চট্টগ্রাম শনিবার, ২০ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

বিমান আবুধাবি থেকে বহন করছে না প্রবাসীর মরদেহ

জাহাঙ্গীর কবীর বাপপি, ইউএই প্রতিনিধি

১৪ জুন, ২০২৪ | ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ

কেস হিস্ট্রি ১ : গত ৫ জুন আবুধাবির গ্রিন সিটি আলআইনে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুবরণ করেন প্রবাসী রেমিটেন্স যোদ্ধা, লক্ষ্মীপুর নিবাসী মোহাম্মদ আরিফ হোসেন (৩০)। আবুধাবিতে বিমান অফিসে বারবার ধরনা দিয়েও নিকটজনেরা তার মরদেহ পাঠানোর জন্য বিমানের বুকিং পাননি। তাতে মরদেহ পড়েছিল তাওয়াম হাসপাতালের মর্গে। সেই মরদেহ ইউএস বাংলার একটি ফ্লাইটে দুবাই হয়ে দেশে পাঠানো হবে ২০ জুন। দেশে পরিবার পরিজনদের প্রথমত মৃত্যু শোকে সবকিছু থমকে যাওয়া তারপর মরদেহের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা যে কত বেদনার তা সবাই বোঝে না। বিমান তো না-ই।

 

কেস হিস্ট্রি ২ : গত ৯ জুন হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার লেবার ক্যাম্পে মৃত্যুবরণ করেন আবুধাবি প্রবাসী নির্মাণ শ্রমিক, নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জের বসুরহাট চর পার্বতী গ্রামের মোহাম্মদ মানিক (৪৬)। দিনটি ছিল কর্মদিবস। খবর পেয়ে পুলিশ এসে মরদেহের সুরতহাল তদন্ত করে তা বানিয়াসের সেন্ট্রাল মর্গে রাখে। বাংলাদেশ বিমান বা সরাসরি ফ্লাইটের অন্য কোন এয়ারলাইন্স না নেয়ায় তার মরদেহ বহু দেনদরবার করে গত বুধবার রাতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি থেকে কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে করে নেয়া হয় দোহায়, ট্রানজিট ফ্লাইটটি দোহায় দীর্ঘ যাত্রাবিরতির বিড়ম্বনা শেষ করে এরপর যায় মরদেহ নিয়ে ঢাকায়।

 

কেস হিস্ট্রি ৩: চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার সুলতানপুর ইউনিয়নের কাজীপাড়া গ্রামের আবুধাবি প্রবাসী শহীদুল আলম বাবুল (৫৫)। আবুধাবি শহরের উপকণ্ঠে সাহামায় বিগত সাড়ে তিন দশক ধরে প্রবাসে নির্মাণ ব্যবসা করে আসছিলেন।

 

শিল্পনগরী মুসাফফাহর একটি গ্লাস ও মেটাল ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) এবং মৃতের আত্মীয় সৈয়দ মোরশেদ উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, শহীদুলের মৃত্যুর পর থেকে তার মরদেহ বানিয়াসের মর্গে পড়ে আছে। দেশ থেকে আত্মীয় পরিজনদের ফোনের ওপর ফোন আসছে, আমরা মরদেহের জন্য তাদের অস্থির আহাজারি শুনছি কিন্তু আবুধাবি থেকে বিমান মরদেহ বহন না করায় আমরা অসহায়ভাবে তাদের কেবল সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছি।

 

বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রেরণে আমিরাত বিশ্বে এক নাম্বারে : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সবচে বেশি রেমিটেন্স এসেছিল দেশে ৩.২৭ বিলিয়ন ডলার যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২.২০ বিলিয়ন অর্থাৎ এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ৪৮%।

 

দূতাবাস কী বলছে : বিষয়টির ব্যাপারে আবুধাবিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলর হাজরা সাব্বির হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, বিষয়টি তিনি অবগত আছেন। তাঁর দেয়া তথ্য মতে বছরে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে গড়ে পাঁচশ প্রবাসীর মরদেহ দেশে যায়। তার মধ্যে আবুধাবি থেকে যায় প্রায় অর্ধেক। আবুধাবি থেকে বিমানের ফ্লাইট ছোট হওয়ায় বিমান মরদেহ পরিবহন নিরুৎসাহিত করে। সে ক্ষেত্রে আমরা দুবাই দিয়ে প্রবাসীর মরদেহ বহন করতে পরামর্শ দিই।

 

বিমান কী বলছে: বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বিমানের আবুধাবি-আলআইন অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালক আনোয়ারুল ফেরদৌস বলেন, আমরা আবুধাবি থেকে মরদেহ পরিবহন করছি না এমন না। কখনো সুপরিসর এয়ারক্রাফট হলে মরদেহ নিয়ে যাচ্ছি। নিয়মিতভাবে আমাদের ঢাকা-চট্টগ্রাম ও সিলেট এর জন্য সপ্তাহে যে সাতটি ফ্লাইট আছে তার সবগুলোই বোয়িং ৭৩৭। এগুলোর ধারণ ক্ষমতা ১৬২ হলেও সেইফটি রুল অনুযায়ী ১৩৬টি সিটের বেশি সীট বিক্রি করা যায় না। মরদেহ পরিবহন করলে আমাদেরকে ৩০-৩৫ টা ব্যাগেজ অফ করে দিতে হয়। যাতে প্যাসেঞ্জাররা ক্ষুব্ধ হন। ডেডবডি সেনসেটিভ ইস্যু। আমরা ডেড বডিকে অনার করতে পারছি না ছোট ফ্লাইট এর কারণে, এটি ম্যানেজমেন্ট এর সিদ্ধান্ত। তাই দুবাই দিয়ে আমরা মরদেহ পরিবহনকে এই মুহূর্তে উৎসাহিত করছি।

 

কী বলছেন আমাদের কম্যুনিটি নেতারা: বঙ্গবন্ধু পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি আবুধাবির সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন তালুকদারের সাথে। তিনি বললেন সুপরিসর এয়ার ক্রাফ্ট এর অভাবে বিমান প্রবাসীর মরদেহ বহনে অনীহা প্রকাশ করছে। তাতে অনেক মরদেহ দিনের পর দিন পড়ে আছে। আমরা সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর আবুধাবি সফরকালে এ বিষয়ে তাদের অবগিত করেছি, স্মারকলিপি দিয়েছি। যাতে আবুধাবি থেকে সুপরিসর ড্রিমলাইনার ফ্লাইট দেয়া হয়। দুবাই দিয়ে আবুধাবির মরদেহ পাঠাতে গেলে প্রবাসীদেরকে অনেক বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, তখন আবুধাবি পুলিশ ও দুবাই পুলিশ এর দুটি অনুমোদন লাগে।

 

বাংলাদেশ সমিতি ইউএই’র জ্যেষ্ঠ সহ সভাপতি শওকত আকবর এ প্রসঙ্গে বলেন, দীর্ঘদিন যাবত আবুধাবি থেকে ঢাকা চট্টগ্রাম বা সিলেট এর কোন সুপরিসর ফ্লাইট নাই। এজন্য আবুধাবিতে মৃত্যুবরণকারী প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের মরদেহ দিনের পর দিন পড়ে থাকছে। বিষয়টি বেদনাদায়ক।

পূর্বকোণ/এসএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট