চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৯ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল ও মেডিক্যাল আইসোটোপ প্রসঙ্গে

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

৬ জুলাই, ২০২৪ | ৬:৪৩ অপরাহ্ণ

জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে টরোন্টো জেনারেল হাসপাতালের পাশের গধজঝ (Medical and Related Sciences) অডিটোরিয়ম এ অনুষ্ঠিত হলো কানাডিয়ান রেডিওথেরানস্টিক লীডারস সামিট, ২০২৪। এই সামিট প্রথমবারের মতো যৌথভাবে আয়োজন করে কানাডিয়ান নিউক্লিয়ার আইসোটোপ কাউন্সিল, ইউনিভার্সিটি অফ টরোন্টো এবং কানাডিয়ান মেডিক্যাল আইসোটোপ ইকোসিস্টেম। আমন্ত্রিত অতিথির মধ্যে ছিল রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, ফিজিসিস্ট, নিউক্লিয়ার পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ার, থেরানস্টিক (THERApeutic+DiagNOSTIC) কোম্পানীর সিইও, নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর সাইন্টিস্ট এবং এটমিক এনার্জির রেগুলেটর।

প্রায় ১৫০ জন আমন্ত্রিত আইসোটোপ এক্সপার্ট এই মিটিং-এ জড়ো হয়েছিল। আমি যেহেতু আমার সেন্টারে ক্যানসারের রোগীদেরকে আইসোটোপ দিয়ে চিকিৎসা করে থাকি সেই সুবাদে এই মিটিং-এ আমার যোগদান করার সুযোগ হয়েছে। মিটিং-এর থীম ছিল ‘হোপ ফর আইসোটোপ’।বাংলদেশ ও অন্যান্য অনেক দেশে নিউক্লিয়ার মেডিসিন স্পেশালিস্টরা আইসোটোপ-এর সাহায্যে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশে এটমিক এনার্জি কমিশন ন্যাশনাল ইনিস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার মেডিসিন এন্ড এল্যায়েড সাইন্স সংক্ষেপে NINMAS-এর মাধ্যমে নিউক্লিয়ার মেডিসিন সার্ভিস দিয়ে থাকে। NINMAS-এর প্রধান কার্যালয় বিএসএমএমইউ তে। এইখানে রেডিওএকটিভ আইসোটোপ-এর মাধ্যমে বিভিন্ন রেডিওলজিক্যাল ডায়াগনোসিস যেমন বোন স্ক্যান, পিইটি (PET) স্ক্যান, হার্ট ,কিডনী ও থাইরয়েড গ্ল্যান্ড এর স্ক্যান করা হয়ে থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দেহে মোট ২০৬টি হাড় থাকে। জন্মের সময় এই হাড়ের সংখ্যা ৩০০টি ক্রমে তা ২০৬টিতে দাঁড়ায়। দেহের বৃহত্তম হাড়টি ঊরু অস্থি। এর নাম ফিমার। হাড়ের স্ক্যান করার জন্য ঞ-৯৯ (টেকনেসিয়াম-৯৯) ও পিইটি স্ক্যানের জন্য ঋউএ-১৮ গ্লুকোজ আইসোটোপ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
আমরা জানি যে মৌলিক পদার্থের ক্ষুদ্রতম কনার নাম পরমাণু। যে সব পরমাণুর প্রোটন সংখ্যা সমান কিন্তু ভরসংখ্যা ভিন্ন হয়, সেসব পরমাণুকে পরস্পরের আইসোটোপ বলে। কিছু আইসোটোপ হতে স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে রেডিয়েশন নির্গত হয়, তাদেরকে বলা হয় রেডিওএকটিভ (তেজস্ক্রিয়) আইসোটোপ। রেডিয়েশনের বিষয়টি মাথায় রেখে ক্যানসার কোষকে ধ্বংস করার জন্য মানুষের শরীরে এই রেডিওএকটিভ আইসোটোপ ব্যবহার করা হয়। গেøাবাল নিউক্লিয়ার মেডিসিনের ইতিহাসে প্রথম মেডিক্যাল আইসোটোপ রেডিয়াম-২২৬-এর ব্যবহার শুরু হয় চামড়ার টিউবারকিউলোসিস (যক্ষারোগ)-এ ১৯০১ সালে। তারপর জধফরঁস-২২৬ এর সীল্ড সোর্স গলা, জরায়ু মুখ, প্রস্টেট ও ব্রেস্ট ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৩১ সালে সাইক্লট্রন আবিস্কার হলে মেডিকেল আইসোটোপ অন ডিমান্ড তৈরী করার সুযোগ হয়। সাইক্লোট্রন একটি যন্ত্র, এটি আসলে একটি কণা ত্বরক, একটি মেশিন, যা চার্জযুক্ত কণাগুলোকে খুব উচ্চগতিতে এবং শক্তিতে চালিত করার জন্য ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ক্ষেত্র ব্যবহার করে, রেডিওফার্মাসিউটিক্যালস নামক একধরণের চিকিৎসা ওষুধের জন্য রেডিওআইসোটোপ তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়, যা ক্যান্সার নির্ণয় করে এবং ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়।
বিশ্বজুড়ে ১৫০০টিরও বেশি সাইক্লোট্রন মেশিনের সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশে সরকারী পর্যায়ে শুধুমাত্র ঢাকায় ২টি এবং বেসরকারী পর্যায়ে ১টি সাইক্লোট্রন আছে। খুব সম্ভবত চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ শহরে দুইটি সাইক্লট্রন স্থাপনের বিষয় প্রক্রিয়াধীন। সাইক্লোট্রনের দাম ১৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার। সময়ের সাথে সাথে নতুন নতুন আইসোটোপ আবিস্কার হতে থাকে এবং বিভিন্ন ক্যান্সারের নিরাময়ে এই আইসোটোপের ব্যবহার বাড়তে থাকে। আইসোটোপ তৈরীর প্রক্রিয়া খুবই জটিল এবং ব্যয়বহুল। ১৯৫১ সালে কানাডা কোবাল্ট-৬০ (ঈড়-৬০) আইসোটোপ দিয়ে প্রথম রোগীর চিকিৎসা শুরু করে। সেই সময় থেকে কানাডা কমার্শিয়াল লেভেলে ঈড়-৬০ তৈরী করছে এবং আইসোটপ তৈরীতে নিজেদেরকে পৃথীবির এক নম্বর দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ঈড়-৬০ ক্যান্সারের চিকিৎসা ছাড়া মেডিকেল ইক্যুইপমেন্ট এবং খাদ্য স্টেরিলাইজেশন এর জন্য ব্যবহার করা হয়। আর্জেন্টিনা, রাশিয়া এবং ইন্ডিয়া ও কোবাল্ট-৬০ তৈরী করে থাকে। মলিবডেনাম নামের আইসোটোপ মেডিকেল সাইন্সে সবচেয়ে বেশী ব্যবহার করা হয়। কানাডা পৃথিবীর ৯৬ ভাগ মলিবডেনাম-৯৯ (গড়-৯৯) তৈরী করে থাকে। মলিবডেনাম (গড়-৯৯) হলো টেকনেশিয়াম-৯৯ (ঞপ-৯৯) এর প্রিকারসার যা রেডিওলজি ও ইমেজিং-এ সবচেয়ে বেশী ব্যবহার করা হয়। কানাডা ২৫০ ধরনের মেডিকেল আইসোটোপ তৈরী করে থাকে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য আইসোটপ হলো ওড়ফরহব-১২৫, যা প্রস্টেট ক্যান্সার নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়াও লুটেশিয়াম-১৭৭ (খঁ-১৭৭), কপার-৬৭, একটিনিয়াম-২২৫ (অঈ-২২৫) জিএ-৬৮ (এধ-৬৮) ইত্যাদি। নিজেদের চাহিদা পূরণ করে পৃথিবীর ৩০টি দেশে কানাডা রেডিও আইসোটোপের জোগানদাতা। রেডিও আইসোটপের ৭০ ভাগ মার্কেট কানাডার দখলে। ২০২১ সালে রেডিও আইসোটোপের বিজনেস হয়েছে ৬ বিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সাল পর্যন্ত বছরে এই ব্যবসার গ্রোথ ১৫% হারে বাড়তে থাকবে। কানাডা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মেডিক্যাল আইসোটোপের যোগানদাতা। অনেক আইসোটোপ যেমন কোবাল্ট-৬০, সিজিয়াম ও ইরিডিয়াম সাধারণত নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের বাই প্রডাক্ট হিসাবেও উৎপাদিত হয়ে থাকে।
তেজস্ক্রিয়তার কারণে আইসোটোপের তৈরী, সংরক্ষণ, পরিবহন ও ক্লিনিকেল এপ্লিকেশনে কঠোর প্রটোকল মেনে চলতে হয়। কানাডার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় আইসোটোপ ইন্ডাস্ট্রির উৎপাদন থেকে শুরু করে সাপ্লাই চেইনের প্রতিটা স্তরে স্তরে ম্যানপাওয়ার ও যথাযথ প্রটোকল তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে রেডিও ফার্মাসিউটিক্যালে কানাডার সাথে অন্যান্য দেশের তাল মিলানো বেশ কঠিন। বর্তমানে নিন্মেবর্ণিত ক্যান্সারগুলো যেমন থাইরয়েড গøান্ডের ক্যান্সার পুরুষের প্রস্টেট ক্যান্সার, লিভার ক্যান্সার ও নিউরোএন্ডোক্রাইন টিউমার। এ (ভারতীয় অভিনেতা ইরফান খান এই টিউমারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান) আইসোটপ ব্যবহার করা হয়। টিউমারের চিকিৎসা ছাড়াও আইসোটোপ রেডিওলজিক্যাল ডায়াগনোসিস এর জন্যও ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশে ক্যান্সারের চিকিৎসা এবং ডায়াগনোসিসের জন্য আইসোটপের চাহিদা প্রচুর। আমাদের দেশে রেডিও ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি এখনো গড়ে উঠে নাই। আইসোটপ তৈরী যেহেতু একটি জটিল প্রক্রিয়া তাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সাথে যৌথ উদ্যোগে এই ইন্ডাস্ট্রির শুরু করা দরকার। রুপপুর পারমাণবিক পাওয়ার প্লান্টও হতে পারে আইসোটপের যোগানদাতা। আশা করি বাংলাদেশ আনবিক শক্তি কমিশন এ ব্যাপারে যথাযথ ভূমিকা পালন করবে।

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন
রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, নিউব্রুনস্উইক, কানাডা।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট