চট্টগ্রাম রবিবার, ২১ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

হৃদরোগ চিকিৎসায় শুধু ‘নেই’ আর ‘নেই’

ইমাম হোসাইন রাজু

৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ | ১২:০৭ অপরাহ্ণ

আনোয়ারার বাসিন্দা মো. সুমন। সম্প্রতি হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব হয় এ যুবকের। দ্রুত সময়েরমধ্যে ছুটে যান আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসককে বুকে ব্যথার কথা বলা মাত্রই তিনি ইসিজি পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন। কিন্তু ইসিজি সেবা নেই হাসপাতালটিতে। সুমন বলেন, ‘শুধু ইসিজি সেবাই নয়, ওই সময়ে হৃদরোগের কোন চিকিৎসকও ছিলেন না। বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে পরীক্ষা ও ডাক্তার দেখাতে হয়েছে।’

 

অবশ্য, হাসপাতালটিতে একজন হৃদরোগ চিকিৎসক নিয়োজিত আছেন। তবে যন্ত্রপাতি না থাকায় সবসময় সেবা প্রদান করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির প্রধান ডা. মামুনুর রশিদ।

 

আনোয়ারা উপজেলায় হৃদরোগের বিশেষজ্ঞ থাকলেও পদই নেই সাতকানিয়া, ফটিকছড়ি, কর্ণফুলী, রাউজান ও সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ইসিজি মেশিন থাকলেও অকেজো প্রায়। শুধু এ পাঁচ উপজেলায় নয়-চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলার মধ্যে ৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই নেই হৃদরোগের কোন চিকিৎসক। যে ক’টি উপজেলায় চিকিৎসক আছেন, সেসব উপজেলায় নেই হৃদরোগীদের পূর্ণাঙ্গ সেবাদানের যন্ত্রপাতি কিংবা ব্যবস্থাপনাও। যে ক’টি ইসিজি মেশিন রয়েছে, তাও প্রায় অকেজো কিংবা জনবল না থাকায় অযতেœ অবহেলায় পড়ে আছে। কথার প্রসঙ্গে কয়েকজন চিকিৎসক বলেই ফেলেন, ‘বুকে ব্যথা নিয়ে কোন রোগী এলে একপ্রকার অনুমানের উপর নির্ভর করে পরামর্শ দেওয়া হয়। আবার পরিস্থিতি খারাপ মনে হলে চমেক হাসপাতালে রেফার করা হয়। কেননা হৃদরোগীদের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত কোন সুযোগ-সুবিধাই নেই উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে।’

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন- জরুরি মুহূর্তে হৃদরোগীরা দূরের পথ মাড়িয়ে গ্রাম থেকে আসতে হয় শহরে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতেই অনেক রোগীকে গাড়ি কিংবা এম্বুলেন্সেই মৃত্যুর মুখে পড়তে হচ্ছে। অথচ গ্রামে চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ থাকলে বাঁচানো যেত এমন অনেক মুমূর্ষু রোগী। গ্রামগঞ্জে এখনও সহজলভ্য হয়নি হৃদরোগের চিকিৎসাসেবা। সেখানে গড়ে ওঠেনি বিশেষ কোনো ইউনিট কিংবা সেবাদানের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাও।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হৃদরোগ চিকিৎসক বলেন, ‘কয়েকটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চাকরি করেছি, এখনো কর্মরত। শুধুমাত্র যন্ত্রপাতি না থাকার কারণে রোগীদের সেবা দেওয়া যায় না। যেখানে হৃদরোগের চিকিৎসকই নেই, ওই হাসপাতালে অন্য চিকিৎসকরা অনুমান করে চিকিৎসা দিচ্ছেন। অনেকেই বুকে ব্যথার সমস্যাকে গ্যাস্টলোজির সমস্যাও মনে করে ওষুধ দিয়ে ছেড়ে দেন। দেখা যায় ওই রোগীও বাড়ি ফেরার আগেই মারা যান। অন্তত প্রতিটি উপজেলায় যদি একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও ইসিজি মেশিন থাকে, তাহলে কিছুটা হলেও মৃত্যুর ঘটনা কমে আসবে।’

 

এদিকে, চট্টগ্রামের একমাত্র হৃদরোগের চিকিৎসা কেন্দ্র চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়- হাসপাতালটিতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের প্রায় ৭০ শতাংশই হচ্ছেন গ্রামের রোগী। বেশিরভাগই হাসপাতালে আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আবার কিছু রোগী দু-একদিনের মধ্যেই মারা যাচ্ছেন। এছাড়াও প্রায় ২০ শতাংশ রোগীর মৃত্যু ঘটছে পথিমধ্যেই।

 

অবশ্য, এ জন্য হৃদরোগ চিকিৎসকরা বলছেন- সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে মৃত্যু হচ্ছে এসব রোগীর। ৫০ শতাংশ রোগী শুধুমাত্র সিসিইউতে আসার আগেই মৃত্যু বরণ করছেন। তাই উপজেলা পর্যায়ে যদি হৃদরোগের সেবা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এ সমস্যা দূর হবে।

 

চলতি বছরের মধ্য জুনে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হয় হৃদরোগ চিকিৎসকদের দুই দিনের আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন। সেখানে গ্রাম পর্যায়ে হৃদরোগের আধুনিক চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হয়। সম্মেলনে হৃদরোগ চিকিৎসকরা বলেছিলেন- হৃদরোগ এমন একটি রোগ যা মানুষকে দূরবর্তী হাসপাতালে এনে চিকিৎসা করার সময়টুকু দেয় না। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে মানুষের জীবন বিপন্ন হতে পারে। তাই শুধুমাত্র শহর ভিত্তিক না রেখে হৃদরোগের আধুনিক সেবা বিকেন্দ্রীকরণ করা প্রয়োজন।

 

বাংলাদেশ হাইপারটেনশন এবং হার্ট ফেইলিউর ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার দাশ বলেন, ‘উপজেলা হাসপাতালগুলোর যথেষ্ট অবকাঠামো রয়েছে। আবার হৃদরোগেরও যথেষ্ট চিকিৎসক আছেন। কিন্তু অনেক উপজেলায় চিকিৎসকের পদই নেই। যার কারণে উপজেলা হাসপাতালগুলোতে হৃদরোগীরা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া যন্ত্রাপাতির সংকটও প্রকট। যদি পদ সৃষ্টির পাশাপাশি চিকিৎসক ও জনবল বৃদ্ধি এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি যুক্ত করা হলে এ সমস্যা দূর হবে। মনে রাখতে হবে হৃদরোগ অন্যান্য রোগের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে মৃত্যু ঘটে। তাই এ বিষয়ে সরকারকে অবশ্যই সুনজর দিতে হবে। শহর ভিত্তিক না রেখে হৃদরোগের চিকিৎসাসেবা গ্রামেও পৌঁছে দিতে হবে।’

 

পূর্বকোণ/আরডি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট