরবর্তী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারবেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সময়। এখনই রোগী নিবাসকে মূল পরিকল্পনার অংশ করা তুলনামূলক সহজ। প্রকল্প শেষ হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে জমি, অর্থ ও অবকাঠামোর ব্যবস্থা করা অনেক কঠিন হয়ে যেতে পারে। তাই প্রস্তাবটি খুবই সরল, আটটি হাসপাতাল, আটটি রোগী নিবাস। সামান্য অতিরিক্ত বিনিয়োগ হাজারো দরিদ্র ও প্রান্তিক ক্যানসার রোগীর চিকিৎসাযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে হাসপাতাল শুধু রোগের চিকিৎসা দেবে না, অসহায় মানুষটির মর্যাদা ও নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দেবে।

 

শেষ কথা : পুরো ক্যানসার চিকিৎসার যাত্রায় রোগী নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করতে পারলেন কি না,সেটিও মানসম্মত ক্যানসার সেবার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।হাসপাতাল যদি হয় চিকিৎসার ঠিকানা, তবে তার পাশের ‘রোগী নিবাস’ হোক আশ্রয়ের ঠিকানা। ক্যানসারের লড়াই এমনিতেই কঠিন,আশ্রয়ের জন্য আরেকটি লড়াই নয়। আটটি হাসপাতালের সঙ্গে আটটি ‘রোগী নিবাস’,সিদ্ধান্তটি হোক এখনই।

 

অধ্যাপক খন্দকার এ. কে. আজাদ
চেয়ারম্যান, পোস্টগ্র্যাজুয়েট সার্জারি একাডেমিয়া,
অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), সার্জারি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট