চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০

ডিঙ্গি ভাসে দক্ষিণ সমুদ্রে

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ | ৫:৩৪ পূর্বাহ্ণ

শোয়েব নাঈম

অভিমত শোণিত-নির্ঝরের কবিতা হাফিজ রশিদ খানের

ডিঙ্গি ভাসে দক্ষিণ সমুদ্রে

পাহাড়-সমতল, সহজ-জটিল, উত্থান-পতন, মানব-মানবী, প্রেম-প্রেমহীনতা, সাফল্য-ব্যর্থতা, ক্রোধ-আকাক্সক্ষা, আন্তরিকতা-হুঙ্কার, হাহাকার-উচ্ছলতা, সন্দেহ-বিশ্বাস, সুস্থতা-অসুস্থতা, দুঃখ-আনন্দ, বিষণœতা-সুখ, উপদেশ-গালাগাল, শিষ্টতা-ভদ্রতা, শ্লীলতা-অশ্লীলতা সদাঅস্থির আর সঙ্কটময় প্রেক্ষাপটের এবং উপলব্ধি আর সংশয়ের এক দ্বান্দ্বিক বিস্তারের থেকে আরোহিত টুকরো টুকরো বিষয়গুলি দর্শনে বিস্তৃত করে কবিতার মননক্ষেত্রে বিকল্প-ভাবুক কবি হাফিজ রশিদ খান প্রণয়ন করেছেন কাবগ্রন্থ ‘ডিঙ্গা ভাসে দক্ষিণ সমুদ্রে’। বিশ্বচরাচরের রহস্যশিহরেই হোক, সমাজবিবেকের তাড়নাতেই হোক, লিঙ্গশারীরিক বিহ্বলতাতেই হোক বা আত্মনির্মাণের নিষ্ফলতার বেদনাতেই হোক, কবিতার ভিতর দিয়ে একটি ‘দরদি বিশদ চোখে’ ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর শোণিত-নির্ঝরের অকুণ্ঠিত কাব্য-তরঙ্গ-লহরী। নিষ্কম্প দীপশিখাটির মতো তাঁর উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠা কাব্য টেক্সটগুলি, গতানুগতিক কবিতার সূত্রধরে কাব্যপ্রবাহে এগিয়ে যাওয়ার সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড়িয়ে অভিজ্ঞতাজাত বোধের ভিতর থেকেই তাঁর কবিতার জাত-আইডেনটিটি উন্মোচন করা যায়Ñ
“ […] বিশ্বমানবতা আমাতেই বাঁচে / তাই ঘুরে আসি ছোটো পরিসরে/রাতের বিবরে দিনের বিতানে/জেগে থাকি একা সুন্দরের পাছে…” (আদিমন্ত্র : পৃষ্ঠা ৪৭) ।
কবির চিন্তার জোরকে চিনিয়ে দেয় কাব্যে অনবিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহৃত বিশ্লেষণগুলি, যা বিশেষায়িত করে কাব্যস্তবকে নান্দনিক ভারসাম্য গড়েছে। গ্রন্থে কবিতার গড়ন বুঝলে বিশেষণের গড়নও বুঝা যায়। যেমনÑ “[…] উপকারে ধন্য হতে চাওয়া তত্ত্বের উদ্ভাবক নেই যে কাননে/ বাস করে কবিতা ওখানে বাস্তবতা ও নন্দনে”…(কবিতার জন্ম:পৃষ্ঠা১১)।
কবি হাফিজ রশিদ খান চেয়েছেন সমাজে তথাকথিত ‘এলিট’ ছোঁয়া থেকে মুক্ত করে মানবিকতার বিকাশ, প্রান্তিকজনদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের জন্য সাব অল্টার্ন কবিতাও লিখেছেন কবিতা: ‘মেজবান’- পৃষ্ঠা ২৬ :
“[…] ভুরিভোজনের পর্ব ফুরিয়ে আসে। কিছু উস্কখুস্ক চুলের মাথা ও ক্ষুধার্ত চোখ মাংসের টুকরো খুঁজে বেড়ায় ময়দানজুড়ে…”
কবিতায় লাইন খ-নের মাধ্যমে কবি সৃষ্টি করেছেন একটি কাব্যপ্রবাহ। যেটি তৈরি করেছেন পঙ্ক্তি থেকে পঙ্ক্তিতে বিভিন্ন অনুরণনের ধ্বনির বিন্যাস ও এদের মধ্যে অনেক খালি স্পেসের পরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমে। এই কাবগ্রন্থে পঙ্ক্তি-খ-ন এবং খালি স্পেসের ব্যবহার কবিতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। যেমনÑ কবিতা ‘মানববন্ধন’ পৃষ্ঠা ১৪:
“পথে যেতে মনটা থমকে দাঁড়াল মানববন্ধনের
শব্দহীন আপাত কোমল প্রতিবাদে
পরিচিত মুখ দেখি ঠা-া ইস্পাতের মতো
নতুন মানুষ কচি ও সুন্দর …”
দ্বিতীয় ও চতুর্থ পঙ্ক্তি বামপাশের মার্জিন থেকে শুরু নাÑহয়ে কয়েক স্পেস পরে শুরু হয়েছে। কবির নিজস্ব ভাবনায় চেয়েছেন শব্দ থেকে শব্দে যেতে যতিচিহ্নের সাহায্য ছাড়াই স্বতন্ত্র অনুরণন সৃষ্টি করতে এবং বিশেষ শব্দের উপরে জোরারপ করে কবিতায় ধ্বনিবিন্যাস সৃষ্টি করতে।
টানা গদ্যকবিতায় গদ্যের বৈশিষ্ট্যে বিভিন্ন শব্দকে এর অনুরণনসহ প্রবল হয়ে উঠতে না দিয়ে কবি লক্ষ্য রেখেছেন একটি সমগ্রতা নির্মাণ, যেখানে সকল শব্দ ও পদ একটি মিলিত প্রবাহ কবিতায় যেন তৈরি করে। উদ্দেশ্য হচ্ছে কবিতায় আরম্ভ থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে শব্দাবলির প্রকৃতিকে অবলম্বন করে টানাগদ্যে কাব্যের এক অখ- ভাব বা বক্তব্য নির্মাণের। যেমনÑ
‘ আয়োজিত সভ্যতার দেয়াল’(পৃষ্ঠা ১০) ;
‘আবহমান গোত্রিয়তা’ (পৃষ্ঠা ১৮ ) ;
‘বেদের বহর’ (পৃষ্ঠা ১৯ ) …. ইত্যাদি ।
একই কবিতায় একই স্তবকে পর পর একই শব্দের মাঝখানে ব্যবহারকৃত সূক্ষ্ম যতিচিহ্নের মাধ্যমে অর্থের রূপভেদ ঘটিয়ে যতিবিন্যাসের ব্যঞ্জনায় ঐ পঙ্ক্তিতে কবিতার ভাবান্তর ঘটিয়ে একাধিক স্তর সৃষ্টি করেছেন। যেমন ১৮ নং পৃষ্ঠার ‘আবহমান গোত্রিয়তা’ কবিতায়
“[…] এই একবিংশেও গোত্রিয়তার স্পষ্ট- স্পষ্ট রং বলবৎ রয়েছে…” )।
এখানে ‘গোত্রিয়তার স্পষ্ট’ দীর্ঘ ধীরলয়ে এবং জোরধ্বনির শব্দপ্রবাহে পূর্বস্তবকের ভাবনাকে বহন করে এনেছেন। আবার ঐ একই শব্দের পাশে ক্ষুদ্র ড্যাশ বসিয়ে ‘স্পষ্ট রং’-এর ব্যবহারে শব্দপ্রবাহের ধ্বনিকে উচ্চ থেকে নিম্নগামী করে ঐ স্তবকের ভাবনার পরিবর্তন করিয়ে কবিতায় ভিন্ন আরেকটি স্তর সৃষ্টি করেছেন। এভাবে এ গ্রন্থের ফরেনসিক বিশ্লেষণ করলে এরকম একই কাব্যচমকের একাধিক উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে। যেমন আবারও ১৯ নং পৃষ্ঠার ‘বেদের বহর’ কবিতায়Ñ
“ […] খুঁজব, খুঁজব সারারাত বুক ঘষে-ঘষে…”
সূক্ষ্ম যতিচিহ্ন কমা বসিয়ে ‘খুঁজব, খুঁজব’ এর মধ্যেকার অর্থের রূপভেদ ঘটিয়ে যতিবিন্যাসের ব্যঞ্জনায় এই পঙ্ক্তিতে কবিতারও অর্থবোধের রূপান্তর করেছেন।
দৈহিক সৌন্দর্য দেখেই উল্লসিত না হয়ে এই গ্রন্থের কিছু কবিতায় বিরামহীনভাবে নারীর সঙ্গসুখ কামনা করেছেন। কবি দেহমন-সম্পর্কিত সামান্য জড়পি-ের সৌন্দর্যে মুগ্ধ না হয়ে পবিত্র এবং আপামর পরমা সৌন্দর্যের দেখা পেয়েছেন। কবি ও কবিতার দ্বৈরথে মনের বিমলানন্দ তেমন করে বুঝাতে বস্তুনিষ্ঠ চোখ দিয়ে ১৯ নং পৃষ্ঠার ‘বেদের বহর’ কবিতায় কবি হাফিজ রশিদ খান তদ্রুপ সাহিত্যধর্মী বয়ান সৃষ্টি করছেন।
কবির বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কখনো সংহতি, কখনো ব্যপ্তি ও বৈচিত্র্য দানের প্রয়োজনেই ‘ডিঙা ভাসে দক্ষিণ সমুদ্রে’ গ্রন্থে যৌক্তিক উপকরণে উপমার ব্যবহার করেছেন । এসব উপমা সাধারণ চিত্র বা ছবি নয়, এগুলি হচ্ছে কবির ইন্দ্রীয় চেতনার দৃষ্টি। যেমন- “ […] আর অদূরে যানজটের ভিড়ে গাড়িগুলোর ভেতরে কয়েদির মতো বিপন্ন মুখে বসে থাকা মানুষগুলিকে দেখি…”
( সঠিক শব্দটার খোঁজে : পৃষ্ঠা ৩০) ।
একখ- ০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বরফকে তাপ দিলে তা প্রথমে পানি এবং সেই পানিকে আরও উত্তাপ দিলে ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে, এটাই হল এক রকমের বিকাশ ও পরিণতি। কিন্তু কেউ যদি আদিবাসীদের আবাস থেকে কোনো উঁচু পাহাড় দেখে, ক্রমে ভ্রমণ করে করে ‘দক্ষিণ সমুদ্রে’ এসে পৌঁছান, তবে কি বলা যাবে ‘দক্ষিণ সমুদ্রে’ হল উঁচু পাহাড়ের পরিণতি? কোনটাই কারও পরিণতি নয়, অন্তত বরফ আর বাষ্পের মতো নয়, সবটাই কবির জীবনভ্রমণের অভিজ্ঞতা। ‘ডিঙ্গা ভাসে দক্ষিণ সমুদ্রে’ কাবগ্রন্থ পাঠের অনুভূতিও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ঐ ভ্রমণেরই অনুরূপ সমগ্র গ্রন্থটি পাঠকালে গোচর হয় কেবলই কবি হাফিজ রশিদ খানের সহৃদয় অনুভবেরই আহরণ।

শেয়ার করুন
The Post Viewed By: 187 People

সম্পর্কিত পোস্ট