চট্টগ্রাম রবিবার, ২১ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

যাত্রা শুরু হোক

ডা. মো. সাজেদুল হাসান

২২ জুন, ২০২৪ | ৬:৩৮ পূর্বাহ্ণ

জাতিগতভাবে আমরা অস্থিরমতি। কমিটমেন্ট আর ধৈর্যেরও যথেষ্ট অভাব রয়েছে- যা সমাজের সর্বস্তরে প্রতিফলিত। ক্রিকেটাররাও এর ব্যতিক্রম নন। লিফটে উঠতে গেলে বা বাস-ট্রেনে চড়তে গিয়ে কার আগে কে উঠবে এই প্রতিযোগিতায় এদেশীয় চরিত্র সহজেই অনুধাবন করা যায়।
তবে আমাদের ক্রিকেটারদের টেকনিক ও দক্ষতায় ঘাটতি নেই; শুধু শারীরিক শক্তি ও সহিষ্ণুতার বড় অভাব। অযথাই মারতে গিয়ে সহজ আউট হই, আবার প্রয়োজনের সময় হাত গুটিয়ে থাকি। কৌলতাত্তি¡ক কারণে আমরা খর্বকায়, অন্য দলগুলোর তুলনায় হাতের রিচ গড়ে এক ফুটেরও কম- যা গ্রাউন্ড ফিল্ডিংয়ে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
হাতের নাগাল ১ সেমি কম হলেই যে বলে কোন রান হওয়ার কথা নয় বা বড় জোর এক রান হতো সেটি চার হয়ে যায়। বাউন্ডারি লাইনে ক্যাচ ধরতে গিয়েও অনুরূপ সমস্যা প্রকট। তাছাড়া হাতের গ্রিপও ছোট। যার কারণে ক্যাচ ফসকে যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। পেশিশক্তির দৌর্বল্যে ছয় মারতে গিয়ে সীমানায় ধরা পড়ি। কমিটমেন্টের কারণে বাউন্ডারি লাইনে স্লাইডিং ফিল্ডিং না করে পা দিয়ে বল আটকানোর দুর্বল চেষ্টা করি, যা প্রায়শই দৃষ্টিকটু মনে হয়।
এত সীমাবদ্ধতার পরেও বাংলাদেশ সুপার এইটে উঠেছে; দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্র্রেলিয়া, ভারতের মতো দলের সাথে প্রায় সমান তালে লড়ছে। তখন দলটিকে অভিনন্দন জানাতেই হয়। কিন্তু আমরা আর কতদিন এভাবে টিমটিম করে জ্বলবো? ক্রিকেট আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের পতাকা সমুজ্জ্বল করেছে। সুতরাং এই খেলাটির দিকেই আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে।
এককালে বাংলাদেশে ফুটবল অনেক জনপ্রিয় খেলা ছিল। কিন্তু অফুরান দম, শক্তি, কৌশল ও দক্ষতার অভাবে আমরা ম্রিয়মান গেছি। আবার সহসা উঠে আসতে পারবো- সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। সুতরাং ক্রিকেটই আমাদের ভরসা। মানলাম আমাদের শারীরিক সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু সেটা অতিক্রম করার চেষ্টাতো প্রয়োজন। কিছু পরামর্শ এখানে প্রাসঙ্গিক হবে।
প্রথমত, আমাদের দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ খেলোয়াড়ের অনুপাত বৃদ্ধি করতে হবে এবং সেটি স্কুলপর্যায় থেকে শুরু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্লাব ক্রিকেট আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে; সেজন্য ভারতের মতো বেশ কিছু ট্রফি চালু করা যায়। স্কুল ক্রিকেটকেও সংগঠিত করে সেখান থেকে প্রতিভা অন্বেষণ করা সম্ভব। উৎসাহ বাড়াতে এক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষক আকর্ষণ করা যায়। তৃতীয়ত, দল নির্বাচনে নির্মোহ হতে হবে। অভিজ্ঞতা আর পারফরমেন্সের সমন্বয়ই হবে খেলোয়াড় মূল্যায়নের মাপকাঠি। গø্যামার কিংবা স্বজনপ্রীতির অবাধ সুযোগ নিবৃত্ত করতে হবে। সর্বোপরি প্রয়োজন একটি দক্ষ পেশাদার ক্রিকেট প্রশাসন, দেশের সম্মানই যার কাছে মুখ্য বিবেচ্য হবে।
নিম্নমধ্যবিত্তের দেশ বিবেচনায় আমাদের ক্রিকেটে সুযোগ সুবিধা কম- এটি বলা যাবে না। তবে বিনিয়োগ আরও বৃদ্ধি করতে হবে। হতে পারে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড অনেক সম্পদশালী এবং এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ তাদের সাংগঠনিক কাঠামো দৃঢ় করেছে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও দীনহীন নয়। আন্তর্জাতিক মানের আমাদের বেশ কটি মাঠ আছে, প্রতিটি জেলা এমনকি উপজেলা পর্যায়েও ভালো স্টেডিয়াম আছে। এর কোন কোনটি হয়তো সামান্য সংস্কার প্রয়োজন হবে। এছাড়া প্রতিটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনও বেশ কিছু মাঠ অবশিষ্ট রয়েছে, এগুলোকে ব্যবহার করা যায়। বিকেএসপির মতো ঢাকার বাইরে আরও কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।
নবাগত আফগানিস্তানের নিজস্ব তেমন অবকাঠামো নেই; ভারত, পাকিস্তানের মাঠে তারা অনুশীলন করে। ইউএসএ মাত্র যাত্রা শুরু করেছে। তারপরও তারা দ্রæতই এগিয়ে যাচ্ছে, ক্রিকেট বিশ্বের পরাশক্তিদের চোখ রাঙাচ্ছে। তাহলে আমাদের অগ্রসর হতে বাধা কোথায়?
ক্রিকেট এখন পেশী ও কৌশলের যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তার সাথে তাল মেলাতে না পারলে আমরা ফুটবলের মতো হারিয়ে যাবো। শারীরিক সীমাবদ্ধতা যেখানে অনতিক্রম্য, নিবিড় অনুশীলন ও সাহস দিয়েও সেখানে অনেক দূর অগ্রসর হওয়া যায়। ছোটখাটো গড়নের মুশফিক কিংবা হৃদয়ের দিকে তাকালে ভরসা জাগে।

লেখক : বাংলাদেশ সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট