চট্টগ্রাম শনিবার, ১৩ জুলাই, ২০২৪

সংবাদ বিশ্লেষণ

প্রয়োজন যৌথ জরিপ, সমন্বয় ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা

জলাবদ্ধতা নিরসন

ডা. ম. রমিজউদ্দিন চৌধুরী

১১ আগস্ট, ২০২৩ | ৬:৩৭ পূর্বাহ্ণ

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দুটি সংস্থা অবশেষে মুখ খুলেছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান এম জহিরুল আলম দোভাষ সংবাদ সম্মেলন ডেকে এবারের জলাবদ্ধতার কারণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর তত্ত্বাবধানে যে মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে তার সুবাদে কিছু সুফল মিলেছে বলে দাবি করা হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে। মুখে কাউকে কিংবা কোন সংস্থাকে দায়ী করতে চান না উল্লেখ করলেও তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ শুধু সিডিএর একার নয়। এ কাজে দায়িত্ব রয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের।
অন্যদিকে, সিডিএ কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যার প্রতিউত্তর জানতে চাইলে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, মহিউদ্দিন চৌধুরীর আমলে চাক্তাই খালের তলা পাকা করা হয়েছে। আপনারা এখনি গিয়ে দেখেন, যদি এটা (চাক্তাই খাল) খনন করা হয় তাহলে আগের ওই পাকাতলা পর্যন্ত ক্লিয়ার থাকার কথা। পাহাড় পরিমাণ মাটি কীভাবে চাক্তাই খালে থাকে? বীর্জা খাল, মহেশখাল দেখে আসেন। এগুলোও দৃশ্যমান জিনিস, দোষারোপ নয়।

দোষারোপের সংস্কৃতি বিশ্বাস করেন না সাংবাদিকদের কাছে এমন দাবি করলেও সিটি মেয়রের আলোচ্য কথাগুলোকে পাল্টা অভিযোগ হিসেবেই দেখছেন সিডিএসহ সংশ্লিষ্টরা।
মহেশখালে রেগুলেটর ও পাম্প চালু হওয়ায় আগ্রাবাদ, হালিশহর ও তৎসন্নিহিত এলাকায় এবার জলাবদ্ধতা তুলনামূলক অনেক কম হয়েছে, একে জলাবদ্ধতা প্রকল্পের সুফল হিসেবে উল্লেখ করেছে সিডিএ। এর বাইরে চট্টগ্রাম নগরী যেভাবে টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে ডুবে গিয়েছিল, তা দুর্ভোগের সর্বোচ্চসীমা ছাড়িয়ে গেছে।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যা দু’যুগেরও বেশি সময়ের। এই সমস্যা নিরসনে নানা সময়ে কাজ করা হয়েছে, এখনও চলছে সিডিএ’র সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার কাজসহ তিন সংস্থার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার কাজ। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালকের দেয়া তথ্যমতে, প্রকল্পের ৩৬টি খালের মধ্যে ২৬টি খালের কাজ প্রায় শেষ হয়েছে। বাকি ১০টি খালের কাজ ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় আটকে আছে। প্রকল্পের বাইরে রয়েছে আরো ২১টি খাল ও ১৩শ কিলোমিটার নালা ও ড্রেন। এগুলো সম্প্রসারণ ও পরিষ্কার করা না হলে পুরো নগরে জলাবদ্ধতা নিরসন হবে না।
গণমাধ্যম সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, সিডিএর জলাবদ্ধতা প্রকল্পের বাজেট ছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেছে। পূর্ণাঙ্গ কাজ করার জন্য বাজেট বাড়িয়ে ইতিমধ্যে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। এর অর্থ হলো, এখনও আলোচ্য প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ অংশের এক তৃতীয়াংশেরও বেশি কাজ রয়ে গেছে। সিডিএ দাবি করছে, কাজ পূর্ণাঙ্গ শেষ না হলে নগরী পুরোপুরি জলাবদ্ধতামুক্ত হবে না।

সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে উপসংহার টানতে হলে বলতে হবে, সিডিএ এবং সিটি কর্পোরেশন এ পর্যায়ে এসে জলাবদ্ধতার কারণ কি, সেটি চিহ্নিত করতে পেরেছে। অন্ততঃ দুই সংস্থার কর্তাব্যক্তিদের সর্বশেষ ব্রিফিংয়ে সেটাই প্রতীয়মান হয়েছে। আমি মনে করি, পৃথক পৃথকভাবে হলেও দুই সংস্থা যে মতামত দিয়েছে সেটি এক জায়গায় করার জন্য সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় সভা করা দরকার। সেখানে আরেক সংস্থা পানি উন্নয়ন বোর্ডকেও রাখতে হবে। যৌথ জরিপের মাধ্যমে উভয়ের মতামত যাচাই- বাছাইয়ের পর একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা এবং সেই মোতাবেক বাস্তবায়ন কাজ সম্পন্ন করা। তাহলেই আশা করা যায় নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি লাভ করতে সক্ষম হবে।

কয়েকমাস পরই আসছে জাতীয় নির্বাচন। জলাবদ্ধতা ইস্যুটি এই নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে, সেটি নির্দ্বিধায় বলা যায়। চট্টগ্রাম নগরীর বহুল আলোচিত এই সমস্যা নিরসনে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়ার পরও সমস্যাটি নিরসনের পরিবর্তে যদি সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, সেটি বিব্রতকর, অনাকাক্সিক্ষতও। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কর্তৃপক্ষ এই বাস্তবতা বুঝে সরকারকে দায়মুক্ত করতে অবিলম্বে সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা ঠিক করবেন এবং বাস্তবায়নে নেমে পড়বেন, নগরবাসী সেটাই কামনা করে।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট