চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

মূল্যস্ফীতির প্রভাব কোরবানিতে

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

১৬ জুন, ২০২৪ | ২:৪০ অপরাহ্ণ

বোয়ালখালীর গোমদণ্ডী এলাকার ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন। গেল বছর কোরবানির পশু কিনেছেন এক লাখ ৩০ হাজার টাকায়। এবার বাজেট কমিয়ে ৮০-৮৫ হাজার টাকা ধরেছেন। কিন্তু দুদিন ঘুরে ওই বাজেটে কোরবানির পশু কিনতে পারেননি। তিনি বললেন, ‘জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। সংসার খরচও অনেক বেড়ে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে কোরবানির বাজেট কমিয়ে আনতে হয়েছে।’

 

জসিম উদ্দিন ছাড়াও কথা হয় অন্তত ১০ জন কোরবানিদাতা, গরু ও চামড়া বেপারির সঙ্গে। তাদের সবাই অভিন্ন সুরে বললেন, ‘জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বাড়ছে, আর টাকার মান যেভাবে কমছে-তাতে সংসার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের।’

 

মূল্যস্ফীতি চিত্র দেখতে গত ৪-৫ বছরের কোরবানির পশুর লক্ষ্যমাত্রা ও চামড়া সংগ্রহের হিসাব পর্যালোচনা করা হয়। তাতে দেখা যায়, গত তিন বছর ধরে চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের হার নিম্নমুখী। গত বছর (২০২৩ সাল) চট্টগ্রামে চামড়া সংগ্রহ হয়েছিল তিন লাখ ১৮ হাজার ৮০০ পিস। এর আগের বছর (২০২২ সাল) সংগ্রহ হয়েছিল তিন লাখ ৪৩ হাজার ২৫০ পিস। দুই বছর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে তিন লাখ পিস। চলতি বছরও সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাড়ে তিন লাখ পিস। অথচ চলতি বছর কোরবানির পশুর চাহিদা ধরা হয় ৮ লাখ ৮৫,৭৬৫টি।

 

বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন গতকাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘২০১২-১৩ সালেও চার থেকে সাড়ে চার লাখ চামড়া সংগ্রহ করা হতো। করোনা সংক্রমণের পর থেকে তা কমে আসছে।’

 

তিনি বলেন, আগে মানুষ একজনে একাধিক কোরবানি দিতো। এখন একাধিক মানুষ ভাগে কোরবানি দিচ্ছে। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে কোরবানি কমে যাচ্ছে। তাই চামড়া সংগ্রহের হারও কমে এসেছে।

 

গত কয়েক বছর ধরে জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। ভোগ্যপণ্যের দামও কয়েক গুণ বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি বাড়ছেই। এর লাগাম টানা যাচ্ছে না। এতে মানুষের ক্রয়-ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন সীমিত আয়ের মানুষেরা। মূল্যস্ফীতির চাপে অনেক মানুষ সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সংসারে টানাপোড়েন বেড়েছে।

 

কাঁচা চামড়া আড়তদার ও হাট ইজারাদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনা সংক্রমণের পর থেকে বিশ্ব বাজারে অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। এখন চলছে ইসরাইল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ। দেশে দেশে যুদ্ধ ও অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। যার প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে।

 

এবার কোরবানিতে অর্থনীতির মন্দার প্রভাবের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন গরু-চামড়া বেপারি, খামারি ও হাট ইজারাদাররা। তারা জানান, গত তিন-চার বছর ধরে কোরবানির পশুর চামড়া ২০ শতাংশ হারে কমে এসেছে। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে এবারও ২০ শতাংশ কোরবানি কম হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরে চামড়া কেনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন আড়তদাররা।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বহদ্দারহাট বাদুরতলা এলাকার এক ব্যক্তি বলেন, ‘গত বছর দুই জনে ভাগে কোরবানি দিয়েছিলাম। এবার অর্থনৈতিক মন্দার কারণে তিন ভাগে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা দামে একটি গরু কিনেছি।’

 

একই এলাকার আরেকজন বলেন, ‘গত বছর ৮৫ হাজার টাকায় নিজে কোরবানি দিয়েছি। গত এক বছরে আয় বাড়েনি। উল্টো ব্যয় বেড়েছে। সংসার খরচ নির্বাহে টানাপোড়েনে পড়তে হয়। বাধ্য হয়ে এবার কোরবানির বাজেট কমিয়ে আনতে হয়েছে। ৫০ হাজার টাকা করে তিন ভাগে কোরবানি দেওয়ার জন্য স্থির করেছি।’

 

পূর্বকোণ/মাহমুদ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট