৮ সেপ্টেম্বর দেশসেরা আঞ্চলিক পত্রিকা দৈনিক পূর্বকোণের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘চট্টগ্রামের সকাল কি আর পরিচ্ছন্ন হবে না?’ শীর্ষক সম্পাদক মহোদয়ের একটি মন্তব্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তারই ধারবাহিকতায় ১২ অক্টোবর ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথ থেকেই সূচনা হোক পরিচ্ছন্ন নগরীর’ শীর্ষক তাঁর আরও একটি প্রতিবেদন এসেছে একই পত্রিকায়। প্রতিবেদন দুটি পড়ার পর আজ আমার এই লেখার অবতারণা। বিষয়টি নিয়ে পরে আসছি।
প্রিয় চট্টগ্রাম ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম অঙ্গরাজ্য টেক্সাসের ডালাসে এসেছি তিন বছর পেরিয়েছে। পরিপাটি করে সাজানো এই সিটির খানাখন্দবিহীন সড়ক এবং আশেপাশে কোনো ময়লা-আবর্জনা নেই, যানজট ও জলজট নেই, ট্রাফিক নেই। রাস্তায় শত শত গাড়ি চলছে অত্যাধুনিক ট্রাফিক সিগনালে, অথচ কোনো হর্নের শব্দ নেই। শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণ নেই। আপনি যখনই ঘর থেকে বেরোন নগরীতে কোথাও ময়লা-আবর্জনা দেখতে পাবেন না। চোখে পড়বে না তেমন পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার। এমনকি বাসভবনের বারান্দায় কোনো কাপড়ও ঝুলতে দেখবেন না।
ডালাস শহরের বর্জ্যব্যবস্থাপনা বা আবর্জনা অপসারণ মূলত পরিচালনা করে City of Dallas Department of Sanitation Services.ডালাসের একক পরিবার (Single-family) এবং ডুপ্লেক্স বাড়িগুলোর জন্য সিটিপ্রশাসন নিজেই একমাত্র বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান। সাধারণ গৃহস্থালির বর্জ্য (ধূসর কার্ট) এবং রিসাইকেল বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য (নীল কার্ট) সপ্তাহে একবার একই দিনে সংগ্রহ করা হয়। আবর্জনা সংগ্রহের দিন সকাল ৭টার মধ্যে (অথবা আগের দিন সন্ধ্যা ৬টার পর) আপনার কার্টটি রাস্তা বা গলির নির্ধারিত স্থানে রাখতে হবে। কার্টের দুই পাশে অন্তত ৩ ফুট এবং পেছনে ১.৫ ফুট জায়গা ফাঁকা রাখা বাধ্যতামূলক। রিসাইকেল করার জিনিসগুলো প্লাস্টিক ব্যাগে না ভরে সরাসরি নীল কার্টে খোলা অবস্থায় রাখতে হবে। কেননা, প্লাস্টিক ব্যাগ রিসাইক্লিংয়ের প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে।
ডালাসের বাসিন্দারা চাইলে নিজেদের গাড়ি বা ছোট ট্রেইলারে করে সরাসরি সিটি নির্ধারিত ল্যান্ডফিল এবং ট্রান্সফার স্টেশনগুলোতে গিয়ে ফ্রিতে আবাসিক বর্জ্য বা রিসাইকেল সামগ্রী ফেলে আসতে পারেন। এর জন্য ডালাসের বাসিন্দা হওয়ার প্রমাণপত্র (যেমন—পানির বিল বা ড্রাইভিং লাইসেন্স) দেখাতে হয়। কমার্শিয়াল প্রপার্টি এবং বহুতল অ্যাপার্টমেন্টগুলোর (Multi-family) ক্ষেত্রে সিটিপ্রশাসনের রোল কার্ট সেবা নেওয়া যেতে পারে (সর্বোচ্চ ১০টি কন্টেইনার)। চাইলে সিটি অনুমোদিত প্রাইভেট বেসরকারি ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কন্টেইনার বা ডাম্পস্টার ভাড়া নেওয়া যায়। প্রতি মাসে একবার বড় আকারের বর্জ্য যেমন—আসবাবপত্র, বড় অ্যাপ্লায়েন্স বা গাছের ডালপালা সংগ্রহ করা হয়। মাসে সর্বোচ্চ ১০ কিউবিক ইয়ার্ড পর্যন্ত এই ধরনের বর্জ্য বিনামূল্যে দেওয়া যায়। এখানকার সুপারশপগুলোতে প্লাস্টিক, এলুমিনিয়াম ও ট্রাস- এই তিন বর্জ্যের আলাদা ট্রাস ক্যান থাকে। সবাই নির্ধারিত বিনে নির্দিষ্ট বর্জ্য ফেলে। নাগরিকরা এ ব্যাপারে খুবই সচেতন।
সুবিশাল অত্যাধুনিক শপিংমল থেকে শুরু করে অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মেডিকেল সেন্টার, ফুড শপ, পার্লার, বিনোদন স্পট সবখানেই বিনের ছড়াছড়ি। ডালাসে বর্জ্য রিসাইক্লিং ও স্ক্র্যাপ মেটাল সংগ্রহের জন্য বেশকিছু নির্ভরযোগ্য সরকারি ও বেসরকারি রিসাইক্লিং সেন্টার রয়েছে। এসব সেন্টার সবধরণের মেটাল, ব্যাটারি, ইলেকট্রনিক্স এবং লাইট বাল্ব রিসাইকেল করে এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে তা কিনে নেয়। এখানে জনসাধারণের জন্য একটি ডেডিকেটেড ‘বাই-ব্যাক সেন্টার’ (Buy-Back Center) রয়েছে, যেখানে আপনি নির্দিষ্ট রিসাইক্লেবল উপাদান বিক্রি করতে পারবেন। ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক বর্জ্য যেমন ঘরের ব্যাটারি, পুরোনো পেইন্ট, সার বা রাসায়নিক উপাদান থাকে, সেগুলো সাধারণ ডাস্টবিনে না ফেলে ডালাস কাউন্টির নির্ধারিত কেন্দ্র ডালাস হোম কেমিক্যাল কালেকশন সেন্টারে দিয়ে আসতে হয়। ডালাসে সাধারণ আবর্জনার বিনে বা কার্বসাইড রিসাইকেলিং বিনে ই-বর্জ্য (যেমন: কম্পিউটার, টেলিভিশন, ফোন, মনিটর ইত্যাদি) ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
ডালাসে মেডিকেল বর্জ্য (Medical Waste) ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। ডালাসে মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন এবং ধ্বংস করার বিষয়টি টেক্সাস কমিশন অন এনভায়রনমেন্টাল কোয়ালিটি (TCEQ) এবং ওশা (OSHA)-এর নিয়মাবলী (টেক্সাস অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কোড চ্যাপ্টার) অনুযায়ী পরিচালিত হয়। চিকিৎসাকেন্দ্রে উৎপাদিত বর্জ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এটি সাধারণ ময়লার সাথে ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিশেষ করে রাসায়নিক, মেডিকেল ও ই-বর্জ্যের জন্য প্রশাসন খুবই সতর্ক। চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশে যেভাবে পোস্টার ও ব্যানার নৈরাজ্য চলে এখানে সেটি কল্পনাও করা যায় না। আর দেওয়াল লিখনের প্রশ্নই আসে না। ডালাস (Dallas) নগরীতে যত্রতত্র পোস্টার, ব্যানার বা বিজ্ঞাপন লাগানো সম্পূর্ণ বেআইনি। ডালাস শহরের কোড অফ অর্ডিন্যান্স (Dallas) অনুযায়ী এ বিষয়ে কঠোর নিয়ম রয়েছে।
ল্যাম্পপোস্ট, ইউটিলিটি বা বৈদ্যুতিক খুঁটি, টেলিফোন পোল, সেলুলার টাওয়ারের খুঁটি বা রাস্তার পাশের গাছে কোনো নোটিশ, পোস্টার বা কাগজ লাগানো দণ্ডনীয় অপরাধ। ডালাসের যেকোনো সরকারি ভবন বা কাঠামোতে ব্যানার বা পোস্টার লাগানো যায় না। জমির মালিকের লিখিত অনুমতি নিয়ে ব্যক্তিগত জমিতে সাই বা ইয়ার্ড সাইন (Yard sign) লাগানো যেতে পারে, তবে তা অবশ্যই শহরের সাইন কোড মেনে হতে হবে। বিশেষ অনুষ্ঠান, উৎসব বা পাবলিক ইভেন্টের জন্য অনুমোদিত স্ট্রিটলাইট পোলে ব্যানার লাগানোর সুযোগ থাকে, তবে এর জন্য ডালাস শহরের অফিস অফ স্পেশাল ইভেন্টস-এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট আবেদন ও অনুমতি নিতে হয় (বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন এক্ষেত্রে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)। নির্বাচন বা প্রচারণার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। এগুলো শুধু অনুমোদিত নির্বাচনকালীন সময়ে নির্দিষ্ট পোলিং লোকেশনে এবং নির্ধারিত মাপে (সাধারণত ২০ বর্গফুটের নিচে ও ৮ ফুট উচ্চতার মধ্যে) লাগানো যায়। নিয়ম ভঙ্গ করলে ডালাস সিটি কোড কমপ্লায়েন্স বিভাগ (Dallas Code Compliance) জরিমানা করতে পারে অথবা ব্যানার ও পোস্টার জব্দ বা অপসারণ করতে পারে।
এবার আসি মাতৃভূমি প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত চট্টগ্রাম হলো দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর ও অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। এখানে কর্ণফুলীর মোহনায় রয়েছে দেশের প্রধান সামুদ্রিক বন্দর। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান সিংহভাগ—প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ—চট্টগ্রাম বন্দর (Chittagong Port) দিয়ে পরিচালিত হয়। যা অর্থনীতিতে বড় অবদান রেখে চলেছে। টেক্সটাইল, তৈরি পোশাক (RMG),জাহাজ নির্মাণ, ইস্পাত ও ভারী শিল্পসহ বিভিন্ন রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (EPZ) এখানে গড়ে উঠেছে। জাতীয় জিডিপিতে চট্টগ্রাম অঞ্চলের অবদান প্রায় ১৯.৫% এবং এটি ঢাকার পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল। এজন্য চট্টগ্রামকে অর্থনীতির লাইফ লাইন বলা হয়। অথচ ‘প্রাচ্যের রানি’ খ্যাত চট্টগ্রাম শহরটি বর্তমানে তীব্র দখল ও পরিবেশ দূষণে তার ঐতিহ্যবাহী রূপ হারিয়ে চরম অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বর্জ্যব্যবস্থাপনার অভাব এবং নদী-পাহাড় দখলের কারণে এই উপকূলীয় নগরীর পরিবেশ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী প্রায় ৬০ বর্গমাইল আয়তনের চট্টগ্রাম নগরীর লোকসংখ্যা ৩২ লাখ ৩০ হাজার ৫০৭ জন। তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নিজস্ব প্রাক্কলন অনুযায়ী এই সংখ্যা প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ (যার মধ্যে ১৫ লাখ ভামসমান মানুষ রয়েছে)। ক্রমবর্ধমান এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বর্জ্যব্যবস্থাপনায় হিমসিম খাচ্ছে চসিক। লজিস্টিকস ও জনবলের ঘাটতি, সনাতন পদ্ধতির ওপর নির্ভরতা, উপযুক্ত অবকাঠামোর অভাব, সর্বপরি সেবাসংস্থাসমূহের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এর প্রধান কারণ।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), ওয়াসা ও চসিকের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয়ের অভাবে নালা-নর্দমা পরিষ্কার ও বর্জ্য অপসারণের কাজগুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন হয় না। নগরীতে চসিকের হালিশহর ডাম্পিং স্টেশন ও আরেফিন নগর ডাম্পিং স্টেশন রয়েছে। এই দুটি ডাম্পিং স্টেশনই বর্তমানে তাদের ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। চট্টগ্রামে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। চসিক নিজেদের ব্যবস্থাপনায় প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২২০০ টন বর্জ্য অপসারণ করতে পারে। বাকি বর্জ্য খাল ও ড্রেনে থেকে যায়, যা জলাবদ্ধতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাংবাদিক
পূর্বকোণ/আদর



















