
চট্টগ্রামে কিডনি রোগ ক্রমেই উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। পর্যবেক্ষণের প্রেক্ষিতে চিকিৎসকগণ বলছেন, কিডনি যখন প্রায় বিকল হয়ে যায় অধিকাংশ রোগীই ঠিক সেই মুহুূর্তে হাসপাতালে আসেন। তখন তাকে ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। সাধারণ চিকিৎসায় আর কিছু করা সম্ভব হয় না।
চট্টগ্রামের প্রধান সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া কিডনি রোগীদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ রোগীই শেষ পর্যায়ে চিকিৎসা নিতে আসেন। গবেষণায় অংশ নেওয়া রোগীদের গড় বয়স ছিল প্রায় ৪৯ বছর। অধিকাংশ রোগীরই দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ ছিল, কিন্তু নিয়মিত চিকিৎসা বা পরীক্ষা না করার কারণে কিডনির ক্ষতি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, প্রতিদিনই নতুন কিডনি রোগী আসছেন। তাদের একটি বড় অংশের কিডনি ইতোমধ্যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। ফলে চিকিৎসার শুরুতেই অনেককে ডায়ালাইসিসে যেতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুরুতেই রোগ শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৬ থেকে ১৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতি বছর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার নতুন রোগীর কিডনি বিকল অবস্থায় চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। চট্টগ্রামেও এই প্রবণতা বাড়ছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
এদিকে, চট্টগ্রামের সরকারি হাসপাতালগুলোতে কিডনি রোগীর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়ালাইসিস সেন্টারগুলোতেও রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার ডায়ালাইসিস নিতে হয় এমন রোগীর সংখ্যাও কম নয়। এতে রোগী ও তাদের পরিবারের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৩ থেকে ৪ কোটি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতি বছর অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ হাজার নতুন রোগী কিডনি বিকল অবস্থায় চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। কিন্তু ডায়ালাইসিস ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধা সীমিত হওয়ায় অনেক রোগী নিয়মিত চিকিৎসা পান না।
চিকিৎসকদের মতে, কিডনি রোগ দেরিতে ধরা পড়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করা। বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের অনেকেই দীর্ঘদিন পরীক্ষা করান না। অথচ এই দুই রোগই কিডনি বিকলের প্রধান কারণ হিসেবে পরিচিত। এছাড়া গ্রামীণ ও উপশহর এলাকায় কিডনি রোগের প্রাথমিক স্ক্রিনিং সুবিধা প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে রোগীরা শুরুতে সমস্যাটি বুঝতে পারেন না। শরীরে পানি জমা, দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে তখনই তারা হাসপাতালে আসেন। কিন্তু ততদিনে কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কিডনি রোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. নুরুল হুদা বলেন, চট্টগ্রামে কিডনি রোগের প্রকৃত চিত্র জানতে আরও সমন্বিত গবেষণা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে কিডনি রোগের স্ক্রিনিং কার্যক্রম বাড়ানো গেলে অনেক রোগী প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত হতে পারে এবং ডায়ালাইসিস নির্ভরতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, কিডনি রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা। বিশেষ করে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের বছরে অন্তত একবার কিডনি পরীক্ষা করা জরুরি। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান, লবণ কম খাওয়া, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে কিডনি রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
বিশ্ব কিডনি দিবস আজ: আজ বিশ্ব কিডনি দিবস। প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী কিডনি রোগ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার বিশ্ব কিডনি দিবস পালিত হয়ে থাকে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ কিডনি সকলের তরে, কিডনি যত্নে বাঁচাও ধরনীরে’। দিবস উপলক্ষ্যে চমেক হাসপাতাল, সিভিল সার্জন কার্যালয় ও চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া কিডনি ফাউন্ডেশন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে পালন করা হচ্ছে বিভিন্ন কর্মসূচি।
পূর্বকোণ/ইবনুর