চট্টগ্রাম রবিবার, ২১ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

ব্লাডক্যান্সার চিকিৎসা: চট্টগ্রাম প্রেক্ষাপট

অধ্যাপক (ডা.) মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী

৬ জুলাই, ২০২৪ | ২:১৫ অপরাহ্ণ

ব্লাড ক্যান্সার বা রক্তের ক্যান্সার কি? আমাদের শরীরে হাড়ের গভীরে (প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রধানত কশেরুকা ও নিতম্বের হাড়ের দুই প্রান্তে) থাকা বোন ম্যারো বা অস্থিমজ্জা নামক জেলিসদৃশ দানাকৃতির অংশ হতে রক্তের কোষ কনিকা তথা লোহিতকনিকা, শ্বেতকনিকা ও অনুচক্রিকা তৈরী হয়। লোহিতকনিকা, শ্বেতকনিকা ও অনুচক্রিকা শরীরের প্রত্যেক অঙ্গের কোষকলায় যথাক্রমে হিমোগ্লোবিন সংযুক্ত অক্সিজেন সরবরাহের মাধ্যমে এটিপি উৎপাদন করে জীবনী শক্তির সঞ্চার করে, পরিবেশে অবস্থিত জীবাণুর সংক্রমন প্রতিরোধ ও প্রতিনিয়ত মৃদু আঘাতপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রাদিক্ষুদ্র রক্তনালীর অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এসব রক্তকনিকার মধ্যে শ্বেতকনিকা তার সংশ্লিষ্ট মাতৃকোষ বা আদিকোষ হতে পর্যায়ক্রমে একটি নির্দিষ্ট গতিতে স্বাভাবিক গঠনে তৈরী ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। কোন কারণে এর স্বাভাবিক গতির বৃদ্ধি পরিবর্তিত ও অনিয়ন্ত্রিত হওয়ার ফলে অপ্রতিরোধ্য এই অপরিণত শ্বেতকনিকার বিস্তৃতি দ্বারা অন্যান্য কোষসমূহ যথা লোহিতকনিকা বা অনুচক্রিকা বা উভয়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি প্রতিস্থাপিত হয়, তখনই ব্লাডক্যান্সার বা লিউকেমিয়ার সৃষ্টি হয় এবং উপসর্গসমূহ পরিলক্ষিত হয়।

ব্লাডক্যান্সারের কারণসমূহ : ব্লাডক্যান্সারের সঠিক কারণ আজ অবধি পরিষ্কার না হলেও এর সহিত কিছু অবস্থার সংশ্লিষ্টতার শক্তিশালী প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়। যার মধ্যে- ১) তেজস্ক্রিয়তা বা রেডিয়েশন সংস্পর্শের সংশ্লিষ্টতা, ২) রাসায়ানিক উপাদান সম্বলিত কসমেটিকস্ ও খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহৃত আকর্ষণীয় সুগন্ধযুক্ত রঞ্জকপদার্থের ব্যবহার, ৩) অন্য ক্যান্সারজনিত চিকিৎসায় কেমোথেরাপির ব্যবহার, ৪) পরিবেশে বিরাজমান জীবাণু-যেমন কতিপয় ভাইরাসের ঘন ঘন সংক্রমন, ৫) উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত কিছু জিনগত ত্রুটি (যেমন- ফ্যানকনি এনিমিয়া, ব্লুম সিনড্রোম, এটাক্সিয়া টেলানজি এক্টেশিয়া, জেরোডারমা পিগমেন্টোসাতে ক্রোমোজম এর অতি ভাঙনজনিত কারণ ও ডাউন সিনড্রোম শ্বেতরক্তকনিকার মাতৃকোষকে পরিবর্তিত করে এর গতি ও প্রকৃতির বৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক অপ্রতিরোধ্য করেব্লাডক্যান্সারের জন্ম দেয়।

 

ব্লাড ক্যান্সারের প্রকারভেদ: সাধারণত বয়স ও তীব্রতাভেদে আমাদের দেশে রোগাক্রান্ত উল্লেখযোগ্য ব্লাডক্যান্সারসমূহ যেমন- ১। লিউকেমিয়া: তীব্রতা বা উপস্থাপন ভেদে : ক) একিউট লিউকেমিয়া: স্বল্পতমসময়ে পরিলক্ষিত হয় দ্রুত চিকিৎসা নিলে প্রকারভেদে সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। যেমন-এপিএমএল, অন্যথায় মৃত্যুঝুঁকি প্রবল। খ) ক্রনিক লিউকেমিয়া : ধীরগতি সম্পন্ন ব্লাডক্যান্সার পূর্ণনিরাময় কষ্টসাধ্য হলেও নিয়ন্ত্রণযোগ্য। নিয়মিত ঔষধ সেবনে দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা যায়। মৃত্যুঝুঁকি কম (যেমন-সিএলএল)। কোষসংশ্লিষ্টতা ও তীব্রতা ভেদে : ক) মাইলয়েড : একিউট মাইলোব্লাসটিক লিউকেমিয়া (এএমএল) ক্রনিক মাইলয়েড লিউকেমিয়া(সিএমএল), খ) লিম্ফয়েড : একিউট লিম্ফোব্লাশটিক লিউকেমিয়া (এএলএল) ক্রনিক লিম্ফোসাইটিক লিউকেমিয়া (সিএলএল)

২। লিম্ফোমা: লিম্ফ নোর্ড বা লসিকাগ্রন্থির ক্যান্সার : ক) হড্জকিন লিম্ফোমা : সব বয়সে হলেও বয়সের প্রথম ও শেষভাগে বেশী হতে দেখা যায়। সাধারণত কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি বা ইমিউনো থেরাপি চিকিৎসায় সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য একটি লসিকা গ্রন্থির ক্যান্সার। খ) নন হড্জকিন লিম্ফোমা: এটি ও প্রাপ্ত বয়স্কদের লিম্ফ নোড্ বা লসিকাগ্রন্থির একধরনের ক্যান্সার। আক্রান্ত কোষ এর গতি, প্রকৃতি ও আচরণ অনুযায়ী এটি অনেক ধরনের রয়েছে। উচ্চগতির ও সীমিত পর্যায়ের এ জাতের ক্যান্সারসমূহ কেমো-ইমিউনো থেরাপি চিকিৎসায় প্রায় সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। ক্ষেত্রবিশেষে বিকল্প শল্য ও রেডিও থেরাপি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। ৩। মাল্টিপল মাইলোমা: অতি ধীরগতির এই ক্যান্সারে বয়োজৈষ্ঠ্যরা সাধারণত আক্রান্ত হয়। এ ক্যান্সারটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য নয়। সীমিত পর্যায়ে নিয়মিত উপযুক্ত চিকিৎসায় সুস্থ থাকা সম্ভব। এছাড়া ও ব্লাডক্যান্সার নয় কিন্তু এতদসংশ্লিষ্ট কিছু রোগ যেমন- প্রাইমারি পলিসাইথেমিয়া, প্রাইমারি মাইলোফাইব্রোসিস, এসেনশিয়াল থ্রোম্বসাইথেমিয়া ও মাইলো-ডিসপ্লাশিয়া নামক কিছু মাইলো প্রলিফারেটিভ রোগ ও ক্যান্সার ঝুঁকিপূর্ণ।

ব্লাডক্যান্সার কাদের হয় : এএমএল, সিএমএলএল,সিএলএল ও লিম্ফোমা (কিছু হড্জকিন লিম্ফোমা ব্যাতীত) স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে মূলত প্রাপ্ত বয়স্কদের এবং অন্যদিকে এএলএল-সহ কিছু হড্জকিন লিম্ফোমা প্রায়শ: শিশুদের আক্রান্ত হতে দেখা যায়। তবে প্রাপ্তবয়স্কদেরও এএলএল হতে পারে যেমনটি শিশুদেরও এএমএল হয়।

ব্লাডক্যান্সারের লক্ষণ বা উপসর্গসমূহ: যেহেতু বিভিন্ন ব্লাডক্যান্সারের প্রবণতা বয়সসংশ্লিষ্ট এবং হাড়ের অস্থিমজ্জা বা বোন ম্যারো থেকে উৎপত্তি হয়, সে কারণে তাদের কিছু সাধারন লক্ষণসহ প্রতিটির আবার বিশেষায়িত কিছু লক্ষণ রয়েছে। সাধারণ লক্ষণসমূহ: রক্তশূন্যতা-দূর্বলতা/অবসাদগ্রস্থতা, ঘন ঘন জীবাণু সংক্রমন-জ্বর/গলা ব্যাথা, বিভিন্ন স্থান হতে বিভিন্ন রকম রক্তক্ষরণ: দাঁত, মুখে, নাকে, যোনি, পায়ুপথ ও চামড়ার নীচে।

হাড় ও গিড়া ব্যাথা-একিউট লিউকেমিয়ার লক্ষণ। যকৃত বা লিভার, প্লীহা তথা স্প্লিন বৃদ্ধি ও লিম্ফআ্যডেনোপ্যাথি বা লসিকাগ্রন্থি ফুলে উঠা একিউট লিউকেমিয়ার লক্ষণ হলেও বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে এগুলো যথাক্রমে ক্রনিক মাইলয়েড ও ক্রনিক লিম্ফোসাইটিক লিউকেমিয়া বা লিম্ফোমার লক্ষণ।

লিম্ফোমার বিশেষায়িত লক্ষনসমূহ: লিম্ফোমার বিশেষায়িত লক্ষণসমূহের মধ্যে ঘন ঘন জ্বর আসা, অপরিকল্পিত অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস অত্যাধিক ঘাম হওয়া ইত্যাদি। উচ্চগতির লিম্ফোমাতে জরুরি উপসর্গ যেমন-শ্বাস কষ্ট, কাশিঁসহ পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিসও হতে পারে।

মাল্টিপল মাইলোমা: অতি ধীরগতি সম্পন্ন আর এই ক্যান্সারটি যা বয়োজৌষ্ঠ রোগীদের হয়ে থাকে এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রে দিনের পর দিন লক্ষণবিহীন থাকে। অন্য কোন রোগাক্রান্ত না হওয়া অবধি ধরা পড়ে না। কদাচিৎ হাড়ব্যাথা বা ভাঙাসহ কিডনী রোগ ও পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে ও এই রোগীরা চিকিৎসকের দ্বারস্থ হয়।
ব্লাডক্যান্সার রোগ নির্ণয় : ১) রক্তের সিবিসি হলো প্রাথমিক পরীক্ষা। ২) অস্থিমজ্জা বা বোন ম্যারো মরফোলজি ও ফ্লো সাইটোমেট্রি ব্লাড ক্যান্সার বা লিউকেমিয়ার বিশেষায়িত পরীক্ষা। ৩) লিম্ফ নোড্ এক্সিশন বা ইনসিশন বায়োপসি/ হিষ্টো মরফলজি লিম্ফোমা রোগ নির্ণয়ের উপযুক্ত পরীক্ষা। এফএনএসি কোন ক্রমেই লিম্ফোমা রোগ নির্ণয়ের সহায়ক পরীক্ষা নয়। ৪) ইমিউনো-হিষ্টো কেমিষ্ট্রি হলো লিম্ফোমার বিশেষায়িত পরীক্ষা। ৫) মাল্টিপল মাইলোমা রোগ নির্ণয়ে বোন ম্যারো পরীক্ষা ছাড়াও সিরাম প্রোটিন ইলেক্ট্রো ফরেসিস সহ আধুনিক ইমিউনোলজিক্যাল বিশেষায়িত ইমিউন ফিক্সেশন ইলেকট্রো ফরেসিস পরীক্ষা ও ফ্রি লাইট চেইন অ্যাসে সহ বিশেয়ায়িত পরীক্ষা রয়েছে।

ক্যান্সার নির্ণয়ের পাশাপাশি এর সম্ভাব্য ভয়াবহতা ও চিকিৎসা সফলতা যাচাইয়ে আরো কিছু আধুনিক পরীক্ষাসমূহ যেমন সাইটো-জেনেটিক্স ও মলিউকুলার পরীক্ষা যথাক্রমে পিসিআর, ফিস ও জিন এক্সপ্রেশন প্রোফাইল-নেক্সট জেনারেশন সিকোয়েন্সিং এর সাহায্যে নেওয়াা হয়। এগুলোর কিছু কিছু আমাদের দেশে সীমিত পরিসরে শুরু হলেও রাজধানী কেন্দ্রিক ও বেশীরভাগ ক্ষেত্রে পাশ্ববর্তী দেশের উপর নির্ভর করতে হয়।
ব্লাডক্যান্সার চিকিৎসা ও চট্টগ্রাম প্রেক্ষাপট : ব্লাডক্যান্সার কি চিকিৎসায় ভালো হয়! এটি কি চট্টগ্রামে হয়! ভালো হয় কি হয় না সেটি জানার পূর্বে জানা দরকার এর চিকিৎসা কি এবং আমাদের সক্ষমতা কত! ব্লাডক্যান্সারের চিকিৎসা হয় প্রধানত- ১) কেমো থেরাপি; ২) রেডিওথেরাপি; ৩) টার্গেটেড থেরাপি: যেমন ইমিউনো-থেরাপি ও নন ইমিউন টার্গেটেড ও রেডিও-ইমিউনো থেরাপি ইত্যাদি; ৪) স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশন যেমন অ্যালোজেনিক ও অটোলোগাস টান্সপ্লান্টেশন এর মাধ্যমে বর্তমানে উন্নত বিশ্বে উচ্চপ্রযুক্তির অত্যাধুনিক কাইমারিক এন্টিজেন রিসেপ্টর (কার-টি সেল) থেরাপি ব্লাডক্যান্সার চিকিৎসায় সংযুক্ত হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে ক্যান্সার চিকিৎসায় প্রয়োজন বোধে সার্জারী নিও-অ্যাডজুবেন্ট থেরাপি হিসাবে লিম্ফোমাতে ব্যবহার হয়। আমাদের দেশে কার-টি সেল থেরাপি এবং চট্টগ্রামে বোন-ম্যারো ট্রান্সপ্লানটেশন ব্যাতীত অন্যান্য চিকিৎসার সক্ষমতা রয়েছে।

 

নির্ভুল রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন : সুদক্ষ ব্লাডক্যান্সারের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তথা হেমাটোলজিষ্ট। চিকিৎসা উপকরণ- ১) কেমোথেরাপি, ইমিউনো থেরাপির মানসম্মত ঔষধ। ২) রেডিও থেরাপির জন্য যথোপযুক্ত উন্নত প্রযুক্তির মেশিন। ৩) মানসম্পন্ন নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন ব্যবস্থা। ৪) উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন সার্বক্ষণিক ল্যাবরেটরী সেবা। ৫) বিশেষায়িত অবকাঠামো সম্পন্ন হেমাটোলজি ইউনিট। আইসিইউ-সহ মাল্টি স্পেশিয়ালিটি সহায়ক চিকিৎসা ব্যবস্থা। ষ্টেম সেল ট্রান্সপ্লানটেশন ইউনিট।

চট্টগ্রামের সক্ষমতা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা : একিউট লিউকেমিয়া: এএমএল/এএলএল রোগ নির্র্ণয়ে সিবিসি/বোন ম্যারো মরফলজি প্রয়োজন বোধে সক্ষমতা সাপেক্ষে রাজধানী কেন্দ্রিক ফ্লো-সাইটো মেট্রি পরীক্ষার পর বিভিন্ন বিষয় বিচার বিশ্লেষণ, ক্যান্সার এর ভয়াবহতা নির্ণয় সাপেক্ষে কম ঝুঁকি সম্পন্ন চিকিৎসা উপযোগী ব্লাডক্যান্সারসমূহ- যেমন এএমএল-ইটো, এএমএমএল, এপিএমএল ও শিশুদের এএলএল (১-১০ বছর) রোগীদের সম্পূর্ন সুস্থ করার পরিকল্পনা নিয়ে চমেক হেমাটোলজি বিভাগে রোগীদের অন্ত:বিভাগে ভর্তি করে বিভিন্ন উপযোগী চিকিৎসা প্রটোকলের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমিক- ইনডাক্শন রেমিশন, রেমিশন কনসোলিডেশন, প্রয়োজনে রেমিশন- মেইনট্যানেন্স কেমোথেরাপি চিকিৎসা প্রদান করে নিয়মিত মনিটরিং করা হয়। উচ্চঝুঁকি সম্পন্ন ও কেমো অনুপযুক্ত রোগীদের ও সক্ষমতা সাপেক্ষে উপযুক্ত সর্বোত্তম চিকিৎসা ও পরামর্শ দেওয়া হয়। এই সব চিকিৎসা ব্যবস্থা চট্টগ্রামে সম্ভব।

ক্রনিক লিউকেমিয়া : বেশিরভাগ রোগী যেমন সিএমএল টার্গেটেড চিকিৎসায় সম্পূর্ন নিয়ন্ত্রন যোগ্য এবং প্রায় সম্পূর্ন নিরাময় যোগ্য! যেটির জন্য ইতিপূর্বে অ্যলোজনিক ষ্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশন এর প্রয়োজন হতো। সিএমএল ও সিএলএল-সিবিসি/বোন ম্যারো পরবর্তী যথাক্রমে প্রায় ৯৫ শতাংশ সাইটো-জেনেটিক্স ও ফ্লো সাইটোমেট্রি পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় হয়। সিজিএল ও সিএলএল রোগীদের রোগের স্তর নির্নয় সাপেক্ষে বাজারে সরবরাহকৃত টার্গেটেড ঔষধ ও কেমোথেরাপির মাধ্যমে যথাক্রমে বহি:বিভাগ ও ডে-কেয়ারে চিকিৎসা দেয়াসহ ও মনিটরিং করা হয়। লিম্ফোমা: বিভিন্ন উচ্চ গতির নন্ হড্জকিন লিম্ফোমা ও হড্জকিন লিম্ফোমা রোগের স্তর, ফিটনেস ও যোগ্যতা বিবেচনা সাপেক্ষে কেমো-ইমিউনো থেরাপি, কেমো থেরাপি প্রয়োজনে এডজুভেন্ট ও নিও-এডজুভেন্ট হিসাবে যথাক্রমে রেডিও থেরাপি ও শল্য চিকিৎসায় সম্পূর্ন নিরাময় যোগ্য।এই সব চিকিৎসা চট্টগ্রামে পাবলিক ও প্রাইভেট ব্যবস্থাপনায় করা সম্ভব। চিকিৎসা সফলতা মনিটরিং এর জন্য প্রয়োজনীয় ফলোআপ ও সিটি স্ক্যান এর সহায়তা নেওয়া হয়। ক্ষেত্র বিশেষে রিল্যাপ্স ও উচ্চঝুঁকি সম্পন্ন ক্যাটাগরি সমূহের জন্য অটোলোগাস ষ্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশন চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। মনিটরিংয়ের জন্য এফডিজি-প্যাট সিটি স্ক্যান ও প্রয়োজনীয় ষ্টেম সেল ট্রান্সপ্লানটেশন চিকিৎসার জন্য রাজধানী ঢাকামুখী হতে হয়।

মাল্টিপল মাইলোমা: রোগ নির্ণয় পরবর্তী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে রোগের প্রকৃতি, স্তর ও চিকিৎসা প্রাপ্যতা বিবেচনা অনুযায়ী বাজারে সরবরাহকৃত উপযোগী ঔষধের মাধ্যমে চিকিৎসা শুরু করার পর নির্দিষ্ট সময় শেষে ঝুঁকি বিবেচনায় নির্ধারিত সময়ে বাছাইকৃত রোগীদের অটোলোগাস ষ্টেম সেল ট্রান্সপ্লানটেশনর পরামর্শ অথবা প্রচলিত মেইনট্যানেন্স চিকিৎসা প্রদান করা হয়। নন-ক্যান্সার মাইলো প্রলিফারেটিভ নিওপ্লাজম যেমন পলিসাইথেমিয়া রুব্রা ভেরা, প্রাইমারি মাইলোফাইব্রোসিস ও এসেনশিয়াল থ্রোম্বসাইথেমিয়া রোগ মূলত বহি:বিভাগ নির্ভর। প্রয়োজনীয় রক্ত ও সাইটো-জেনেটিক পরীক্ষার সহয়তায় রোগ নির্ণয়রে পর নিয়মিত চিকিৎসা ও সার্ভিলেন্সে এ রাখা হয় এবং ক্যান্সার ঝুঁকি পর্যালোচনা সাপেক্ষে চিকিৎসা প্রদান করা হয়।
পরিশেষে আমাদের দেশে ব্লাডক্যান্সারের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ভয়াবহতা কম নয়। পাশাপাশি চিকিৎসা উপকরণ যথা ঔষধ প্রাপ্যতা নিশ্চিত ও বিভাগীয় শহরে অবকাঠামোগত কিছুটা উন্নতি হলে ও রোগ নির্ণয়ে প্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল মানসম্মত উপকরণ তথা যন্ত্রপাতির ঘাটতি রহিয়াছে। সুদক্ষ জনবল-রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যাও অপ্রতুল। প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে বিশেষজ্ঞ মাত্র ২শ’র কম। তবে চট্টগ্রামবাসীর জন্য সুসংবাদ হলো- ২০২১ সাল হতে বাংলাদেশ সরকারের চিকিৎসা বিকেন্দ্রিকরণের দূরদৃষ্টি বিবেচনায় বিএসএমএমইউ’র উদ্যোগে চমেক হেমাটোলজি বিভাগে স্থানীয় পর্যায়ে জনবল সৃষ্টির জন্য এমডি (হেমাটোলজি) কোর্স চালু করা হয়েছে। বর্তমানে তিনটি ব্যাচে পাঁচজন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। অধিকিন্তু জনবলের সঠিক ব্যবস্থাপনার ও ঘাটতি বিদ্যমান। অপরদিকে ব্লাডক্যান্সার ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা নির্ভর ধনী গরীব, স্ত্রী-পুরুষ, যুবা-বৃদ্ধ, রাজধানী-প্রত্যন্ত অঞ্চল সবক্ষেত্রে সমহারে বিস্তৃত এবং একটি দুরারোগ্য ব্যাধি। দরিদ্র শ্রেণিকে এই রোগের চিকিৎসার আওতায় আনতে হলে এটিকে সাশ্রয়ী করার বিকল্প নাই। তাই দরিদ্র রোগীদের জন্য চিকিৎসাব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণে অবকাঠামোর পাশাপাশি জনগণের দোড়গোরায় জনবল সৃষ্টির ও উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।

 

অধ্যাপক (ডা.) মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, হেমাটোলজি (রক্ত ও রক্ত রোগ বিভাগ) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট