চট্টগ্রাম রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

সর্বশেষ:

ভোটের লড়াই শেষে ‘সৌজন্যের জয়’

ভোটের লড়াই শেষে ‘সৌজন্যের জয়’

তাসনীম হাসান

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ৩:৩৪ অপরাহ্ণ

গাড়ি থামতেই কৌতূহলী চোখগুলো ঘুরে গেল সেদিকে। দরজা খুলে নেমে এলেন জয়ী প্রার্থী। হাতে ফুলের তোড়া, মিষ্টির প্যাকেট। সোজা এগিয়ে গেলেন পরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে। প্রথমে ফুল তুলে দিলেন, তারপর দৃঢ় এক আলিঙ্গন। মুহূর্তেই করতালিতে ভরে উঠল চারপাশ। প্রতিযোগিতার উত্তাপ গলে গেলো একরাশ হাসিতে। এরপর একে অপরের হাত ধরে বাড়ির ভেতর ঢোকা-মিষ্টিমুখ, কুশল বিনিময় আর একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার। ভোটের লড়াই শেষে এ যেন অন্য এক দৃশ্য-হারজিত পেরিয়ে সৌজন্য আর মানবিকতার অনাড়ম্বর উদ্যাপন।

 

চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসনে বিজয়ী বিএনপি প্রার্থী নুরুল আমিন ও বিজিত জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট ছাইফুর রহমানের মধ্যে সৌহার্দ্যের এই দৃশ্য শুধু একটি আসনের গল্প নয়। চট্টগ্রামের একাধিক আসনে ফল ঘোষণার পর দেখা গেছে একই ছবি-কোথাও ফুল, কোথাও মিষ্টি, কোথাও সামাজিক মাধ্যমে অভিনন্দন বার্তা।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলেছেন, সাধারণত নির্বাচন-পরবর্তী সময় মানেই উত্তেজনা, শঙ্কা আর সংঘাতের দৃশ্য। সেখানে বিজয়ী প্রার্থীর পরাজিতের ঘরে গিয়ে শুভেচ্ছা জানানো রাজনীতির আঙিনায় নতুন বার্তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রার্থীদের এই বার্তা দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে নতুন দেশ গড়ার যে আকাক্সক্ষা, সেটি পূর্ণতা পাবে।

 

কেউ ফুল-মিষ্টি নিয়ে, কেউ

শুভেচ্ছা জানালেন ফেসবুকে:

 

চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী-বাকলিয়া) আসনে বিএনপির বিজয়ী প্রার্থী আবু সুফিয়ান পরাজিত জামায়াত প্রার্থী ডা. একেএম ফজলুল হকের কার্যালয়ে গিয়ে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। পরে তিনি ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী ওয়াহেদ মুরাদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিজয়ী বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরী তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী আনোয়ার ছিদ্দিকীর বাসায় হাজির হন মিষ্টি নিয়ে। দুজন একে অপরকে মিষ্টি খাইয়ে দেন-ক্যামেরাবন্দী হয় এক অন্যরকম মুহূর্ত। চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে জয়ী জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ জহিরুল ইসলাম তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পার বাসায় গিয়ে ফুলের মালা পরিয়ে দেন। চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনে জয়ী হওয়া বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ পরাজিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ডা. মো. আবু নাছেরের বাসায় গিয়ে কাঁধে হাত রাখেন, মিষ্টিমুখ করান।  চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে বিজয়ী বিএনপির প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফে গিয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ সাইফুদ্দীন আহমদ মাইজভাণ্ডারীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনেও একই দৃশ্য-হেরে যাওয়া বিএনপির প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমিনের হাতে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান জয়ী হওয়া জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী।

 

কেউ কেউ আবার জয়ী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-খুলশি-ডবলমুরিং) আসনে হেরে যাওয়া জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী ভিডিও বার্তায় বিএনপির সাঈদ আল নোমানকে অভিনন্দন জানান। চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে বিএনপির প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর জয়ের খবর বের হতেই ফেসবুকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ শফিউল আলম।

 

একসঙ্গে কাজ করার বার্তা:

মীরসরাইয়ে নুরুল আমিন মিষ্টি নিয়ে বাসায় আসার প্রতিক্রিয়ায় ছাইফুর রহমান বলেন, ‘নুরুল আমিন ভাই আমার বাড়িতে আসায় আমি খুব আনন্দিত। আমরা চাই মিলেমিশে একটি আলোকিত মীরসরাই গড়ে তুলতে।’ আর নুরুল আমিন বললেন, ‘নির্বাচন একটি প্রীতি ম্যাচের মতো। আমরা দীর্ঘদিন একসঙ্গে রাজনীতি করেছি। পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি সুন্দর মীরসরাই গড়ে তুলতে চাই।’

 

সীতাকুণ্ডে সাক্ষাতের সময় আসলাম চৌধুরী ও আনোয়ার ছিদ্দিক চৌধুরী দুজনেই গত ১৭ বছর ধরে ‘ফ্যাসিবাদী সময়ে’ কাটানো দুঃসহ সময়ের স্মৃতিচারণ করেন। জামায়াত প্রার্থী আনোয়ার ছিদ্দিক চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের জন্য জয় পরাজয় বড় কোন ব্যাপার না। এটা নির্বাচনের দিন চলে গেছে। আমরা বড় ভাই-ছোট ভাই। একসঙ্গে সীতাকুণ্ডের মানুষের জন্য কাজ করব।’ বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীও তার বক্তব্যের সঙ্গে সহমত জানিয়ে বলেন, ‘নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ। এলাকার উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির প্রশ্নে ভেদাভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আনোয়ার ছিদ্দিককে সঙ্গে নিয়ে কাজ করবো।’ অন্যদিকে এরশাদ উল্লাহ ও ডা. মো আবু নাছের উভয়েই বোয়ালখালীর মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত কালুরঘাট সেতুর দ্রুত বাস্তবায়ন, যুবসমাজের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং এলাকার সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করার আশ্বাস দেন।

 

আবু সুফিয়ান ও ডা. একেএম ফজলুল হকের বার্তাও একই-‘রাজনীতি ও ভোটের মাাঠে প্রতিদ্বন্দ্বীতা ও প্রতিযোগিতা থাকবে। দিনশেষে সবাইকে নিয়ে আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।’

 

জয়ী ও পরাজিত প্রার্থীদের মধ্যে এমন সৌজন্যতার আঁচ ছড়িয়েছে নেতাকর্মীদের মধ্যেও। দেশের বিভিন্ন স্থানে খণ্ড খণ্ড উত্তেজনার খবর থাকলেও বার আউলিয়ার পূণ্যভূমিখ্যাত চট্টগ্রাম এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। নির্বাচনের পর বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর নেই। বরং আছে করমর্দন, আলিঙ্গন আর মিষ্টিমুখের সুন্দর মুহূর্ত।

 

এই চিত্র দেখে অনেকেই বলছেন, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি দীর্ঘস্থায়ী। যদি এই সৌজন্য টিকে থাকে, যদি মতভেদের ভেতরেও মানবিকতা বেঁচে থাকে, তবেই জুলাইয়ের রক্তে লেখা স্বপ্নের প্রতি জানানো হবে প্রকৃত শ্রদ্ধা।

 

পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট