
[সামের বি জাবের লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়্যাল হলোওয়েতে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে পিএইচডি গবেষক। তিনি কাউন্সিল ফর অ্যাট-রিস্ক একাডেমিকসের একজন ফেলোও। তিনি তিনি আরব বিশ্ব এবং মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল নিয়ে কাজ করেন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান ইস্যুতে গত মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা তার একটি মতামত প্রকাশ করেছে। পূর্বকোণ পাঠকদের জন্য মতামতটি অনুবাদ করে প্রকাশিত হল।]
গত সপ্তাহে ইরানের জন্য নির্ধারিত সময়সীমার আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে জরুরি ফোন করেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তিনি প্রেসিডেন্টকে তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি না করার ব্যাপারে সতর্ক করেন। অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরপরই নেতানিয়াহু স্পষ্ট করে দেন যে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী লেবাননে তাদের অভিযান বন্ধ করবে না। অনেকেই তার এই অবস্থানকে নিজের রাজনৈতিক টিকে থাকার স্বার্থে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছেন। তবে শুধু নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররাই নয়, তার বিরোধীরাও চায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাক।
কারণ, ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অভিজাতদের কাছে ইরানের পরাজয় ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রকল্প বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ এখন একটি জায়নবাদী রাজনৈতিক কৌশলে পরিণত হয়েছে, যা ইউফ্রেটিস থেকে নীলনদ পর্যন্ত একটি ইহুদি রাষ্ট্রের তালমুদিক ধারণাকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে ইসরায়েল শুধু নতুন ভূখন্ড দখল নয় বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক প্রাধান্য এবং ক্রমবর্ধমান প্রভাব বলয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। আর এই সব লক্ষ্য অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরান।
সীমান্ত সম্প্রসারণ
‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে ভূখন্ড সম্প্রসারণ। ১৯৬৭ সালে দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখন্ডে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে বসতি স্থাপন করে আসছে, যা এখন কার্যত সংযুক্ত (ডি-ফ্যাক্টো এনেক্সড) বলে বিবেচিত হয়। সেখানে ফিলিস্তিনিদের সামনে জোরপূর্বক স্থানান্তরের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফিলিস্তিনি ভূমির নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার পর এখন ইসরায়েল উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে। ১৯১৯ সালে ওয়ার্ল্ড জায়নিস্ট অর্গানাইজেশন যে পরিকল্পনা দিয়েছিল, তার সঙ্গে এই আকাক্সক্ষার মিল রয়েছে। যেখানে দক্ষিণ লেবানন, সিরিয়ার অংশ, জর্ডান নদীর পূর্ব তীর এবং মিশরের সিনাই উপদ্বীপের কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ইসরায়েল প্রায় ৬০ বছর ধরে সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে রেখেছে এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও সিরীয় ভূখন্ড দখলের চেষ্টা করেছে। এই অঞ্চল সম্প্রসারণ করলে পানি সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়বে এবং দামেস্কের ওপর কৌশলগত চাপ সৃষ্টি হবে।
দক্ষিণ লেবাননও দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের লক্ষ্য। বর্তমানে তারা ওই অঞ্চলে উপস্থিত এবং স্থানীয় গ্রামগুলো ধ্বংস করে বাসিন্দাদের ফিরে আসা ঠেকানোর চেষ্টা করছে। এই এলাকা পাহাড়ি ভূখ- ও পানি সম্পদের কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জর্ডান নদীর পূর্ব তীরও ইসরায়েলের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি কৃষি জমি বাড়ানোর পাশাপাশি সম্ভাব্য পূর্ব দিকের হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক গভীরতা দেবে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যপথের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
এই সব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ইসরায়েল লোহিত সাগরসহ গুরুত্বপূর্ণ জলপথ এবং জ্বালানি সম্পদের কাছাকাছি পৌঁছাবে, যা তার ভূরাজনৈতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।
সামরিক আধিপত্য
‘গ্রেটার ইসরায়েল’ শুধু ভূখন্ড সম্প্রসারণ নয়, এটি আঞ্চলিক সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়ও। লক্ষ্য হলো এমন এক অবস্থান তৈরি করা, যেখানে ইসরায়েল সীমাবদ্ধতা ছাড়াই সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারে।
১৯৪৮ সাল থেকে পশ্চিম তীর ও গাজা, ২০২৪ সাল থেকে লেবানন এবং একই বছরে আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ায় ইসরায়েল এই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করছে।
ইসরায়েল শুধু প্রতিবেশী দেশ জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন নয়, বরং মিশর, ইরাক, ইরান, ইয়েমেন, উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহ এবং আফ্রিকার শিং অঞ্চলের দেশগুলোর ওপরও কার্যত সামরিক স্বাধীনতা চায়।
এই লক্ষ্যে ইসরায়েল শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা ও শান্তি চুক্তি করেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের আওতায় অন্তর্ভুক্ত হওয়াও একটি বড় পদক্ষেপ, যা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক সমন্বয়কে আরও শক্তিশালী করেছে।
ভবিষ্যতে ইসরায়েল স্বাভাবিকীকরণ চুক্তির মাধ্যমে সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে পারে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের ঘাঁটি ব্যবহার কিংবা আরব দেশগুলোতে নিজস্ব ঘাঁটি স্থাপনের সম্ভাবনাও রয়েছে।
প্রভাব বলয়
‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রকল্পের তৃতীয় স্তম্ভ হলো একটি ভূরাজনৈতিক প্রভাব বলয় তৈরি করা। এর মাধ্যমে ইসরায়েল বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে চায়, অনেকটা ঔপনিবেশিক ব্রিটেনের মতো।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে লেবাননে এই কৌশলের কিছু অংশ পরীক্ষাও করেছে ইসরায়েল, যেখানে সামরিক চাপ ও রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে সরকার গঠনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা দেখা গেছে।
এই প্রভাব বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করছে ইসরায়েল। ওয়াশিংটনে প্রো-ইসরায়েল লবির মাধ্যমে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে ইসরায়েলের স্বার্থ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাধা হিসেবে ইরান:
গত কয়েক দশকে ইসরায়েল তার ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ প্রকল্পের পথে থাকা অনেক বাধা দূর করেছে। কিন্তু ইরান এখনও একটি বড় প্রতিবন্ধক।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামাতে ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তা অপ্রত্যাশিত নয়। তবে ইসরায়েল যেটা অনুমান করতে পারেনি, তা হলো ইরানের প্রতিরোধ ক্ষমতা।
দেড় মাসের সংঘাতে ইরান নিজেকে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করেছে, যার মাধ্যমে বিশ্বে তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের ইরানকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হওয়া তাদের কৌশলের জন্য বড় ধাক্কা। এই যুদ্ধ দেখিয়েছে যে, ইসরায়েল এখনও বহিরাগত সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
এই সংঘাতের প্রভাব শুধু ইসরায়েল-ইরান সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি পুরো অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও ভবিষ্যতে নিঃশর্ত সমর্থন দিতে অনাগ্রহী হতে পারে।
জনমত জরিপগুলো দেখাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব দ্রুত বাড়ছে। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ২০২৮ সালের নির্বাচন ইসরায়েলবিরোধী আরও প্রতিনিধিকে ক্ষমতায় আনতে পারে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বাস্তবায়নের সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ইসরায়েলের পদক্ষেপকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ ও মরিয়া করে তুলতে পারে।