চট্টগ্রাম শনিবার, ২৫ মার্চ, ২০২৩

সর্বশেষ:

১৫ জুন, ২০১৯ | ২:০৮ পূর্বাহ্ণ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

ক্ষতি সরকারের, লাভ মিলারের

তুঘলকি সিদ্ধান্তের খেসারত

চট্টগ্রামে সাধারণত আতপ চালের চাহিদাই বেশি। পক্ষান্তরে, চট্টগ্রামে সিদ্ধ চাল উৎপাদন না হলেও চট্টগ্রাম থেকে প্রায় চার হাজার মে.টন সিদ্ধ চাল সংগ্রহ করছে সরকার। এই তুঘলকি সিদ্ধান্তের কারণে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও লাভবান হচ্ছে মিলাররা। এই লাভের হিসাবে পিছিয়ে নেই খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারাও।
মিলাররা জানায়, চট্টগ্রাম থেকে সিদ্ধ চাল সংগ্রহ করা হলেও এখানে সিদ্ধ চালের চাহিদা কম। চট্টগ্রাম থেকে সংগ্রহ করা চাল পরবর্তীতে নওগাঁ, জামালপুর, দিনাজপুর ও নেত্রকোণাসহ উত্তরবঙ্গের জেলায় সরবরাহ করা হয়। আবার উত্তরবঙ্গ থেকে চট্টগ্রামে আতপ চাল আনা হয়। আনা-নেওয়ায় দুই দফায় পরিবহন খরচ গুনতে হয় সরকারকে। এক ট্রাকে প্রায় ১৩ টন চাল পরিবহন করা যায়। সেই হিসাবে প্রায় ৪ হাজার টন চাল পরিবহনে কমপক্ষে ৩০৭ ট্রিপ লাগবে। চট্টগ্রাম থেকে উত্তরবঙ্গের ট্রাক ভাড়া ৩০-৩২ হাজার টাকা। সেই হিসাবে প্রায় কোটি টাকার পরিবহন খরচ গুনতে হবে সরকারকে।
চট্টগ্রাম রাইস মিল মালিক সমিতির সভাপতি শান্তু কুমার দাশ পূর্বকোণকে বলেন, চট্টগ্রামে সিদ্ধ চালের চাহিদা না থাকায় শুধু একটি অটো রাইস মিল রয়েছে। অন্যগুলো হচ্ছে চাতাল বা মাঠ ব্রয়লার। ধান সিদ্ধ করার পর মাঠে শুকিয়ে মিলিং করা হয় এসব মেশিনে। পর্যাপ্ত পরিমাণ চাল সরবরাহ করতে পারে না।
খাদ্য বিভাগ জানায়, চলতি বোরো মৌসুমে চট্টগ্রামে ১৪ হাজার ৬৩৮ মে. টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এরমধ্যে আতপ চাল ১০ হাজার ৭১১ মে. টন। আতপ ৩৫ টাকা ও সিদ্ধ ৩৬ টাকা ধরে মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল কিনছে সরকার। অথচ পাইকারি বাজারে আতপ চাল বিক্রি হচ্ছে ২৮ টাকা দরে। আর সিদ্ধ চাল বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়। প্রতি কেজিতে ৬ থেকে ৭ টাকা করে লাভ করছে মিল মালিকেরা। তবে মিল মালিকদের দাবি, লাভের অর্ধেক ভাগ দিতে হয় খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও গুদাম রক্ষকদের। রক্ষকই ভক্ষকে পরিণত হয়েছে।
সরকার প্রতি বছরের ন্যায় এবার ধান-চাল সংগ্রহ কর্মসূচি শুরু করেছে। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে এই কর্মসূচি।
চট্টগ্রামে এবার ১৪ হাজার ৬৩৮ মে. টন চাল সংগ্রহ করবে সরকার। এরমধ্যে আতপ চাল হচ্ছে ১০ হাজার ৭১১ মে. টন। সিদ্ধ চাল হচ্ছে তিন হাজার ৯২৭ মে. টন। প্রত্যেক উপজেলা থেকে আতপ চাল সংগ্রহ করলেও সিদ্ধ চাল সংগ্রহ করবে তিন উপজেলা থেকে। মিরসরাই উপজেলা থেকে ৯১৪ টন, সীতাকু- উপজেলা থেকে ৪১৬ টন ও ফটিকছড়ি উপজেলা থেকে এক হাজার ৪৯৭ টন। এরমধ্যে ফটিকছড়িতে জাবেদ অটো রাইস মিলের উৎপাদন ক্ষমতা বেশি দেখিয়ে প্রায় ১৮শ টন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। খাদ্য বিভাগ অনিয়মের মাধ্যমে বেশি বরাদ্দ দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মিলাররা জানায়, উৎপাদন কম থাকায় অন্য জেলা থেকে সিদ্ধ চাল কিনে সরকারের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। এই কারচুপির জন্য খাদ্য বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের লাভের ভাগ অর্ধেক দিয়ে দিতে হয়। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও লাভ মিলার ও খাদ্য বিভাগ ভাগাভাগি করে লুটেপুটে খাচ্ছে। মিলারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রামে সিদ্ধ চালের উৎপাদন বা মিল না থাকায় অন্য জেলা থেকে চাল কিনে এনে সরকারের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনার অভাবে ক্ষতি গুনতে হচ্ছে সরকারকে। চট্টগ্রামে সিদ্ধ চাল সংগ্রহ কমিয়ে আতপ চালের সংগ্রহ বাড়িয়ে দেওয়া হলে কৃষক লাভবান হবে।
এদিকে, ফড়িয়া ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের কারসাজিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক। কৃষকের ঘামে ফলানো ধান নিয়ে কারসাজি শুরু করেছে মধ্যসত্ত্বভোগীরা। মধ্যসত্ত্বভোগীরা কৃষকের কাছ থেকে মণপ্রতি ৫৫০ থেকে ৬শ টাকা দরে ধান কিনছে। আর সেই ধান বা চাল সরকারি দরে বিক্রি করছে মিলার, ফড়িয়া ও মধ্যসত্ত্বভোগীরা। কৃষকের লাভ লুটে নিচ্ছে তারা।
চট্টগ্রাম রাইস মিলস মালিক সমিতির সভাপতি শান্তু দাশগুপ্ত পূর্বকোণকে বলেন, মিল মালিকেরা লাভবান হলেও কৃষক চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দালালদের খপ্পরে পড়ে ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না তারা। এজন্য জেলা প্রশাসন ও সরকারকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ কৃষক না বাঁচলে দেশ বাঁচবে না।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট