চট্টগ্রাম রবিবার, ১৯ মে, ২০২৪

বাজারে সয়াবিন তেলের সংকট, যা বলছে সরকার

অনলাইন ডেস্ক

৭ মার্চ, ২০২২ | ১১:২৮ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশে সরকার বলছে, ভোজ্যতেলের কোন ঘাটতি না থাকলেও ডিলারদের কারসাজিতে বাজারে সয়াবিন তেলের ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরি হয়েছে।

তেলের দাম বাড়বে- এই আশায় মজুদ করে রাখছেন অনেক ব্যবসায়ী, আর মজুদ করে রাখা ঠেকাতে গত কয়েকদিন ধরেই ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালাচ্ছে সরকারি সংস্থা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

রবিবারও পুরনো ঢাকার মৌলভীবাজারে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে কয়েকজন ব্যবসায়ীকে।

 

কৃত্রিম সংকট
সপ্তাহখানেক যাবত পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না এমন অভিযোগ উঠেছে।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, মার্চ মাসের প্রথমদিন থেকেই ডিলারদের কাছ থেকে তারা তেল পাচ্ছেন না। ঢাকার বনানীর একজন খুচরা বিক্রেতা বলছিলেন, আবার কখনো পেলেও ডিলাররা বাড়তি দাম চাইছে তাদের কাছে।

তিনি বলেন, “কোম্পানি থেকে সাপ্লাই দিচ্ছে না। ওরা বলছে তেল নাই। ওরা বলছে তেলের রেট ১২ টাকা করে বাড়বে, কিন্তু নতুন করে তেল দিচ্ছে না। ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখের পর থেকে আর নতুন তেল আনতে পারি নাই।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই বিক্রেতা আরো বলেছেন, “কেউ কেউ বলছে, পাঁচ লিটার বোতল ৭৯০ টাকায় নিতে হবে। কিন্তু ৭৯০ টাকায় আনার পর ৭৯৫ টাকায় বেঁচতে হবে, এত সীমিত লাভে কোন দোকানদার আনতে চায় না মাল? এজন্য তেল নাই দোকানে।”

তিনি বলছিলেন, তার এলাকার কোন দোকানিই এ মাসে নতুন তেল আনতে পারেননি। গত মাসে আনা তেল, বিশেষ করে এক লিটার এবং তিন লিটারের বোতল বেঁচতে হচ্ছে তাদের।

 

সরকার কী বলছে?
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় স্বীকার করছে, চাহিদার তুলনায় দোকানে সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বলছে, সয়াবিন মিলার, আমদানিকারক কোম্পানি এবং পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা মিলে তেল মজুদ করে রাখার কারণেই মূলত খুচরা পর্যায়ে তেলের কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে, ফলে দেশেও বাড়বে এই আশায় অনেক ব্যবসায়ী তেল বাজারে ছাড়ছেন না।

সে কারণেই এই কৃত্রিম সংকট, আর সেটি ঠেকাতে তারা অভিযান শুরু করেছেন।

তিনি বলেন, “আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানিয়েছি যে, আন্তর্জাতিক বাজারে যে দাম বেড়েছে বা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এসবের জন্য দাম বাড়লে তার প্রভাব দেশের বাজারে আরো দুইমাস পরে পড়বে। কিন্তু এখন তেল নিয়ে বাড়াবাড়ি হচ্ছে। তেল নিয়ে তেলেসমাতি হচ্ছে। এজন্য এটা (অভিযান) আমরা কন্টিনিউ করবো।”

গত কয়েকদিনে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করে দেয়া হয়েছে এবং জরিমানা করা হয়েছে, এবং মজুদদারি বন্ধে এখন থেকে এ ধরনের অভিযান চলতে থাকবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

মি. সফিকুজ্জামান বলেছেন, “এখানে পণ্যের কোন ঘাটতি নেই। ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে এটা ম্যানিপুলেট করা হচ্ছে। অর্থাৎ সাপ্লাই চেইনে তারা কিছুটা কনজারভেটিভ হয়ে গেছে যে তারা সাপ্লাইটা ঠিকভাবে দিচ্ছে না। তাতে বাজারে চাহিদা ও সরবারহের ক্ষেত্রে একটা আর্টিফিশিয়াল ক্রাইসিস তৈরি হচ্ছে।”

এবং যারা এটা করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

এছাড়াও সোমবারের মধ্যে ব্যবসায়ীদের কাছে তেলের আমদানি, বিক্রি ও মজুদের তথ্য চেয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

এই মূহুর্তে সরকারের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ মূল্য ১৬৮ টাকা, পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৭৯৫ টাকা। আর খোলা সয়াবিন লিটার প্রতি ১৪৩ টাকা।

এই দাম ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে নির্ধারণ করা হয়েছে।

এরপরেও তেলের মিলার এবং ডিলাররা সয়াবিনের দাম লিটার প্রতি ১২ টাকা বৃদ্ধির দাবি তুলেছে। কিন্তু আসন্ন রমজান মাসকে সামনে রেখে সরকার সে প্রস্তাবে সায় দেয়নি।

কিন্তু তারপর থেকেই হঠাৎ করে বাজারে তেলের সরবারহ কমে গেছে।

সরকারের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে সয়াবিন রিফাইনারি এবং মিলারদের কোন বক্তব্য দেখা যায়নি। তাদের সঙ্গে কয়েকদফা যোগাযোগ করেও তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

গ্রাহকেরা বিরক্ত-অসন্তুষ্ট
সরকার বলছে, দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা ২০ লাখ টন।

সাধারণত ভোজ্যতেলের মধ্যে সয়াবিন, সরিষা, পাম, সূর্যমুখী, রাইস ব্র্যানসহ বাজারে নানাবিধ তেল পাওয়া গেলেও সবচেয়ে জনপ্রিয় সয়াবিন তেল। এর মূল কারণ- এটি সহজলভ্য এবং দামে সাশ্রয়ী।

কিন্তু সেই সয়াবিনও এখন কম আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

ঢাকার আজিমপুরের বাসিন্দা সর্বানী রায় বলছেন, দৈনন্দিন খাবারের সাথে আপ্যায়নের রান্নাবান্নায়ও তেলের ব্যবহার চলে।

“নিজেদের রান্নায় সাশ্রয়ের কথা ভাবলেও, প্রতি সপ্তাহে বা মাসে কয়েকদিন করে আত্মীয়-বন্ধুও আসে, কাজেই চাইলেই তেলের ব্যবহার কমিয়ে ফেলা যাচ্ছে না। ফলে খরচও কমছে না।”

তিনি বলছিলেন, মাসের সংসার-খরচ কমাতে এখন অন্য ব্যয় কমাতে হচ্ছে তাকে।

ঢাকার মিরপুরের স্কুল শিক্ষক সানজানা হক নিধি অভিযোগ করছেন, তেলের দামের সাথে সাথে বাজারের অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও ক্রমেই বাড়ছে।

তিনি মনে করেন, এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে কেবল নিম্ন আয়ের মানুষ নয়, তাদের মত মধ্যবিত্তদেরও রীতিমত হিমসিম খেতে হচ্ছে।

এদিকে, রবিবার দেশের বাজারে সয়াবিন তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়েছে। খবর বিবিসি বাংলার।

 

পূর্বকোণ/মামুন/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট