
আধুনিক যুদ্ধের একটি অদ্ভুত বাস্তবতা আছে। আজকের প্রযুক্তির যুগে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে শত্রু রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাকে লক্ষ্যবস্তু করা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব নয়। কিন্তু তবু দেখা যায়— কখনো সেই ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়, আবার কখনো তা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহার করা হয় না। এই বৈপরীত্যই আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে; যদি নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়, তবে কেন সব যুদ্ধে তা করা হয় না?
২০২২ সালে রাশিয়ার আক্রমণের পর চার বছরের বেশি সময় ধরে ইউক্রেনে যুদ্ধ চলছে। তীব্র সামরিক সংঘর্ষ, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও ড্রোন আক্রমণের মধ্যেও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এখনও জীবিত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দ্রুত আঘাত হেনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। সামরিক কৌশলের ভাষায় এই ধরনের অভিযানকে বলা হয় ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’— অর্থাৎ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিয়ে প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামোকে দুর্বল করার চেষ্টা।
এই দুই ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, আধুনিক যুদ্ধে নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা কেবল সামরিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি মূলত রাজনৈতিক হিসাবের বিষয়।
যুদ্ধের উদ্দেশ্যই কৌশল নির্ধারণ করে
রাশিয়ার-ইউক্রেন যুদ্ধ মূলত ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ভারসাম্যের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। প্রেসিডেন্ট পুতিনের দৃষ্টিতে এটি ন্যাটো সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপটে একটি কৌশলগত প্রতিরোধ। ক্রিমিয়া ও ডনবাস অঞ্চলের ভবিষ্যৎও এই সংঘাতের কেন্দ্রে। এই পরিস্থিতিতে যদি রাশিয়া সরাসরি জেলেনস্কিকে হত্যা করত, তাহলে তা সামরিকভাবে লাভজনক হওয়ার বদলে রাজনৈতিকভাবে বিপর্যয়কর হতে পারত। একজন নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করা মানেই তাকে মুহূর্তের মধ্যে প্রতিরোধের প্রতীক বানিয়ে দেওয়া। ফলে ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ ঐক্য আরও শক্তিশালী হতে পারত এবং পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন আরও দৃঢ় হয়ে উঠত। অর্থাৎ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অনেক সময় প্রতিপক্ষকে দুর্বল না করে বরং আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশল প্রায়ই ভিন্ন। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিপক্ষের সামরিক ও আদর্শিক নেটওয়ার্ক দুর্বল করার জন্য নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করার নজির রয়েছে।
ইতিহাসের নজির
ইতিহাসে নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে আঘাত করার বহু উদাহরণ রয়েছে।২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের শুরুতেই ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেনকে হত্যার উদ্দেশ্যে একাধিক ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’ চালায়। যদিও প্রথমদিকে তা সফল হয়নি, শেষ পর্যন্ত তিনি গ্রেপ্তার এবং ক্ষমতাচ্যুত হন।
২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন বাহিনী অভিযান চালিয়ে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে। এটি দেখায় যে প্রতীকী নেতৃত্বকেও অনেক সময় কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেখা হয়।
২০২০ সালে বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন ইরানের প্রভাবশালী সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল।
এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও নাৎসি জার্মানির নেতা এডলফ হিটলারকে হত্যার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল, যদিও মিত্রশক্তি সরাসরি সে পথে যায়নি। এই উদাহরণগুলো দেখায় যে নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করার সিদ্ধান্ত মূলত রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক হিসাবের সমন্বয়।
‘ডিক্যাপিটেশন’ কৌশলের সীমাবদ্ধতা
নেতৃত্বকে সরিয়ে দিলে সংঘাত শেষ হয়ে যাবে—এমন ধারণা ইতিহাসে বহুবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পরও জিহাদি নেটওয়ার্ক বিলুপ্ত হয়নি। কাসেম সোলেইমানির মৃত্যুর পরও ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব পুরোপুরি থেমে যায়নি। অর্থাৎ নেতৃত্বের মৃত্যু অনেক সময় সংঘাতের রূপ বদলায়, কিন্তু তার মূল কারণ দূর করে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রতিশোধের রাজনীতি, আঞ্চলিক অস্থিরতা কিংবা ক্ষমতার নতুন দ্বন্দ্ব তৈরি করে। জেলেনস্কি ও খামেনির ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলে আধুনিক যুদ্ধের একটি গভীর বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আজকের যুদ্ধ কেবল ট্যাংক, মিসাইল বা ড্রোনের যুদ্ধ নয়। এটি একই সঙ্গে প্রতীক, বার্তা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার হিসাবের যুদ্ধ। কখনো কোনো নেতাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয় কারণ তার অনুপস্থিতি প্রতিপক্ষকে দুর্বল করবে বলে মনে করা হয়। আবার কখনো তাকে স্পর্শ করা হয় না, কারণ তার মৃত্যু প্রতিপক্ষকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
অতএব আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি সম্ভবত এই— শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো শুধু যে আঘাত হানে তা দিয়েই নয়, বরং যে আঘাতটি তারা ইচ্ছাকৃতভাবে হানে না, সেই সিদ্ধান্ত দিয়েও ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করে। আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—ক্ষমতার প্রকৃত প্রকাশ অনেক সময় সেই আঘাতে নয় যা হানা হয়, বরং সেই আঘাতে যা হানার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও হানা হয় না।