চট্টগ্রাম সোমবার, ২২ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

‘ভাল প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার শিল্প’ আয়ত্ত করতে হবে যে কারণে

ওয়াহিদ জামান

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ | ৭:১০ পূর্বাহ্ণ

আমরা আজ এমন এক তথ্যপ্রবাহের যুগে বাস করছি, যেখানে তথ্য থাকেই একেবারে আমাদের নখদর্পণে বা হাতের মুঠোয়। তাৎক্ষণিকভাবে আমরা সোশ্যাল মিডিয়া (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, ইউটিউব ইত্যাদি), সংবাদ এবং কেবল চ্যানেল হতে ইন্টারনেটের বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিন ঘেঁটে সহজেই ‘তথ্যভাণ্ডারে’ প্রবেশ করতে পারি। বস্তুত, আমরা এখন তথ্য দিয়ে প্লাবিত!
যা হোক, এক্ষেত্রে বিরক্তিকর প্রশ্নটি হল- ‘আমরা কীভাবে জানতে পারব কোন তথ্যটি আমাকে বিশ্বাস করতে হবে? কিংবা সে ই-মেইলটিই বা আমি কীভাবে আমার আস্থায় নেব যেটি আমাকে ‘শিউর শট ট্যাক্স রিফান্ডের’ তথ্য দিচ্ছে? অথবা সে ‘ডিপ ফেইক’টিই বা আমি কীভাবে শনাক্ত করবো (সেটা হতে পারে পরিবারের কোন সদস্যের ফোনকলের মতো, অথবা পরিচিত কারও ছবি বা ভিডিও) যেটির মাধ্যমে কেউ আমার কাছে কিছু বিক্রি করতে চাইছে?
এ উভয় ক্ষেত্রেই একটি এআই এলগরিদম বাস্তবজীবনের ব্যক্তিটির পরিবর্তে তার রেকর্ডিং বা ছবি কিংবা ভিডিও তৈরি করেছে। এটা সত্যিই ভীতিকর এবং বিপজ্জনক!

আজকের দিনে ফোনকলে বা ভিডিও রেকর্ডিংয়ে কী বিশ্বাস করতে হয় তা আপনি-আমি কীভাবে জানব? আসুন আমরা একটু পিছিয়ে যাই এবং নিজেকে দুটি প্রশ্ন করি। এখানে কী ঘটছে এবং আমরা নিজেদের রক্ষা করার জন্য কী করতে পারি? আসুন ‘আমরা ঘন ঘন আমাদের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা এবং দায়িত্বশীল হিসেবে ই-মেইল পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার’ বাইরে যাই এবং এক্ষেত্রে আমাদের যা চিনতে হবে তার মূলে পৌঁছানো যাক। আমরা এমন একটি সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি যেখানে সঠিক প্রশ্নটি করা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ সঠিক উত্তর পাওয়া।
এখন এটি এমন কিছু যা একেবারেই নতুন নয়। একজন সিনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসেবে আমি বারবার বসেছি পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেনটেশন নিয়ে। ফেস করেছি কঠিন এমনসব বিভ্রান্তিমূলক শব্দ বা বাক্যের, যেগুলোর অর্থ উদ্ধারে মন হয়ে পড়ে ‘অসার’। শেষ পর্যন্ত আমি আবিষ্কার করলাম, এসবের বিভ্রান্তি কাটাতে এবং ডেটার নির্বাচনী উপস্থাপনা করতে আমি যা ব্যবহার করতে পারি তা হল ‘কঠিন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা’।
ব্যক্তিগত জীবনে আমাদের প্রায়ই ‘অপ্রমাণিত গুজব’ বনাম ‘যাচাইযোগ্য জ্ঞান’ নিয়ে কাজ করতে হয়। তথ্যপ্রবাহের এ সময়ে নতুন যে সমস্যাটির মুখোমুখি হচ্ছি আমরা তা হলো- যাচাইকৃত জ্ঞানের সুনির্দিষ্ট উৎস খুব কম এবং সেটা খুব দুর্লভও। তাই আমরা যা দেখছি বা শুনছি তা যাচাই করার সুযোগটাও থাকে খুব কম। মনে তাই প্রায়ই একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়- ‘আমার কী এটি বিশ্বাস করা উচিত?’ তাহলে কারও কোন কথা বা বক্তব্যের সত্য-মিথ্যা আমরা কীভাবে যাচাই করবো?

ভাল প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে (যা ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে সর্বোত্তম প্রতিরক্ষা) ব্যবহৃত কিছু শব্দ- এই যেমন, কে, কী, কেন, তাতে কী ইত্যাকার কিছু শব্দ নিয়ে কথা বলি। প্রথমত, আমরা স্বীকার করি যে মানুষ হিসেবে আমাদের সত্য ও বিশ^াসযোগ্য বিবৃতি গ্রহণ করার একটা প্রবণতা রয়েছে। যদিও এটি স্বাভাবিক যে, ভাল প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার জন্য একটি সংশয়হীন মানসিক অবস্থা থাকা অপরিহার্য। এর মানে এই নয় যে আপনি সবকিছুকে অবিশ্বাস করছেন, শুধু এই যে আপনি কিছু মেনে নেয়ার আগে ওই চারটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে চিন্তা করবেন।
‘কে’ প্রশ্নটি দিয়ে শুরু করা যাক। আপনি যে তথ্য পেয়েছেন তার উৎস সম্পর্কে নিজেকে প্রশ্ন করুন। আমরা হার্ট কন্ডিশনের জন্য ডেন্টিস্টের কাছে কিংবা কেক বেক করার জন্য নিশ্চয়ই একজন ছুতারের পরামর্শ গ্রহণ করব না। তাই আমরা কেন ইউটিউবে দেয়া যে কারও আত্মবিশ্বাসী বিবৃতি কোনরূপ পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই অন্ধভাবে মেনে নেব! সুতরাং, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রমাণপত্র পরীক্ষা করুন। এক্ষেত্রে গুগল অনুসন্ধান এবং উইকিপিডিয়া বেশ সহায়ক। একইভাবে, যদি কেউ আপনাকে একটি সন্দেহজনক ই-মেইল পাঠায় বা আপনার জন্য একটি ভয়েস মেইল রেখে যায়, আপনার অবিলম্বে বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য উৎসটি পরীক্ষা করা উচিত।
এরপর আসা যাক ‘কী’ প্রশ্নটায়। ‘তথ্য’ বা ‘সত্য’ নির্ভর যেকোন বিবৃতির প্রাসঙ্গিক ব্যাকআপ প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি অভ্যন্তরীণ রাজস্ব পরিষেবার পক্ষ থেকে দাবি করে বলে যে, ‘আপনি ট্যাক্স ফেরত পাচ্ছেন বা আপনার ট্যাক্স ফেরত দেয়া হচ্ছে; সেক্ষেত্রে প্রথমেই আপনার দেখা উচিত তাদের দাবির ভেতরে কোন অসঙ্গতি রয়েছে কিনা। তাদের গ্রাহকের সাথে যোগাযোগের প্রক্রিয়াটি ঠিক হচ্ছে কিনা। যা হোক, আমি জানি যে বেশিরভাগ দেশে ট্যাক্স পরিষেবা কেবল করের অর্থ প্রদানের জন্য ফোন বা ই-মেইল ব্যবহার করতে পারে না।
‘ডেটা’ এমন কিছু, যা তৈরি করা যেতে পারে, কিন্তু তাতে তথ্যের প্রসঙ্গ থাকতে হবে। আর জ্ঞান হল এমন তথ্য যার যথেষ্ট প্রসঙ্গ রয়েছে এবং তা আপনি বিশ্বাস করতে পারেন। সুতরাং, ‘কী’ প্রশ্নটি করুন নিজেকে বোঝাতে- যে বিবৃতিটি দেওয়া হচ্ছে তা বিশ্বাসযোগ্য। কোন বিবৃতিতে যদি দাবি করা হয় যে, ‘এ পণ্যটি অন্য সকলের থেকে উৎকৃষ্ট’, সেক্ষেত্রে এর উৎস থাকা উচিত এবং তা আপনি দ্রুত পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। যদি এটি চিকিৎসা বা ব্যবসায়িক মতামতের কোন বিবৃতি হয়, সেক্ষেত্রে, এর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে দ্রুত একাধিক উৎস পরীক্ষা করুন। আর নিজেকে সন্তুষ্ট করতে ইন্টারনেটের সহজ এবং দ্রুত অনুসন্ধান পদ্ধতি ব্যবহার করুন।

এরপরের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো ‘কেন’। এটি আপনাকে তথ্যের উৎস, উদ্দেশ্য এবং বিবৃতির প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কে সচেতনভাবে জানতে আগ্রহী করে তোলে। আমাদের সবাইকে স্বীকার করতে হবে যে নেতিবাচক ইমোশন (ভয়, রাগ এবং লোভ ইত্যাদি) কাজ করার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী প্রেরণা। বৃহৎ প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলো এটি জানে। এ কারণেই সোশ্যাল মিডিয়া এলগরিদমগুলো ‘হট টপিক’ পরিবেশন করে, যা প্রায় সবসময় গ্রাহকের ভয় বা রাগের শিকার হয়।
সুতরাং, যখন আপনি একটি ভিডিও, ই-মেইল বা কোন লেখার ব্যাপারে নিজের আগ্রহবোধ করেন, তখন একটু বিরতি নিন এবং নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, ‘প্রেরকের উদ্দেশ্য কী?’ বাস্তবতা হলো যখন আমরা সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ এবং সক্রিয় হতে চাই, তখন আমরা আমাদের গভীর আবেগগুলোকে একটু প্রশ্রয় দিতে পারি, হয়তো দেওয়া উচিতও। সুতরাং, যেকোন ব্যাপারে ‘আপ্লুত’ হয়ে পড়লে একটু বিরতি নিন। প্রিয়জনের আর্থিক বা শারীরিক সুস্থতার জন্য সম্ভাব্য হুমকি বলে মনে হলে তড়িৎ প্রতিক্রিয়া দেখান, তবে আগে নিজেকে একটু বিরতি দিন।

সর্বশেষ প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি হলো ‘তাতে কী’। নিজেকে প্রশ্ন করা চালিয়ে যান যতক্ষণ না আপনি কাক্সিক্ষত সন্তুষ্টি বোধ করেন। তথ্য বা বিবৃতির সাথে নিজস্ব বাস্তবতার মধ্যে একটি সরাসরি বা কিছুটা সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে না পারা পর্যন্ত নিজেকে প্রশ্ন করা চালিয়ে যান। মনে রাখবেন, প্রাসঙ্গিকতার অভাবকে একটি চ্যালেঞ্জহীন অনুমান হতে দেবেন না যা আপনাকে একজন বন্দী এবং অসহায় প্রাপক করে তোলে, পরিবর্তে গাড়ি চালান।
উপসংহারে মনে রাখবেন যে, ভাল প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা হলো ‘ডিসইনফরমেশনে’র বা মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করার সর্বোত্তম উপায় যেটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উদীয়মান ক্ষমতাগুলো ব্যবহার করার জন্য ভিত্তি প্রদান করে। আপনি কোনরূপ প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগে বিরতি দিয়ে নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন ‘কে, কি, কেন কিংবা তাতে কী’। এটা আপনাকে (ভুল) তথ্যের প্রবাহে সঠিক দিশা পেতে সাহায্য করতে পারে যার সম্মুখীন আমরা সবাই হই।

লেখক : সিইও, ডব্লিউএন্ডএ কনসাল্টিং, প্রাক্তন প্রধান কৌশলী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা হারশে (Hershey), ফার্মার ব্রাদার্স’র পরিচালনা পরিষদের সদস্য। এছাড়াও ‘ফরচুন ফাইভ হানড্রেড’ কোম্পানির বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে উদ্যোক্তাদের পরামর্শ আর সিনিয়র এক্সিকিউটিভদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট