চট্টগ্রাম শনিবার, ২০ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

কোরবানির কাঁচা চামড়া

কম দরে ছাড়াল লক্ষ্যমাত্রা

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

২২ জুন, ২০২৪ | ১০:৪১ পূর্বাহ্ণ

গত দুই বছরের তুলনায় এবার কিছুটা বেড়েছে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ। চলতি বছর চট্টগ্রাম নগরী ও উপজেলায় প্রায় তিন লাখ ৬১ হাজার পিস কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। জেলা-উপজেলায় লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে সংগৃহিত পশুর চামড়া।

 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, গত বছর চট্টগ্রামে তিন লাখ ১৯ হাজার পিস চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছিল। এর আগের বছর (২০২২ সাল) সংগ্রহ হয়েছিল তিন লাখ ৪৩ হাজার ২৫০ পিস। চলতি মৌসুমে সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে তিন লাখ। সংগ্রহ হয়েছে তিন লাখ ৬০ হাজার ৯৫০ পিস।

 

 

চলতি মৌসুমে চামড়া সংগ্রহ কিছুটা বাড়লেও দাম কিন্তু বাড়েনি। কোরবানিদাতাদের ভাষ্য মতে, পানির দরে বিক্রি হয়েছে কোরবানির পশুর চামড়া। বোয়ালখালীর পশ্চিম গোমদণ্ডী এলাকার মো. বাবুল বলেন, ‘দুই-তিন বছর ধরে চামড়া কেনার লোক পাওয়া যায় না। তাই গাউসিয়া কমিটিকে দিয়ে দিই।’

 

গোমদণ্ডী এলাকার ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন এক সময় চামড়া ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। লোকজন দিয়ে বাড়ি বাড়ি সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন। কয়েক বছর লোকসান দেওয়ার কারণে তিনি এখন আর চামড়া ব্যবসা করেন না। জসিম বলেন, ‘চামড়া কেনার লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই মাদ্রাসায় দিয়ে দিয়েছি।’

 

 

কোরবানিদাতা অন্তত ১০ জনের সঙ্গে কথা হয়। গরু কিনেছেন এক থেকে দেড় লাখ টাকায়। তারা বলেন, চামড়া বিক্রি করেছেন দুই থেকে তিন শ টাকা দরে। তাদের মধ্যে দুইজনের চামড়া বিক্রি করতে না পেরে মাদ্রাসায় দান করে দিয়েছেন।

 

 

২০১৯ সালে চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর চামড়ায় বড় ধরনের ধস নেমেছিল। চামড়া বিক্রি করতে না পারায় নগরীর বিভিন্ন স্থানে চামড়া ফেলে দিয়েছিলো মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। শুধু তাই নয়, চামড়া সংগ্রহকারী বিভিন্ন মাদ্রাসা, এতিমখানা চামড়া বিক্রি করতে না পেরে ফেলে দিতে হয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন রাস্তা থেকে দেড় লক্ষাধিক চামড়া কুড়িয়ে নিয়ে ডাম্পিংয়ে ফেলে দিয়েছে।

 

 

চামড়ার নৈরাজ্য ঠেকাতে বাড়ি বাড়ি থেকে চামড়া সংগ্রহ করে গাউসিয়া কমিটি। এবারও লক্ষাধিক পিস চামড়া সংগ্রহ করেছেন বলে জানান গাউসিয়া কমিটির যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট মুছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার। গতকাল তিনি পূর্বকোণকে বলেন, মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা শাখার সংগৃহীত চামড়া ২২০-২৮০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়েছে। তবে কয়েজটি স্থানে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।’ দাম ভালো পাননি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গবির-মিসকিনের হক ও জাতীয় সম্পদ চামড়া যাতে নষ্ট না হয়, সেজন্য গাউসিয়া কমিটি এই উদ্যোগ নিয়েছে। এবারও ভালো দাম না পাওয়ায় আগামীতে জেলা-উপজেলায় লবণ দিয়ে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে।’

 

 

এবার ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট চামড়ার দর ৫০ থেকে ৫৫ টাকা নির্ধারণ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সেই হিসাবে এক থেকে দেড় লক্ষাধিক টাকা দামের একটি গরুর চামড়ার দর অন্তত এক হাজার টাকার বেশি হওয়ার কথা।

 

 

সীতাকুণ্ডের মেীসুমী ব্যবসায়ী রফিকুন নবী ও পটিয়া আবদুল হক অভিযোগ করেন, ‘সরকারের নির্ধারিত দামে চামড়া কিনেননি আড়তদাররা। সরকারের নজরদারি না থাকায় নামমাত্র মূল্যে চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে।’ নগরের আগ্রাবাদ এলাকার একাধিক মৌসুমী ব্যবসায়ী জানান, আড়তদাররা পানির দরে চামড়া কিনেছেন। এতে লাভের চেয়ে লোকসান গুনতে হয়েছে। কয়েকজন বিক্রি করতে না পেরে পুঁতে ফেলেছেন।

 

 

মৌসুমী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে বেঁধে দেওয়া দরে এবারও চামড়া ক্রয় করেননি আড়তদাররা। অন্যান্য বছরের মতো সিন্ডিকেট করে পানির দরে চামড়া কিনেছেন আড়তদাররা। তবে আড়তদাররা জানান, গতবারের চেয়ে এবার কিছুটা বাড়তি দামে চামড়া কিনেছেন তারা।

 

 

বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী-আড়তদার সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন বলেন, ‘এবার চট্টগ্রামে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। দেশের সম্পদ নষ্ট হয়নি।’ তিনি দাবি করেন, ‘ছোট আকারের চামড়া ৩-৪শ টাকা, মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ৫-৬ শ টাকা এবং বড় আকারের গরুর চামড়া ৭-৯শ টাকা দরে কিনেছেন আড়তদাররা।’

 

 

কম দামে চামড়া কেনার অভিযোগের বিষয়ে সভাপতি মুসলিম উদ্দিন বলেন, মৌসুমী ব্যবসায়ীরা বাড়ি বাড়ি থেকে চামড়া সংগ্রহ করেছেন। সেই চামড়া তিন-চার হাত ঘুরে আতুরার ডিপো এলাকার আড়তে আসে। কোরবানিদাতা থেকে আড়তে আসতে দাম অন্তত দু-তিন বেড়ে যায়।

 

 

চামড়া আড়তদার সমিতির সহ-সভাপতি আবদুল কাদের বলেন, ‘একটি চামড়ায় লবণ, শ্রমিক, পরিবহন ও গুদাম খরচ মিলে ৩২০ টাকা। ঢাকা পৌঁছাতে খরচ হয় প্রায় ৫শ টাকা খরচ হয়। এছাড়াও বিক্রির সময় ১৫-২০ শতাংশ চামড়া বাদ দেন ট্যানারি মালিকেরা।’ তিনি বলেন, ‘২০১৫-২০১৮ সালের প্রায় ২৫ কোটি টাকা এখনো ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে আটকে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্রমাগত লোকসান গুনে বেশিরভাগ আড়তদার ও ব্যবসায়ী ফতুর হয়ে দেউলিয়া হয়ে পড়েছে।’

 

 

আড়তদার সমিতির তথ্য মতে, চলতি বছর তিন লাখ ৬০ হাজার ৯৫০ পিস চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। এরমধ্যে গরুর চামড়া দুই লাখ ৯৭ হাজার ১৫০ পিস। মহিষের চামড়া ১২ হাজার দুই শ পিস। ছাগলের চামড়া ৫১ হাজার ৬শ পিস।

পূর্বকোণ/এসএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট