চট্টগ্রাম সোমবার, ১৫ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

প্রসঙ্গ রবীন্দ্রনাথ

সাজিদুল হক

৯ মে, ২০২৩ | ২:০৭ অপরাহ্ণ

পঁচিশে বৈশাখ এলে অনেকেই ধর্মাশ্রয়ী হয়ে রবীন্দ্রনাথকে ব্যক্তি হিসেবে এবং তার সাহিত্যের মূল্যায়ন করে। তাদের প্রশ্ন, বিশাল রবীন্দ্র সাহিত্যে মুসলিম জনগোষ্ঠী নেই কেন?

আমাদের ভাষা আন্দোলনে এখানকার বাঙালি জনগোষ্ঠী নিজের রাষ্ট্রিক পরিচয় খুঁজতে গেলে পাকিস্তানি পরিচয়ে গর্বিত হওয়ার পরিবর্তে নিজেদের বাঙালি বলতেই বেশি স্বস্তিবোধ করেছেন। বাঙালির আত্মপরিচয়ের জায়গাটা ছিলো মাতৃভাষা, হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক যাপিত জীবন। সেই যাপিত জীবনের ভিত্তিতে নির্মিত হয়েছে বাঙালির শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মনন। বৃহত্তর বাঙালির সে মননের কোথাও এ বিষয়টি ছিলো না যে, রবীন্দ্রনাথ কোন ধর্মের? অবশ্য তখনও প্রশ্ন করেছে, আজও বহাল আছে, বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে। তার সাহিত্যমূল্য নিয়ে কোনো কথা না থাকলেও, বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য অনেক বেশি সাম্প্রদায়িক এ অভিযোগ আজও আছে। যেমনটি অনেক মুসলমান সাহিত্যিকের বেলায় আছে।

ঐতিহাসিক বাস্তবতা এবং সত্যি হলো, দ্বিজাতি তত্ত্বকে অস্বীকারের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্ভব। এর রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং লড়াইয়ের দীর্ঘ সময়কালে যুক্ত ছিলো বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও গণতান্ত্রিক চিন্তা। যুক্ত ছিলো সমন্বিত জীবনবোধে গড়ে ওঠা মানুষের আকাঙ্ক্ষা। যে আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শক্তি শেষ পর্যন্ত দাঁড়াতে পারেনি। যে কারণে বাংলা ভাষা হিন্দু ভাষা, রবীন্দ্রনাথ মুসলিম নন, সেই বিবেচনায় তিনিও অগ্রহণযোগ্য, এসব টিকলো না। এখানে উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদকে সমর্থন করেছেন বৃটিশ শাসন কাঠামোর মধ্যেই। সেখানে ভারতীয় ব্যাপারটিও তার চিন্তার অন্তর্ভুক্ত ছিলো। বিপরীত দিক থেকে যদি ভাবি, বঙ্গবন্ধুর বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিলো বাঙালি জনগোষ্ঠীর জন্য একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অন্যতম উপাদান। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র সময়ের ব্যবধানটুকু ছাড়া চিন্তাটা পরস্পরের পরিপূরক। যে জন্য বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ে বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্রনাথকে তার রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনিবার্য প্রাসঙ্গিকতায় রেখেছেন। বিপুল রক্তক্ষয়ের পর বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সারা বিশ্বে মর্যাদা পেলো এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার রবীন্দ্রনাথের গানকেই আমাদের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

তাহলে এখানে বিরোধ কোথায়?

আসলে আমরা যতটা না ধার্মিক অর্থাৎ সাতচল্লিশের আগে এবং আজও এই উপমহাদেশে আমাদের জনগণকে যারা নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন, তাদের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে বরাবরই দ্বিজাতি তত্ত্ব ছিলো, আজও চলমান। স্বাধীন বাংলাদেশে সাময়িক ভাবে মুক্তিযুদ্ধের পরে সাম্প্রদায়িক সেই সর্পদংশন স্থগিত ছিলো, মানুষের আবেগ এবং অতি উচ্ছ্বাসের কারণে। বেশিদিন থাকলো না বাঙালির সে আবেগ। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রকে সম্পূর্ণ নতুন করে গড়ে তুলতে গিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু দেখলেন, শুধুমাত্র অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলেই নতুন এই জাতিরাষ্ট্রের বিনির্মাণ সম্ভব হবে না। নতুনভাবে জাতীয় মূল্যবোধের জাগরণের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে সামনে আসে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ঐক্যবদ্ধ জাতিকে বিভ্রান্ত করার জন্য বিভাজনের রাজনীতি শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে। সেখানে কেবল অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃত্ব, পরাজিত এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তিকেও তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। সেই পটভূমিতে তিনি বাংলাদেশি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে বাকশাল কর্মসূচির আওতায় একটি প্লাটফর্মে নিয়ে আসলেন। র্কিন্তু নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো, রক্তাক্ত পঁচাত্তরের পটভূমি বাংলাদেশের সকল সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দেয়। যে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বিনির্মাণ সম্ভব ছিলো বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে, তাকে হত্যার মধ্যদিয়ে রাষ্ট্র তার বিপরীত দিকে চলতে শুরু করে। সেই পাকিস্তানি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যার প্রধান অনুষঙ্গ ধর্ম। যে রাজনীতির কাছে নিরন্তর লড়াই করে ক্লান্ত আওয়ামী লীগ অসহায় ভাবে আত্মসমর্পণ করে। যেখানে বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথ এবং হাজার বছরের লোকায়ত সমন্বিত সংস্কৃতি আজ প্রশ্নবিদ্ধ।

বঙ্গবন্ধুর পরিচয় ভীষণ ভাবে বিতর্কিত করা হচ্ছে শুধু কী রাজনৈতিক ক্ষমতার স্বার্থে? এটাই সত্য বঙ্গবন্ধু চিরকালের বাঙালি ছিলেন, তিনি মুসলমান ছিলেন। সবার উপরে ছিলেন তিনি মানুষ। তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ে আজ অনেক সত্য জানতে পারি আমরা।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রশ্ন আগেও ছিলো। ধর্মীয় রাজনীতির দিক থেকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পরবর্তী পরাজিত প্রতিক্রিয়াশীলদের শাসন ক্ষমতা দীর্ঘদিন যে ধর্মান্ধতার সংস্কৃতি তৈরি করেছে, সেই সময়ের প্রতিবেশে কয়েকটি প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকে নতুন এক কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাচ্ছে।

নানা প্রান্ত থেকে এরা রবীন্দ্রনাথকে পাঠ করছেন, অনুশীলন করছেন। এদের প্রশ্নকে শুধু সাম্প্রদায়িক মনোভাব না ভেবে, এদের বিভ্রমের বিরুদ্ধে প্রতিপাঠ নিয়ে যেতে হবে তাদের কাছে। আমাদের নতুন পাঠ নিয়ে যেতে হবে এইসব প্রজন্মের কাছে, অনিবার্য প্রাসঙ্গিক রবীন্দ্রনাথকে ধারণ করেই আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা ছিনিয়ে এনেছি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে।

রবীন্দ্রনাথ কেবলই আবেগি বাঙালির মুখে উচ্চারিত একটি নাম?

পঁচিশে বৈশাখের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মিডিয়া এবং রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞরা ঠাকুরের বিশালতা সম্পর্কে অনেক কাহিনি বলে পুস্তক লিখে ফেলেন। ছবিতে পুস্পমাল্য প্রদান ও প্রণামে ভারি করে তোলেন আশপাশ। এ যাবৎ এটাই আমাদের ধারাবাহিক ভাষ্য কবি এবং মানুষ রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে।
সাথে এ-ও বলা হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ আজও অপরিহার্য।

কিন্তু কেন?

রবীন্দ্রনাথ যে অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিত্বের আদর্শকে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন, আমরা তা কতটা কায়মনোবাক্যে ধারণ করতে পেরেছি? এক্ষেত্রে বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনিবার্য সঙ্কোচ যতটা দৃশ্যমান, তা কি শুধু ধর্মীয় অনুশাসন বিধিবিধানের কারণে? আধুনিকতা, বিজ্ঞান, দর্শন এবং চিন্তার সীমাবদ্ধতাও যে এখানে একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, তা আমাদের নজর এড়িয়ে যায়।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বিশ্ব নাগরিক।
একজন মানবতাবাদী মানুষ।
আমরা বাঙালিরা কী মনে প্রাণে অসাম্প্রদায়িক?
ধর্মীয় অনুশাসন সম্পূর্ণ বাঙালি হতে কী আমাদের বাধা দেয় না?

কবিগুরু প্রাচ্য এবং প্রাশ্চাত্যের যেভাবে সেতুবন্ধন রচিত করেছিলেন ‘দেবে আর নেবে’ এই মিলনের সংগীতের মাধ্যমে সেই ঐতিহাসিক জিজ্ঞাসার সত্যিটা আমরা অনেকেই হারিয়ে ফেলেছি।

পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের ক্ষেত্রেও কি এই একই দুর্নাম প্রযোজ্য? ভারতের একটি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের জনগণের মুখের ভাষাও বাংলা। কিন্তু অখণ্ড ভারতের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতিতে হিন্দির আধিপত্যের কারণে বাঙালির জীবন যাপনে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির গুরুত্ব কতটুকু আছে আজকের শাসনতান্ত্রিক বাস্তবতায়। এখানে কেন্দ্রীয় সরকারের এককেন্দ্রিক ক্ষমতা চর্চায় একটি রাজ্য সরকারের ভাষার প্রভাব কতটুকু? গভীরভাবে ভাববার বিষয় এটি। উপরোক্ত বক্তব্যের আলোকেই রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও দর্শন আজকের পশ্চিম বঙ্গ তথা ভারতীয় বাঙালির জীবনে প্রভাব ফেলতে কতখানি সক্ষম, এই আওয়াজও তুলতে হবে জোরেসোরে। সেখানে রবীন্দ্রনাথ কতটা আলো ছড়িয়ে দিতে পারছেন? যেখানে বাংলা ভাষার চর্চা স্বাধীন বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রে আজ প্রশ্নবিদ্ধ, পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের মতো প্রদেশের অবস্থা কতটা হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। বাংলা ভাষার গবেষণা ও চর্চার যে সঙ্গীন অবস্থা আজকে, সেখানে রবীন্দ্রনাথ কতটা প্রাসঙ্গিক? অনিবার্যই বা কতটুকু? রবীন্দ্রনাথ শুধুই গবেষণার বিষয় হয়ে থাকবে বাঙালির রাষ্ট্রে? রবীন্দ্রনাথের একশত তেষট্টিতম জন্মবার্ষিকী পালনের মাধ্যমে আমরা বিপুল রবীন্দ্রনাথকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করতে পেরেছি? দীর্ঘ সময়কাল বিবেচনাটুকু ছাড়া রবীন্দ্র দর্শন কতটা আলো ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে? প্রতিনিয়ত বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথের অনুপস্থিতি আমাদের রাষ্ট্র ও তার জনগণের যাপনের সংস্কৃতিতে চোখেই পড়ে না! নতুন প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথ মানে শুধুমাত্র তার কিছু জনপ্রিয় গান জনপ্রিয় কজন শিল্পীর কণ্ঠে। বৃহত্তর পাঠকের কাছে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য তথা তার গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, বিজ্ঞান বিষয়ে ভাবনা, চিত্রকর রবীন্দ্রনাথ অজ্ঞাতই থেকে যাচ্ছে। এখানে ব্যক্তি, পরিবার এবং রাষ্ট্র হিসেবে সকলেই রবীন্দ্রনাথের কাছে আমরা অপরাধী। বাঙালির পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মতোই রবীন্দ্রনাথও আজ আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ। রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ ভাবনা, তার সাহিত্য ও সংস্কৃতির দর্শন, কৃষি এবং অর্থনীতি নিয়ে তার চিন্তাকে জনগণের মাঝে কি নিয়ে যেতে হবে না?

মহান ভাষা সংগ্রামের মধ্যদিয়ে যে সাংস্কৃতিক উপনিবেশকে প্রত্যাখ্যান করেছে এ দেশের বাঙালিরা, তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে বাংলা ভাষার অবস্থান প্রকৃত অবস্থান কোথায় এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারলেই অনেক প্রশ্নের জবাব মিলতে পারে।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

 

 

পূর্বকোণ/এসি

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট