চট্টগ্রাম রবিবার, ০১ মার্চ, ২০২৬

সর্বশেষ:

ভূ-রাজনৈতিক সংকটে কেন বারবার আলোচনায় ‘হরমুজ প্রণালি’?

ভূ-রাজনৈতিক সংকটে কেন বারবার আলোচনায় ‘হরমুজ প্রণালি’?

অনলাইন ডেস্ক

১ মার্চ, ২০২৬ | ১১:৪৮ অপরাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যে যখনই কোনো ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বা সামরিক সংঘাত শুরু হয়, তখনই বিশ্ববাসীর নজর কেড়ে নেয় একটি সরু জলপথ—‘হরমুজ প্রণালি’। সম্প্রতি ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে এই প্রণালিটি আবারও বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মূলত এর ভৌগোলিক অবস্থান, জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্ব এবং সামরিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার কারণেই এটি যেকোনো সংকটে বারবার সামনে আসে।

 

হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘অয়েল চোকপয়েন্ট’ বা তেলের রুট বলা হয়। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (EIA) মতে, বিশ্বের মোট খনিজ তেল বাণিজ্যের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) ২০ থেকে ২৫ শতাংশ এই সরু পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি থেকে ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই প্রণালি অতিক্রম করে। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বৃহৎ জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলো এই পথ ছাড়া বিশ্ববাজারে পণ্য পাঠাতে পুরোপুরি অক্ষম।

 

ভৌগোলিক দিক থেকে হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি পারস্য উপসাগরে প্রবেশের একমাত্র সামুদ্রিক পথ। এর উত্তর দিকে ইরান এবং দক্ষিণে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত অবস্থিত । প্রণালিটির সবচেয়ে সরু অংশটি মাত্র ২১ থেকে ৩৩ কিলোমিটার প্রশস্ত। এর সংকীর্ণতা একে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে, কারণ সমুদ্রপথে মাইন বসিয়ে বা ছোট নৌযান দিয়ে সহজেই এই পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা সম্ভব।

 

এই প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জ্বালানির সিংহভাগ—প্রায় ৮০ থেকে ৮৪ শতাংশই—রপ্তানি করা হয় এশিয়ার দেশগুলোতে। বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো তাদের মোট আমদানিকৃত জ্বালানির একটি বড় অংশের জন্য এই পথের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল । বাংলাদেশও মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরাসরি তেল আমদানির ক্ষেত্রে এই রুটের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো অস্থিরতা দেশীয় জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে ।

 

ইরান এই প্রণালিকে তাদের অন্যতম শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার বা ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে ব্যবহার করে । পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা বা সামরিক হামলার হুমকির পাল্টা জবাবে তেহরান প্রায়ই এই প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয় । যেহেতু প্রণালিটির উত্তর উপকূল ইরানের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে, তাই সেখানে ড্রোন, দ্রুতগামী নৌযান এবং ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি মোতায়েন করে তারা কৌশলগত সুবিধা ভোগ করে।

 

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ থেকে ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সরবরাহ বন্ধ থাকলে তা কেবল জ্বালানি নয়, বরং বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়িয়ে দিয়ে মুদ্রাস্ফীতি ও ভয়াবহ আর্থিক সংকট তৈরি করতে পারে। বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব বা আমিরাতের কিছু পাইপলাইন থাকলেও সেগুলোর ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত, যা পুরো বিশ্বচাহিদাকে সামাল দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত নয়।

পূর্বকোণ/কায়ছার/সিজান

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট