চট্টগ্রাম বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

‘বৈষম্য এখন আকাশ ছুঁতে যাচ্ছে’ : প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক নীতিগত পদক্ষেপ

‘বৈষম্য এখন আকাশ ছুঁতে যাচ্ছে’ : প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক নীতিগত পদক্ষেপ

আবসার মাহফুজ

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১২:৪০ অপরাহ্ণ

অর্থনৈতিক উন্নয়নের বহুল প্রচারিত সাফল্যের আড়ালে একটি সমাজের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা অনেক সময় চাপা পড়ে যায়। কার হাতে সম্পদ জমা হচ্ছে এবং সেই সম্পদ সৃষ্টির সুফল কার জীবনে কতটা পৌঁছাচ্ছে। জাতীয় আয় বাড়ছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে, নগরায়ণ ও অবকাঠামো সম্প্রসারিত হচ্ছে, নতুন নতুন ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এসবই উন্নয়নের দৃশ্যমান চিত্র। কিন্তু একই সময়ে যদি সমাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ ক্রমাগত বিপুল সম্পদের মালিক হয় এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, বাসস্থান ও নিরাপদ জীবনের মৌলিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে, তাহলে সেই উন্নয়নকে কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক বলা যায়? এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘সৈয়দ হুমায়ুন কবীর স্মৃতি গবেষণা সম্মেলন ২০২৬’-এ বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, গবেষক, মানবাধিকারকর্মী ও বিজ্ঞানীদের বক্তব্যে বাংলাদেশের উন্নয়ন-ভাবনার এই মৌলিক সংকটই নতুন করে সামনে এসেছে। অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, সমাজে মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ জমা হয়েছে এবং বৈষম্য অগ্রহণযোগ্য মাত্রায় পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক কৌশিক বসুও বলেছেন, বৈষম্য আকাশ ছুঁতে যাচ্ছে এবং নীতিগত বিকল্প নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা প্রয়োজন। দুজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের বক্তব্যকে বিচ্ছিন্ন মন্তব্য হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। বরং এগুলো আমাদের উন্নয়ননীতির সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড় করায় আমরা কি এমন একটি অর্থনীতি নির্মাণ করছি, যেখানে প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের বৃহত্তর অংশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে, নাকি সম্পদ ও ক্ষমতা ক্রমেই সীমিতসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে?
 
 
প্যারিস স্কুল অব ইকোনমিকসের প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক অসমতা প্রতিবেদন ২০২৬’-এও বাংলাদেশে ধনী ও দরিদ্রের মাঝে আয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট সম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশই সীমিতসংখ্যক মানুষের দখলে। সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে রয়েছে মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ। এর মধ্যেই শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী নিয়ন্ত্রণ করছেন প্রায় এক-চতুর্থাংশ সম্পদ। বিপরীতে, দেশের ৫০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর হাতে আছে মাত্র ৪.৭ শতাংশ সম্পদ। আয় বণ্টনের বৈষম্যও মোটামুটি একই মাত্রায় রয়েছে। জাতীয় আয়ের ৪১ শতাংশ চলে গেছে শীর্ষ আয়ের ১০ শতাংশ মানুষের কাছে। অথচ নিম্ন আয়ের অর্ধেক জনগোষ্ঠী মিলে পাচ্ছে কেবল ১৯ শতাংশ আয়। উল্লেখ্য, বৈষম্য কোনো সমাজে একদিনে তৈরি হয় না। এটি দীর্ঘদিনের নীতি, প্রতিষ্ঠান, সুযোগ ও সম্পদবণ্টনের ফল। মানুষের আয় ও সম্পদে পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কেউ বেশি পরিশ্রম করেন, কেউ উদ্যোক্তা হিসেবে ঝুঁকি নেন, কেউ নতুন প্রযুক্তি বা ব্যবসায়িক ধারণা উদ্ভাবন করেন। ফলে সাফল্যের মাত্রায় পার্থক্য থাকবেই। কিন্তু সমস্যা তখনই গুরুতর হয়, যখন মানুষের জন্ম, পরিবার, সামাজিক অবস্থান কিংবা প্রাথমিক সম্পদ তার ভবিষ্যৎ সুযোগকে প্রায় পূর্বনির্ধারিত করে দেয়। একটি ধনীপরিবারের সন্তান উন্নত শিক্ষা, পুষ্টি, চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও সামাজিক নেটওয়ার্কের সুবিধা পেয়ে জীবনের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যায়; অন্যদিকে নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তান হয়তো মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ, পুষ্টি, চিকিৎসা বা দক্ষতা অর্জনের পর্যাপ্ত সুযোগ পায় না। তখন বৈষম্য শুধু আয়ের পার্থক্য থাকে না; তা হয়ে ওঠে সুযোগের বৈষম্য। আর সুযোগের বৈষম্য যখন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়, তখন সামাজিক গতিশীলতা কমে যায়। দরিদ্রপরিবার থেকে উঠে আসা মানুষের জন্য অর্থনৈতিক সিঁড়ির ওপরের ধাপে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে একটি সমাজে সম্পদ শুধু জমা হয় না, উত্তরাধিকারসূত্রে ক্ষমতাও জমা হয়। অর্থনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে যদি রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক ক্ষমতা যুক্ত হয়, তাহলে বৈষম্য আরও গভীর ও স্থায়ী রূপ নিতে পারে। আর এই জায়গায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহানের মালিকানার কাঠামোকে আরও বিস্তৃত করার প্রস্তাবটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সম্পদের মালিকানার অধিকারকে আরও বেশি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং এমন মডেল বিবেচনা করা যেতে পারে, যেখানে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় শ্রমিকদেরও অংশীদারি থাকবে। এই ধারণা আমাদের প্রচলিত করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণাকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ দেয়। কোনো কোম্পানি বছরে কিছু অর্থ দান করল, একটি স্কুল তৈরি করল কিংবা কয়েকটি সামাজিক কর্মসূচি পরিচালনা করল এগুলো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু এগুলো যদি প্রতিষ্ঠানের মূলসম্পদ ও মালিকানার কাঠামোকে স্পর্শ না করে, তাহলে সম্পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অংশীদারি প্রতিষ্ঠিত হয় না। শ্রমিক যে প্রতিষ্ঠানে শ্রম দেন, মূল্য সৃষ্টি করেন, সেই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যে তাঁর কোনো দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারি থাকবে না এটি অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। অবশ্যই শ্রমিক-মালিকানা কোনো সরল সমাধান নয়। এর জন্য সুনির্দিষ্ট আইন, করনীতি, শেয়ার ব্যবস্থাপনা, সুশাসন, হিসাবের স্বচ্ছতা ও শ্রমিকের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব প্রয়োজন। শুধু কাগজে কিছু শেয়ার স্থানান্তর করলেই শ্রমিকের ক্ষমতায়ন হবে না। শ্রমিকের অংশীদারিকে কার্যকর অর্থনৈতিক অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশে নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে গভীর গবেষণা ও আলোচনা হওয়া জরুরি।
 
 
করপোরেট সম্পদের একটি অংশ স্থায়ীভাবে জনকল্যাণে ব্যবহারের ধারণাটিও একই কারণে গুরুত্বপূর্ণ। জনকল্যাণকে যদি কেবল দয়া বা দানের বিষয় হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তা ব্যক্তির সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল থাকে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের সম্পদের একটি অংশ স্থায়ীভাবে জনকল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত করার ব্যবস্থা তৈরি হলে তা প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক বিনিয়োগে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা, পরিবেশ, মানবাধিকার ও সামাজিক সুরক্ষার বিপুল চাহিদার তুলনায় সরকারি সম্পদ সীমিত। তাই দায়িত্বশীল বেসরকারি উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে। তবে এর সঙ্গে অবশ্যই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে। জনকল্যাণের নামে গঠিত কোনো ফাউন্ডেশন যদি স্বচ্ছ পরিচালনা, স্বাধীন নিরীক্ষা ও প্রকাশ্য জবাবদিহির বাইরে থাকে, তাহলে উদ্দেশ্য যত মহৎই হোক, দীর্ঘমেয়াদে আস্থা তৈরি হবে না। উন্নয়ন-বিশ্লেষকদের মতে, বৈষম্য মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথগুলোর একটি হলো মানসম্মত ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। কারণ অসুস্থতা দরিদ্রপরিবারের জন্য শুধু একটি স্বাস্থ্যগত সংকট নয়, এটি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও হতে পারে। একজন উপার্জনক্ষম সদস্যের দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা একটি পরিবারকে সঞ্চয় হারাতে, ঋণগ্রস্ত হতে কিংবা সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য করতে পারে। অন্যদিকে ধনীপরিবার উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশ-বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পেলেও দরিদ্রপরিবার অনেক সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটুকুও নিশ্চিত করতে পারে না। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার অসমতা শেষপর্যন্ত আয় ও সম্পদের বৈষম্যকেও আরও বাড়িয়ে দেয়। সক্ষমতাভিত্তিক উন্নয়ন ধারণার মূলকথা হলো মানুষকে শুধু আয় করার সুযোগ দিলেই হবে না, তাকে এমন সক্ষমতা দিতে হবে যাতে সে নিজের জীবনকে অর্থবহভাবে পরিচালনা করতে পারে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, নিরাপদ পরিবেশ ও সামাজিক নিরাপত্তা তাই অর্থনৈতিক নীতির বাইরের বিষয় নয়; এগুলো অর্থনীতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিক্ষার মান নিয়ে সম্মেলনে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামানের উদ্বেগও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। শিক্ষা যদি বৈষম্য কমানোর সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হয়, তাহলে নিম্নমানের শিক্ষা বৈষম্য স্থায়ী করার অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু শিক্ষার মান, দক্ষতা অর্জন, গবেষণা এবং শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। সচ্ছল পরিবার সন্তানকে ভালো স্কুল, অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, ভাষা ও বিভিন্ন দক্ষতার সুযোগ দিতে পারে; নিম্ন আয়ের পরিবার সেই সুযোগ দিতে পারে না। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরেই দুই ধরনের সুযোগ তৈরি হয়। রাষ্ট্রকে তাই শুধু বিদ্যালয়ের সংখ্যা বা শিক্ষার্থী ভর্তির হার দিয়ে সন্তুষ্ট হলে চলবে না। শিক্ষকের মান, পাঠদানের পদ্ধতি, বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষা, প্রযুক্তি ব্যবহার, কারিগরি দক্ষতা, গবেষণা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ সবকিছুর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে ভবিষ্যতের শ্রমবাজার প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ার কারণে দক্ষতা ও জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ছাড়া বৈষম্য কমানো কঠিন হবে।
বৈষম্যের আরেকটি বড় চালিকাশক্তি দুর্নীতি। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সম্মেলনে বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তা এখনও রয়েছে। দুর্নীতির ক্ষতি কেবল সরকারি অর্থের অপচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্নীতি যোগ্যতা ও ন্যায্যতার জায়গায় অর্থ, প্রভাব ও পরিচয়কে বসিয়ে দেয়। একজন যোগ্যব্যক্তি যদি ঘুষ না দেওয়ায় সেবা থেকে বঞ্চিত হন, আর প্রভাবশালী ব্যক্তি নিয়ম ভেঙেও সুবিধা পান, তাহলে সমাজে আস্থার সংকট তৈরি হয়। দুর্নীতি অর্থনীতির প্রতিযোগিতাকেও বিকৃত করে এবং সম্পদের সুষম বণ্টন বাধাগ্রস্ত করে। ফলে বৈষম্য কমাতে হলে শুধু দরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ালেই হবে না; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছ, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করাও জরুরি। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আইনের প্রয়োগ যেমন দরকার, তেমনি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সরলীকরণ, ডিজিটাল সেবা, স্বাধীন নজরদারি ও তথ্যের অধিকারও শক্তিশালী করতে হবে। উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এই বস্তিবাসিদের কাছে যাওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি উন্নয়ন প্রকল্পের নকশায় কোনো বস্তি, বাজার বা বসতিকে হয়তো কেবল একটি জায়গা হিসেবে দেখা যায়; কিন্তু সেখানে বসবাসকারী মানুষের কাছে সেটি জীবিকা, সামাজিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তার ভিত্তি। কোনো উন্নয়ন প্রকল্প যদি একদল মানুষকে আরও নিরাপদ, সক্ষম ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন দেয়, সেটিই প্রকৃত উন্নয়ন। বিপরীতে উন্নয়নের নামে যদি দুর্বল জনগোষ্ঠী উচ্ছেদ, বেকারত্ব কিংবা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে, তাহলে সেই উন্নয়নের সামাজিক মূল্য নতুন করে বিবেচনা করতে হবে। মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা কখনোই পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না। প্রযুক্তিগত বৈষম্য নিয়েও ভাবতে হবে। বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই উদ্ভাবনের কথা বলি, কিন্তু গবেষণার জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, গবেষকদের স্বাধীনতা, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা এবং ফলাফলকে বাণিজ্যিক বা সামাজিক প্রয়োগে নেওয়ার কাঠামো কতটা শক্তিশালী সেই প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। অথচ ভবিষ্যতের অর্থনীতি হবে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবননির্ভর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, জৈবপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জলবায়ু প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্র বিশ্ব-অর্থনীতির চরিত্র বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ যদি গবেষণা ও উদ্ভাবনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ না করে, তাহলে বর্তমানের বৈষম্যের পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত বৈষম্যও তৈরি হবে। 
 
 
আমরা মনে করি, দেশকে সমৃদ্ধির পথ ধরে এগিয়ে নিতে বৈষম্য নিরসনে মনোযোগ দিতেই হবে। মনে রাখা দরকার, বৈষম্য কমানো মানে সম্পদ সৃষ্টি বন্ধ করা নয়; বরং সম্পদ সৃষ্টির সুযোগকে আরও বিস্তৃত করা। উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের সাফল্য প্রয়োজন। কারণ কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বেসরকারি খাত অপরিহার্য। কিন্তু একইসঙ্গে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, করব্যবস্থার ন্যায্যতা, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ এবং জনকল্যাণে করপোরেট অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে পরস্পরের বিপরীত শক্তি হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। বরং একটি সুস্থ অর্থনীতির ভিত্তি হওয়া উচিত এমন ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ সম্পদ সৃষ্টি করতে পারবে, আবার সেই সম্পদ সৃষ্টির সুযোগ এবং সুফলও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে। বাংলাদেশের সামনে এখন শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর প্রশ্ন নয়; প্রশ্নটি হলো কী ধরনের সমাজ আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে চাই। এমন একটি সমাজ, যেখানে জন্মই ভবিষ্যতের সীমা নির্ধারণ করে দেয়; নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শ্রম, মেধা ও উদ্যোগের মাধ্যমে মানুষ নিজের জীবন বদলানোর বাস্তব সুযোগ পায়। আর দেশে বৈষম্য যখন সত্যিই অগ্রহণযোগ্য মাত্রায় পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি করে, তখন এর কাঠামোগত কারণগুলো চিহ্নিত করে নীতিগত সংস্কারের পথে এগোতে হবে। রাষ্ট্র, ব্যবসা, নাগরিকসমাজ ও সাধারণ মানুষ সবার অংশগ্রহণেই এমন একটি অর্থনীতি নির্মাণ করতে হবে, যেখানে সম্পদ থাকবে, সমৃদ্ধি থাকবে, কিন্তু সেই সমৃদ্ধির অধিকার ও সুযোগ কেবল মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের মাপকাঠি তাই শুধু কত সম্পদ সৃষ্টি হলো তা নয়; বরং সেই সম্পদ কতটা ন্যায়সংগতভাবে মানুষের সক্ষমতা, মর্যাদা ও সুযোগে রূপান্তরিত হলো সেটিই হওয়া উচিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
 
পূর্বকোণ/মিফতা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট