চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

চাকরির প্রলোভনে সাইবার স্ক্যাম : মানবপাচারের নতুন ফাঁদ

আবসার মাহফুজ

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ৩:১৩ অপরাহ্ণ

চাকরি মানুষের জীবনে শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়; এটি আত্মমর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার মতো জনবহুল ও শ্রমনির্ভর অঞ্চলে একটি ভালো চাকরি একটি পরিবারের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলে দিতে পারে। তাই বিদেশে আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির প্রস্তাব কিংবা অনলাইনে প্রকাশিত কোনো নিয়োগ বিজ্ঞাপন বেকার তরুণের কাছে হয়ে ওঠে আশার আলো। কিন্তু সেই আশার আলোতেই যদি লুকিয়ে থাকে সাইবার স্ক্যাম ও মানবপাচারের অন্ধকার ফাঁদ, তাহলে বিষয়টি হয় খুবই বেদনাদায়ক।
বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে পাচারের পর সাইবার স্ক্যাম বা অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করার ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ায় বাড়ছে। প্রতারণামূলক অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং অনানুষ্ঠানিক দালালের মাধ্যমে লোকজনকে নিয়োগ দেওয়ার পর তাদের আটকে রেখে অনলাইন স্ক্যাম ও প্রতারণামূলক কর্মকান্ডে বাধ্য করা হচ্ছে। এ ধরনের মানবপাচার মোকাবেলায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ বাড়ানোর আহবান জানিয়েছে জাতিসংঘ। গত ১৬ সেপ্টেম্বর, ঢাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় (ইউএনওডিসি) যৌথভাবে প্রকাশিত এক আঞ্চলিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ‘ট্রাফিকড টু স্ক্যাম : সাউথ এশিয়ান রেসপন্সেস টু ট্রাফিকিং ইন পারসন্স ফর দ্য পারপাস অব ফোর্সড ক্রিমিনালিটি ইন স্ক্যাম অপারেশনস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মঞ্জুর মোরশেদ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য এটি সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। জোরপূর্বক অপরাধে জড়ানোর উদ্দেশ্যে মানবপাচারের ঘটনায় জাতীয় নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও কার্যক্রমের অগ্রাধিকার আরো শক্তিশালী করতে এই প্রতিবেদনের বাস্তবভিত্তিক সুপারিশ সহায়ক হবে।’
বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি বিভাগ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বেসরকারি সংস্থা ও নাগরিক সমাজের ১০৩ জন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ করে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়। গত ২ থেকে ৪ জুন শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক যাচাই কর্মশালায় পাঁচ দেশের প্রতিনিধিরা প্রতিবেদনের খসড়া পর্যালোচনা করে মতামত দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্ক্যাম কার্যক্রমে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের উৎস হিসেবে দক্ষিণ এশিয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। একইসঙ্গে সংগঠিত অপরাধী চক্র দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন স্থানেও স্ক্যাম কার্যক্রম ছড়িয়ে দিচ্ছে। অপরাধীরা নতুন জায়গায় কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি তাদের পুরনো পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনছে।
সংগতকারণে বলতে হয়, সাইবার স্ক্যাম মানবাধিকার, সাইবার নিরাপত্তা এবং আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধের এক ভয়ংকর সমন্বিত রূপ। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয় ইউএনওডিসি ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথভাবে প্রকাশিত সাম্প্রতিক আঞ্চলিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে পাচার করে জোরপূর্বক সাইবার স্ক্যামে যুক্ত করার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর জন্য বড় সতর্কবার্তা। প্রতিবেদনটি মূলত স্পষ্ট করেছে, মানবপাচারের পুরোনো ব্যবসা এখন প্রযুক্তির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন ধরনের অপরাধ অর্থনীতিতে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তৈরি এ প্রতিবেদনে সরকারি সংস্থা, আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের ১০৩ জন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মতামত নেওয়া হয়েছে। ফলে বিষয়টি কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ায় উদীয়মান একটি আঞ্চলিক অপরাধপ্রবণতার ইঙ্গিত।
মানবপাচারের সঙ্গে সাইবার স্ক্যামের এই যোগসূত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ এখানে প্রতারণার শিকার ব্যক্তিকেই আবার প্রতারণার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন চাকরির বিজ্ঞাপন কিংবা অনানুষ্ঠানিক দালালের মাধ্যমে তরুণদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে থাকতে পারে বিদেশে ভালো বেতন, সহজ কাজ, দ্রত ভিসা, বিনামূল্যে থাকা-খাওয়া কিংবা অন্যান্য সুবিধার প্রতিশ্রতি। কর্মসংস্থানের জন্য মরিয়া একজন মানুষ এসব প্রস্তাব যাচাই না করেই গ্রহণ করতে পারেন। এরপর গন্তব্যে পৌঁছানোর পর শুরু হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা। অনেককে আটকে রাখা হয়, চলাফেরায় বাধা দেওয়া হয়, গুরুত্বপূর্ণ নথি কেড়ে নেওয়া হয় এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে অনলাইন প্রতারণা চালাতে বাধ্য করা হয়। একজন মানুষ যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছাড়লেন, শেষপর্যন্ত সেই মানুষটিই অপরাধী চক্রের হাতে পরিণত হন একটি নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল শ্রমশক্তিতে। এই কাঠামোকে শুধু ‘সাইবার স্ক্যাম’ বললে এর মানবিক ভয়াবহতা আড়াল হয়ে যায়; এটি আসলে জবরদস্তিমূলক অপরাধে মানবপাচারের একটি নতুন রূপ। এই অপরাধের আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো অপরাধীদের কৌশলের দ্রæত পরিবর্তন। ইউএনওডিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে শনাক্ত হওয়া স্ক্যাম কার্যক্রমে বড় ও সহজে শনাক্তযোগ্য কম্পাউন্ডের বদলে ছোট ও বিচ্ছিন্ন স্থাপনা ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ভিলা, হোটেল, ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্ট ও অফিসের মতো জায়গা ব্যবহার করে পরিচালিত এসব কার্যক্রম আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজর এড়ানোর সুযোগ বাড়ায়। একটি বড় কম্পাউন্ডে অভিযান চালানো তুলনামূলকভাবে সহজ হলেও শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ছোট স্থাপনায় পরিচালিত অপরাধ শনাক্ত করা অনেক কঠিন। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ডিজিটাল যোগাযোগ, ভুয়া পরিচয়, অনলাইন লেনদেন এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে দ্রুত অর্থ স্থানান্তরের সুবিধা। ফলে অপরাধী নেটওয়ার্ক একটি দেশে মানুষ সংগ্রহ করে অন্য দেশে তাদের আটকে রাখতে পারে, তৃতীয় কোনো দেশের অবকাঠামো ব্যবহার করে অনলাইন অপরাধ চালাতে পারে এবং চতুর্থ কোনো দেশে অর্থ সরিয়ে নিতে পারে। এই বাস্তবতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রচলিত ভৌগোলিক কাঠামোকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
এ কারণেই মানবপাচার ও সাইবার অপরাধকে আলাদা দুটি সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটি ভুক্তভোগীর যাত্রাপথ, যোগাযোগ, ব্যাংক লেনদেন, মোবাইল ফোনের তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট, ভিসা ও ভ্রমণ নথি এবং নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করলে একটি বড় অপরাধী নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া সম্ভব হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এসব তথ্য বিভিন্ন সংস্থা ও দেশের মধ্যে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে। কোথাও অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য আছে, কোথাও পুলিশের কাছে, কোথাও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার কাছে, আবার কোথাও প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের কাছে। এই বিচ্ছিন্নতাই অপরাধীদের সুযোগ করে দেয়। তাই তথ্য বিনিময়ের কার্যকর ব্যবস্থা, যৌথ তদন্ত এবং ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। শুধু কয়েকজন মাঠপর্যায়ের কর্মী বা দালালকে গ্রেপ্তার করলে এই অপরাধের মূল কাঠামো ভাঙা সম্ভব নয়; অর্থের উৎস, নিয়োগ নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পুরো চেইন অনুসরণ করতে হবে। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক প্রশ্নটি হলো কে অপরাধী এবং কে ভুক্তভোগী? স্ক্যাম অপারেশনে কাজ করতে দেখা গেলেই একজন ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়। ইউএনওডিসির প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে অনেক মানুষ প্রতারণা, ভয়, জবরদস্তি বা আটকে রাখার কারণে সাইবার অপরাধে যুক্ত হতে বাধ্য হতে পারেন। বাইরে থেকে তিনি অপরাধী চক্রের একজন কর্মী হিসেবে দেখা গেলেও বাস্তবে তিনি একই চক্রের হাতে পাচারের শিকার হতে পারেন। তাই উদ্ধারকৃত ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় শুধু তিনি কী করেছেন তা নয়, কীভাবে সেখানে পৌঁছেছেন, কে তাকে নিয়োগ করেছে, তার স্বাধীনভাবে চলে যাওয়ার সুযোগ ছিল কি না এবং তাকে কী ধরনের চাপ বা ভয় দেখানো হয়েছে এসব প্রশ্নও বিবেচনায় নিতে হবে। মানবপাচারের প্রত্যক্ষ পরিণতিতে বাধ্য হয়ে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও মানবাধিকারভিত্তিক নীতির প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় প্রকৃত অপরাধী আড়ালে থাকবে, আর তার হাতে নির্যাতিত ব্যক্তিই শাস্তি পাবেন।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় ঝুঁকিটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিদেশে কর্মসংস্থান দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বপ্ন। এই স্বপ্নের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী ও দালালদের দীর্ঘদিনের প্রভাব রয়েছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সেই পুরোনো দালালচক্রকে নতুন প্রযুক্তি ও নতুন গ্রাহক পৌঁছানোর সুযোগ দিয়েছে। আগে কোনো গ্রামের বাজারে বা স্থানীয় পরিচিতির মাধ্যমে যে প্রতারণা সীমাবদ্ধ থাকত, এখন একটি ভুয়া ফেসবুক পেজ, ওয়েবসাইট বা অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তা হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। ফলে বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে ডিজিটাল যাচাইব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বৈধ, কোন এজেন্সি অনুমোদিত, চাকরির চুক্তি বাস্তব কি না এবং ভিসার তথ্য সঠিক কি না এসব যাচাইয়ের সুযোগ সাধারণ মানুষের জন্য সহজ করতে হবে। সরকারি ওয়েবসাইট ও হেল্পলাইন থাকলেই হবে না; সেগুলোকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে একজন স্বল্পশিক্ষিত চাকরিপ্রার্থীও সহজে তথ্য যাচাই করতে পারেন। সচেতনতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অস্বাভাবিক উচ্চবেতন, খুব অল্পসময়ে বিদেশ যাওয়ার প্রতিশ্রতি, বিনা অভিজ্ঞতায় আকর্ষণীয় চাকরি, নিয়োগের আগে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি, কোম্পানির ঠিকানা বা পরিচয় অস্পষ্ট থাকা কিংবা ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানোর চাপ এসবকে সম্ভাব্য প্রতারণার সংকেত হিসেবে চিহ্নিত করার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও নিরাপদ অভিবাসন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া যেতে পারে। বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক ও সহজবোধ্য প্রশিক্ষণ চালু করা হলে ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একইসঙ্গে বিদেশফেরত শ্রমিকদের অভিজ্ঞতাও প্রচারের মাধ্যমে অন্যদের সতর্ক করা যেতে পারে।
অপরাধ দমনের পাশাপাশি পাচার প্রতিরোধে প্রযুক্তি-কোম্পানিগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন ছড়িয়ে যদি মানুষকে পাচারের ফাঁদে ফেলা হয়, তাহলে সন্দেহজনক নিয়োগ বিজ্ঞাপন শনাক্ত ও দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার। একইসঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈধ ও স্বচ্ছ সহযোগিতার কাঠামো থাকা উচিত। কারণ প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম অপরাধীদের জন্য যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করেছে, একই প্রযুক্তি অপরাধ শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়টিও এখন নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিবেদনের আলোকে স্পষ্ট, একটি দেশের একার পক্ষে এই অপরাধ পুরোপুরি মোকাবিলা করা কঠিন। মানবপাচারকারী যে দেশে ভুক্তভোগী সংগ্রহ করছে, স্ক্যাম পরিচালনা করছে কিংবা অর্থ স্থানান্তর করছে প্রতিটি স্তরে ভিন্ন দেশের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। তাই তথ্য বিনিময়, যৌথ তদন্ত, প্রত্যর্পণ সহযোগিতা, ভুক্তভোগী প্রত্যাবাসন এবং আন্তঃদেশীয় আর্থিক গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি কার্যকর সমন্বিত কাঠামো গড়ে উঠলে অপরাধী চক্রের জন্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে সরে গিয়ে আইনের ফাঁক ব্যবহার করা কঠিন হবে।
শেষপর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু কতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো, কতটি স্ক্যাম সেন্টার বন্ধ হলো কিংবা কতটি মামলা হলো তা নয়। মূল প্রশ্ন হলো, একজন মানুষ কেন এই ফাঁদে পড়লেন, কে তাকে সেখানে নিয়ে গেল, কীভাবে তাকে আটকে রাখা হলো এবং কীভাবে অপরাধী নেটওয়ার্কটি বছরের পর বছর নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। মানবপাচার প্রতিরোধে তাই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে অপরাধীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, ভুক্তভোগীর পূর্ণ সুরক্ষা এবং পাচারের সুযোগ সৃষ্টি করে এমন পরিস্থিতি প্রতিরোধ। ইউএনওডিসির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন দক্ষিণ এশিয়ার সামনে সেই বাস্তবতাই তুলে ধরেছে। এখন প্রয়োজন প্রতিবেদনকে আরেকটি আনুষ্ঠানিক দলিল হিসেবে রেখে না দিয়ে এর সুপারিশগুলোকে জাতীয় ও আঞ্চলিক কর্ম পরিকল্পনায় রূপ দেওয়া। চাকরির স্বপ্ন যেন প্রতারণার বিজ্ঞাপনে বন্দি না হয়, বিদেশযাত্রা যেন সাইবার দাসত্বের পথে না ঠেলে দেয় এবং মানবপাচারের শিকার মানুষ যেন অপরাধীর পরিচয়ে হারিয়ে না যান এই তিনটি লক্ষ্য সামনে রেখেই রাষ্ট্র, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একযোগে এগোতে হবে।

পূর্বকোণ/পল্লবী

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট