চট্টগ্রাম শনিবার, ২০ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

রাসেল’স ভাইপারে গুজব-উদ্বেগ

মিজানুর রহমান

২২ জুন, ২০২৪ | ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ

দেশে বর্ষা আসতে না আসতেই চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিষধর সাপ-চন্দ্রবোড়া বা রাসেলস ভাইপার নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হঠাৎ নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ায় বাড়ছে আতঙ্ক।

 

 

তবে সাপ নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা বলছেন- চট্টগ্রামে রাসেলস ভাইপারের অস্তিত্ব মিললেও নিকট অতীতে এই সাপ কাউকে কামড় দিয়েছে এমন তথ্য নেই। এখন কেউ আক্রান্ত হলেও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই তার চিকিৎসা সম্ভব। তাই এই সাপ নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই।

 

 

গবেষকেরা জানিয়েছেন-রাসেলস ভাইপার কাউকে কামড় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওই ব্যক্তির মৃত্যু, এটি সবচেয়ে বিষধর সাপ বা মানুষ দেখলেই কামড় দিতে আসে-এসব তথ্য গুজব। তবে কেউ যদি আক্রান্ত হন-তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। কারণ এই সাপের বিষ শরীরে ছড়িয়ে পড়লে ফুসফুস, হৃদযন্ত্র, কিডনিসহ শরীরের ‘মাল্টি অর্গান’ বিকল হয়ে যায়। তখন ‘মাল্টি সাপোর্টের’ দরকার হয়। দেরি হলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

 

 

চট্টগ্রামে রাসেলস ভাইপারের ইতিহাস পুরোনো

সম্প্রতি চট্টগ্রামে রাসেলস ভাইপার বিস্তার লাভ করেছে বলে খবর এলেও বহু আগে থেকেই এখানে এই সাপ ছিল বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ভেনম রিসার্চ সেন্টারের প্রধান গবেষক অধ্যাপক ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষ জয় পূর্বকোণকে বলেন, রাসেলস ভাইপার বাঁশখালীতে দেখা গিয়েছিল অনেক বছর আগে। বেশ কিছুদিন আগেও সীতাকুণ্ড উপকূলে একটি রাসেলস ভাইপার পাওয়া গেছে।

 

 

রাসেলস ভাইপার গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ আহসানও একই তথ্য জানিয়েছেন। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, চট্টগ্রামে রাসেলস ভাইপারের হিস্ট্রি অনেক পুরোনো। এখানকার মানুষের এই সাপ নিয়ে আতঙ্কের কারণ নেই। মূলত দেশের উত্তরাঞ্চলে রাসেলস ভাইপার বেশি দেখা দিলেও সম্প্রতি এর বিস্তার বাড়ছে। আগে যেখানে দেখা যায়নি সেখানেও এখন এটি দেখা যাচ্ছে।

 

 

দুই কারণে বাড়ছে বিস্তার

দুই কারণে বিভিন্ন এলাকায় রাসেলস ভাইপারের বিস্তার বাড়তে পারে বলে মনে করেন অধ্যাপক ফরিদ আহসান। তিনি জানান, রাসেলস ভাইপার শুকনো জায়গায় থাকে। কিন্তু বন্যা-জলাবদ্ধতায় আবাসস্থল প্লাবিত হওয়ায় ফসলের মাঠে তাদের চলাচল বেড়েছে। এই সাপ একসঙ্গে ৩-৬৩টি বাচ্চা দিতে পারে। সাপের বাচ্চাখেকো প্রাণীর সংখ্যা কমতে থাকার কারণেও নতুন এলাকায় এর বিস্তার বাড়তে পারে।

 

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাসেলস ভাইপারের এখন প্রজননকাল চলছে। তাই দেখাও যাচ্ছে বেশি। মে থেকে পরের তিন মাস প্রজনন সবচেয়ে বেশি ঘটে। সাপটি পানিতেও চলতে পারে বলে বর্ষাকালে কচুরিপানার সঙ্গে বহুদূর পর্যন্ত ভেসে নিজের স্থানান্তর ঘটাতে পারে। এই সাপ যেহেতু ডিম না দিয়ে সন্তান প্রসব করে, ফলে সাপের বাচ্চাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।

 

চমেক হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা সম্ভব

অধ্যাপক ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষ জয় জানান, যদি কাউকে রাসেলস ভাইপার কামড় দেয়, দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। বিষধর সাপ কোবরা, কেউটে এবং রাসেলস ভাইপারের এন্টিভেনম একই। চমেক হাসপাতাল এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত এন্টিভেনম রয়েছে। দেশে এন্টিভেনম প্রয়োগ চমেক হাসপাতাল থেকেই শুরু। রাসেলস ভাইপারের কামড়ে আক্রান্ত ব্যক্তিকে চট্টগ্রামেই চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।

 

কামড় দিলে নষ্ট করা যাবে না এক মুহূর্তও

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে গত বছর দেশে চার লাখ সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সাড়ে সাত হাজার মানুষ মারা গেছেন। বেশিরভাগই বিষধর সাপের কামড়ে। তাই রাসেলস ভাইপার কামড় দিলে এক মুহূর্তও নষ্ট না করার পরামর্শ ডা. অনিরুদ্ধ ঘোষের। তিনি বলেন, দ্রুত চিকিৎসা দিলে রোগী ভালো হয়। তবে চিকিৎসা সময়সাপেক্ষ। এর বিষ মাল্টিপল অর্গান ইফেক্ট করে। তাই মাল্টি সাপোর্ট দরকার হয়।

 

 

কাউকে নিজ থেকে আক্রমণ করে না

মানুষ দেখলেই রাসেলস ভাইপার কামড় দিতে ছুটে আসে- এই ধরনের তথ্য সত্য নয় বলে জানিয়েছেন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, সাপসহ বণ্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলে কেউ বাধা না দিলে তারা আক্রমণ করে না। রাসেলস ভাইপারও একই রকম। তাই কোথাও রাসেলস ভাইপার দেখলেই তাকে আক্রমণ করা যাবে না।

 

 

রাসেলস ভাইপার যেভাবে চিনবেন

রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়ার দেহ মোটাসোটা, লেজ ছোট ও সরু। প্রাপ্তবয়স্ক সাপের দেহের দৈর্ঘ্য সাধারণত ১ মিটার; দেহের সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ১.৮ মিটার পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রজাতির সাপের কামড়ের কিছুক্ষণ পরই দংশিত স্থানে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। ব্যথার পাশাপাশি দংশিত স্থান দ্রুত ফুলে যায় এবং ঘণ্টা খানেকের মধ্যে দংশিত স্থানের কাছে শরীরের আরও কয়েকটি অংশ আলাদাভাবে ফুলে যায়।

 

 

সতর্কতা

রাসেলস ভাইপার ঝোপঝাড়ে থাকে উল্লেখ করে গবেষক অধ্যাপক ফরিদ আহসান বলেন, যারা বিলে বা ঝোপঝাড়ে কাজ করতে যাবেন- তারা যদি পায়ে গাম বুট, শরীরে জিন্সের প্যান্ট, হাতে গ্লাভস পরে কাজে যান- তাহলে রাসেলস ভাইপার থাকলেও আর কামড় দিতে পারবে না। ভয়হীন চিত্তে কাজ করা যাবে। এছাড়া আশপাশে উঁচু ঘাস থাকলে বাঁশ দিয়ে নেড়ে দিতে হবে। তাহলে রাসেলস ভাইপার থাকলেও চলে যাবে।

 

বিনামূল্যে রাসেল’স ভাইপার উদ্ধার করবে স্নেক রেসকিউ টিম

চট্টগ্রামসহ দেশের কোথাও রাসেল’স ভাইপার দেখা গেলে উদ্ধার করে দেবে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন- স্নেক রেসকিউ টিম বাংলাদেশ। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক প্রিতম সুর রায় পূর্বকোণকে বলেন, কেবল চট্টগ্রামেই আমাদের ২০ জন সদস্য রয়েছেন। যে কোনো জায়গায় রাসেল’স ভাইপার বা বিষধর সাপ দেখলেই আমাদের হটলাইন নম্বরে (০১৩০৩-১২৯৯১৬) জানানো যাবে। আমাদের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিনামূল্যে সেটি উদ্ধার করে দেবেন।

 

কামড় দিলে করণীয়

স্নেক রেসকিউ টিম বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক প্রিতম সুর রায় পূর্বকোণকে বলেন, রাসেল’স ভাইপার কামড় দিলে সাপুড়ে, ওঝা, কবিরাজ, বৈদ্যের কাছে যাওয়া যাবে না। কামড়ের স্থানে ব্লেড ছুরি দিয়ে কাটাকাটি করা, মুখ দিয়ে শুষে রক্ত বের করা- এসব করা যাবে না। বাঁধ, গিট্টু দেওয়া যাবে না। মুখে মরিচ নিয়ে ঝাল লাগা না লাগা পরীক্ষা করা যাবে না। বরং রোগীকে অভয় দিয়ে সাহস যোগাতে হবে। যেখানে কামড় দিয়েছে সেই অঙ্গ কম নড়াচাড়ার চেষ্টা করতে হবে। রোগীকে ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের মধ্যে হাসপাতালে নিলে বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।

পূর্বকোণ/এসএ

শেয়ার করুন