চট্টগ্রাম সোমবার, ২২ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

প্লাস্টিকে অশনি সঙ্কেত

মো. দিদারুল আলম

৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ | ৬:১২ অপরাহ্ণ

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা, যা বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশকে একটি এককপর্যায়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের একাধিক কারণ আমাদের সামনে দণ্ডায়মান। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, এটি যতটা না প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট, তার থেকেও বেশি মানবসৃষ্ট। মানবসৃষ্ট একাধিক কারণের মধ্যে একটি হচ্ছে প্লাস্টিক। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক ইনিশিয়েটিভে বাংলাদেশের নাম উঠে আসছে। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের ঝুঁকির বিষয়গুলোর পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, বায়ু, পানি ও পরিবেশ দূষণের মতো বিষয়গুলো আলোচিত হচ্ছে। প্লাস্টিক বর্জ্যের ক্ষতিকর দিকগুলো আলোচিত হচ্ছে নানাভাবে।

আমাদের পরিবেশ চরম বিপর্যয়ের মুখে। পরিবেশের বিরূপ প্রভাব বিস্তারকারী নানাধরনের উপাদানের কারণে বর্তমানে আমাদের পরিবেশ এখন প্রায় ধ্বংসের মুখে। দিন যতই গড়িয়ে যাচ্ছে, ততই প্রভাব পড়ছে আমাদের প্রকৃতির ওপর। নানামুখী চাপে আজ পরিবেশ বিপর্যস্ত। তার মধ্যে রয়েছে আবার আমাদের হাতে পরিবেশ ধ্বংসকারী নানান প্রকারের বস্তু, যেমন প্লাস্টিক, পলিথিন, পানি শোষণকারী বিদেশি জাতের পরিবেশ ধ্বংসকারী বিভিন্ন রকম গাছ, কার্বন নিঃসরণকারী নানামুখী প্রকল্প, গাড়ির কালো ধোঁয়াসহ আরও বিভিন্ন উপাদান। সাম্প্রতিক সময়ে আর্থ-ডে নেটওয়ার্কে প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০১৮ সালে বিশ্বের সর্বাধিক ২০টি প্লাস্টিক দূষণকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে চীন ও ইন্দোনেশিয়া। দেশের বর্জ্যেও প্রায় ৮ শতাংশ হলো প্লাস্টিক। এর চারভাগের একভাগ গিয়ে পড়ে সাগরে ও নদীতে।

এসব কারণে ব্যবহার-পরবর্তী প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্লাস্টিক দূষণ রোধে জাতীয় মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত থাকলেও ২০২০ সালে প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ টনের মতো, যা মোট ব্যবহারের প্রায় ২০ ভাগ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, এ সময়ে উৎপাদিত ১৪ লাখ ৯ হাজার টন প্লাস্টিক পণ্যের অর্ধেকের বেশি ব্যবহৃত হয়েছিল পণ্যের মোড়ক ও প্যাকেজিং খাতে। বিশেষত পলিথিনের ভয়ংকর আগ্রাসন আমাদের সামগ্রিক পরিবেশ ও বাস্তু ব্যবস্থাপনাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

ঢাকা শহর ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্যের অপরিমিত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এর জন্য অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আমরা যদি লক্ষ করি, তাহলে দেখতে পাবেন, চট্টগ্রাম শহরের প্রতিটি অলিগলি, ড্রেন, নালা, খাল ও পতিত জলাশয় প্লাস্টিক বোতল ও পলিথিনে বদ্ধ হয়ে আছে। একই অবস্থা ঢাকাসহ অন্যান্য শহরগুলোতেও। আর সেখানে পানিসহ সবকিছুই দূষিত হচ্ছে। আর সেই বদ্ধ জলাশয়ের দূষিত পানিতে জন্ম নিচ্ছে ডেঙ্গু রোগবাহিত এডিস মশাসহ ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, কলেরা, টাইফয়েডের মতো নানা ধরনের রোগবালাই।

যার কারণে পরিবেশ এখন প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। আর তাই আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তাহলে আমাদের পতিত হতে হবে মহাকালের মহাবিপর্যয়ে। পলিথিনের বিকল্প হয়ে উঠেছিল যে কাগজ বা পাটের ব্যাগ, তা বিলুপ্তির পথে। সরকার পাটের কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছে। যার কারণে প্লাস্টিকের কারখানাগুলো রমরমা ব্যবসা করছে। আমরা যত যা কিছুই বলি না কেন, এই ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়কারী পণ্য যদি বন্ধ করতে না পারি, তাহলে যেমন আমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারব না, তেমনি পারব না আগামী প্রজন্মের জন্য একটা সুন্দর সুশীতল সবুজ পৃথিবী রেখে যেতে।

পৃথিবীতে প্রতিবছর প্রায় ৪৫ কোটি টনের বেশি প্লাস্টিকবর্জ্য পরিবেশে যোগ হচ্ছে। এ বর্জ্যের ৫১ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে এশিয়া মহাদেশে। প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন এবং দূষণে চীন পৃথিবীর সর্বোচ্চ অবস্থানে। বাংলাদেশে প্রতিদিন আট লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, তার মধ্যে শতকরা ৩৬ ভাগ পুনর্চক্রায়ণ, ৩৯ ভাগ ভূমি ভরাট এবং বাকি ২৫ ভাগ সরাসরি পরিবেশে দূষক হিসেবে যোগ হচ্ছে। এসব পচনরোধী প্লাস্টিক বর্জ্যরে শতকরা ১০ ভাগ পুড়িয়ে ধ্বংস করা হলেও বাকি ৯০ শতাংশের বেশি বিশ্ব পরিবেশকে নানাভাবে বিপন্ন করে তুলেছে। প্লাস্টিক দূষণ হ্রাস করার জন্য সময়োপযোগী আইন তৈরি, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং প্লাস্টিক দূষণের ক্ষতিকর দিক ও করণীয় সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দেশ, যা ২০০২ সালে পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করে।

তবে সঠিকভাবে মনিটরিংয়ের অভাবে বিভিন্নভাবে পলিথিন উৎপাদন হচ্ছে। দেশের সুনীল অর্থনীতির প্রাকৃতিক সম্পদ বঙ্গোপসাগর আজ প্লাস্টিক দূষণে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত। পরিবেশ রক্ষার্থে এবং জনস্বার্থে প্লাস্টিক পণ্যের ওপর অধিকহারে শুল্ক আরোপ করা যেতে পারে। অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্য আমদানি বন্ধ করতে হবে। আমাদের দেশে পলিথিনের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও বিক্রি সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। পলিথিনের বিকল্প হিসেবে পাটের বা চটের ব্যাগ, কাপড়ের ব্যাগের সরবরাহ বাড়াতে হবে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটজাত পণ্যের ব্যবহারে মানুষজনকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

পাটের সুতা মূলত সেলুলোজ, হেমিসেলুলোজ ও লিগনিন দ্বারা গঠিত। সেজন্য পাটজাত দ্রব্যের বর্জ্য সহজে পরিবেশে পচে মৃত্তিকার উর্বরা শক্তি বাড়ায়। পাট ও পাটপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে পাটপণ্যকে ‘বর্ষপণ্য ২০২৩’ ঘোষণা করেছে সরকার। বাংলাদেশের সোনালি আঁশের মাধ্যমে তৈরি সোনালি ব্যাগসহ প্লাস্টিকের বিকল্প অন্যান্য পাটজাত দ্রব্য ব্যবহারে জনগণের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করার জন্য সরকার, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে একযোগে কাজ করতে হবে। সর্বত্র পাটজাত পণ্যেও প্রাপ্তি সুলভ করতে সরকার এসব পণ্য উৎপাদনে ভর্তুকি প্রদান করে উৎপাদনকারীদের উৎসাহী করে তুলতে পারে।

প্লাস্টিক পদার্থের বিয়োজন খুবই কষ্টসাধ্য। কিছু প্লাস্টিকের বিয়োজন হতে প্রায় হাজার বছরও লেগে যায়। প্রাকৃতিকভাবে পচে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে ৩০০ থেকে ৪০০ বছর লেগে যায়। এক গবেষণায় প্রমাণিত, মুদিদোকান থেকে কেনা পণ্য বহন করার জন্য যেসব ব্যাগ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো প্রকৃতিতে মিশে যেতে ২০ বছর সময় লাগে। চা, কফি, জুস ইত্যাদি কোমল পানীয়র জন্য ব্যবহৃত প্লাস্টিক কাপ ৫০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে। ডায়াপার এবং প্লাস্টিক বোতল ৪৫০ বছর পর্যন্ত পচে না। যে জিনিসের বিয়োজিত হতে যত বেশি সময় লাগে, সে জিনিসটি পরিবেশের জন্য তত হুমকির কারণ।

প্লাস্টিকের বিয়োজন অনেক সময়সাপেক্ষ, ফলে ব্যবহৃত প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্যগুলো মাটির সঙ্গে না মিশে মাটিতেই থেকে যায়। লিথিফিকেশনের ফলে সেগুলোর ওপর আবার মাটি এসে পড়ে ফলে আপাতদৃষ্টিতে তা প্লাস্টিক মুক্ত মনে হলেও তার নিচে রয়েছে হাজারো প্লাস্টিক পদার্থ। এই প্লাস্টিকগুলো গাছপালাকে মাটি থেকে অক্সিজেন নিতে বাধা প্রদান করে ফলে অক্সিজেনের অভাবে গাছপালার বৃদ্ধি রহিত হয়, অনেক সময় অকালে মারা যায়। আবার প্লাস্টিকের স্তরের জন্য বৃষ্টির পানি মাটির ভেতরে পৌঁছাতে পারে না, যার ফলে পানির স্তর নিচে নেমে যায়, যা আমাদের সুপেয় পানির যোগানের ক্ষেত্রে অন্তরায়। আগামী ৫০ বছরে সমৃদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৩ ফুট বাড়লে, বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ উপকূলীয় এলাকা পানিতে তলিয়ে যাবে। তার মধ্যে চট্টগ্রাম অন্যতম।

আমাদের উদ্যোগী হওয়ার সময় এখনই। আসুন সবাই সচেতন হই। আমাদের এই সুন্দর দেশ তথা এই ধরণীর প্রকৃতি ও পরিবেশ বাঁচাতে আমাদের উচিত পলিথিন ব্যবহার না করে পাট বা কাগজের ব্যাগ ব্যবহার করা, গৃহস্থালি কাজে প্লাস্টিকপণ্য ব্যবহার না করে মাটি, বাঁশের পণ্য ব্যবহার করা, গৃহস্থালি পচনশীল বর্জ্য ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করে রাখা, চিপস, বিস্কুট, চকোলেট, আইসক্রিমের প্যাকেট যেখানে-সেখানে নিজেও না ফেলা পাশাপাশি শিশুদের এই বিষয়ে উৎসাহিত করা, ক্লিনিক্যাল বর্জ্য সাধারণ ময়লার মতো না ফেলে এটা নির্ধারিত নিয়মে পুড়িয়ে ফেলা, পাট জাতীয় পণ্য ও মাটির তৈরি পণ্য নিয়ে ব্যবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণ করা, গৃহস্থালী ও ব্যবসায়িক বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে ফেলা, পাট, বাঁশ ও মাটি দিয়ে আধুনিক, দৃষ্টিনন্দন পণ্য তৈরি ও বিপণন করা।

লেখক: মো. দিদারুল আলম, কথাসাহিত্যিক ও পরিবেশকর্মী।

 

পূর্বকোণ/সাফা/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট