চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২১ মে, ২০২৪

সংকট উত্তরণে বিএসইসির জরুরি বৈঠক

অতিকথনেই নষ্ট পুঁজিবাজার!

আরাফাত বিন হাসান

২৩ এপ্রিল, ২০২৪ | ১১:৪৮ পূর্বাহ্ণ

টানা পতনে রীতিমতো খাদের কিনারে পৌঁছে গেছে দেশীয় পুঁজিবাজার। সূচকের পতনে একের পর এক ভাঙছে সর্বনিম্ন সূচকের পুরনো রেকর্ড। আর তাতে বাড়ছে ফোর্সড সেল বা জোরপূর্বক শেয়ার বিক্রির চাপ। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সব শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ায় বাড়ছে শেয়ার শূন্য বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসেবের সংখ্যাও।

 

বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল ডিপজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের সর্বশেষ তথ্যে গতকাল ১ হাজার ১৪ জন বিনিয়োগকারী সব শেয়ার বিক্রি করে দিয়েছেন। এতে পুঁজিবাজারে শেয়ার শূন্য বিও হিসেবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬৩ হাজার ২০৮। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্নভাবে পুঁজিবাজার সংক্রান্ত নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। যদিও গুজবে কান দিয়ে জেনেবুঝে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের অনুরোধ জানিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটি এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সবমিলিয়ে আস্থা হারাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অনেকেই।

 

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, সাধারণত প্রতি ঈদে শেয়ার বিক্রি করে পুঁজি নগদ করেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। এবার ঈদের আগে বাজারে পতন থাকায় অধিকাংশই পুঁজি নগদ করতে পারেননি। আবার যেসব বিনিয়োগকারী ব্যাংকঋণ করে বিনিয়োগ করেছেন, পতনের মধ্যেও বাধ্য হয়ে লোকসানে শেয়ার বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের। তবে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুঁজিবাজার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না রেখেই নেতিবাচক কথা বলছেন অনেকে। অতিকথনেই নষ্ট হচ্ছে পুঁজিবাজার। তাছাড়া দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে বাজারে। সঙ্গে রয়েছে ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার প্রভাবও। তবে পুঁজিবাজারে আপাতত ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা না থাকলেও আরও কিছু সময় পর বাজার ঘুরে দাঁড়বে বলে আশা তাদের।

 

টানা পতনের পর সর্বশেষ সোমবার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও এখনও গেলো তিন বছরে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক। এর মধ্যে সোমবার পুঁজিবাজারের বর্তমান সংকট কাটাতে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছে বিএসইসি।

 

বর্তমান বাজার নিয়ে রহিম উদ্দিন রোহেল নামে এক বিনিয়োগকারী পূর্বকোণকে বলেন, পুঁজিবাজারের যা অবস্থা, উত্থানের কোন লক্ষণই নেই। টানা পতনের কারণে আমাদের মতো অনেকেই নিঃস্ব এখন। সবাই ধৈর্য ধরতে বলছেন, কিন্তু ব্যাংক তো ধৈর্য ধরবে না। তাদের তো লোন পরিশোধ করতে হবে। তাই বাধ্য হয়ে লসেই শেয়ার বিক্রি করতে হচ্ছে। এমনকি ঈদে সবাই টাকা ক্যাশ করে, এবার কেউ পারেনি। সবাই বলেছে ঈদের পর বাজার ঘুরে দাঁড়াবে, কিন্তু এখন অবস্থা আরও খারাপ।

 

লাইজু আবেদীন নামে আরেক বিনিয়োগকারী বলেন, অনেকদিন ধরে পুঁজিবাজারের সঙ্গে জড়িত, বিনিয়োগ করে ফেলছি, এখান থেকে চাইলেও বের হতে পারছি না। তবে আগে যে আস্থা ছিল এখন সেটা আর নেই। নতুন করে বিনিয়োগের আর সুযোগ নেই।

 

পুঁজিবাজারের বর্তমান সংকট নিয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ইনস্টিটিউট অব কস্ট এন্ড ম্যানেজমেন্ট একাউন্টম অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিন এফসিএমএ বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে বিভিন্ন শ্রেণির বিনিয়োগকারী আছে। একেক শ্রেণির বিনিয়োগকারীর কমেন্ট একেক রকম হবে। মূলত অতিকথনেই পুঁজিবাজারটা নষ্ট হয়ে গেছে। যে বোঝে সেও বলে, যে বোঝে না সেও বলে। লোকজন কোন তথ্য ছাড়াই কথা বলে।

 

ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার পর পুঁজিবাজারে পতন অনেকটা অবধারিত ছিল জানিয়ে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সাবেক এই পরিচালক বলেন, করোনার সময় বাজার পড়ে যেতে পারে- ওই সন্দেহে ফ্লোর প্রাইস বেঁধে দিয়েছিল, শর্ট টার্ম জিনিসটা লং টার্ম হয়ে যাওয়ায় সবাই অধৈর্য হয়ে গেছে। ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে বাজার পড়ারই কথা। তবে কিছু লোকের কারসাজিতে কৃত্রিমভাবে কয়েকদিন ধরে রেখেছিল। যদিও আমার কাছে তথ্য নেই, কিন্তু গুঞ্জন আছে বিদেশিরা এখন আর শেয়ার কিনতে আসে না। তারা না আসার বড় কারণ হলো আমাদের ম্যাক্রো ইকোনমিতে পজিটিভনেস নেই, আমাদের মুদ্রাব্যবস্থা স্থিতিশীল না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা না থাকায় ভালো ভালো শেয়ারগুলোর দাম কমে গেছে।

 

পুঁজিবাজারের এই বিশেষজ্ঞের মতে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রত্যক্ষ প্রভাবের কারণেই সংকট সৃষ্টি হয়েছে পুঁজিবাজারে। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক সচ্ছলতা, মুনাফা অর্জনসহ সবমিলিয়ে চাপের মুখে। কাঁচামালের সংকট, বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, লোডশেডিং, মুদ্রাস্ফীতি- সবমিলিয়ে খুব বেশি চাপের মুখে। এই চাপ যতক্ষণ না সরে ততক্ষণ কোম্পানিগুলো মুনাফায় ফিরবে না। এখন প্রয়োজন আস্থা ফেরানো। বাজার পড়ছে, আরও পড়তে পারে। তবে ঘুরে দাঁড়াবে, ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়বে- এটা নিশ্চিত। তবে টাইমিংটা অনির্দিষ্ট, ধৈর্য ধরতে হবে।

 

বাজার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এদিন ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২১ দশমিক ১৬ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৬৭৪ দশমিক ৮৭ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্য দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়া সূচক ৪.৫৪ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ১ হাজার ২৪৩ পয়েন্টে এবং ডিএসই-৩০ সূচক ১.৪৭ পয়েন্ট বেড়ে অবস্থান করছে ১ হাজার ৯৮৩ পয়েন্টে। এদিন ডিএসইতে আগের দিনের চেয়ে ৯৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বেড়ে ৫৭৪ কোটি ৯২ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। লেনদেনে অংশ নিয়েছে ৩৯৬টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে দর বেড়েছে ২২৪টির, কমেছে ১১২টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৬০টির।

 

এদিন দেশের অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রায় ৫ কোটি টাকা কমে ১১ কোটি ৪৫ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। লেনদেনে অংশ নিয়েছে ১৯৯টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে দর বেড়েছে ৯১টির, কমেছে ৮১টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২৭টি প্রতিষ্ঠানের।

 

সংকট উত্তরণে বিএসইসির জরুরি বৈঠক :

পুঁজিবাজারের চলমান সংকট কাটাতে সোমবার বিকেল ৩টায় মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছে বিএসইসি। রাজধানীর নিজস্ব কার্যালয়ে বিএসইসি কমিশনার ড. শেখ শামসুদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সংকট থেকে উত্তরণে প্রাথমিকভাবে তিনটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ডিলার একাউন্ট থেকে মার্কেটে সাপোর্ট দেওয়া, ব্যাংকের ট্রেজারি প্রধানদের সাথে বৈঠক করে বিনিয়োগ সক্রিয় করা এবং মিউচুয়াল ফান্ডকে শক্তিশালী করা। বৈঠকে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডিএসই ব্রোকারেজ এসোসিয়েশন (ডিবিএ), বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স এসোসিয়েশন (বিএমবিএ) এবং প্রধান ১০টি ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ নির্বাহী উপস্থিত ছিলেন।

পূর্বকোণ/এসএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট