চট্টগ্রাম বুধবার, ২৪ জুলাই, ২০২৪

সর্বশেষ:

নগরীতে ১৬ বছরে ‘গায়েব’ ৪ হাজার পুকুর!

নাজিম মুহাম্মদ

১৫ জুলাই, ২০২৩ | ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক পুকুর। গত ১৬ বছরেই নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে হারিয়ে গেছে প্রায় ৪ হাজার পুকুর। জলাধার সংরক্ষণ আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসব পুকুর ভরাটের পর নির্মাণ করা হয়েছে বহুতল ভবন, মার্কেট। এতে নগরীতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। জলাবদ্ধতা প্রকট হচ্ছে। নগরীর উষ্ণতা বাড়ছে। জলজ উদ্ভিদের উৎস নষ্ট হওয়ায় জীব বৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।

 

সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ২০০৬-০৭ সালের মাস্টারপ্ল্যান প্রতিবেদন অনুযায়ী সেই সময় নগরীতে পুকুরের সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৫২৩টি। এরপর সিডিএ পুকুর নিয়ে আর কোনো জরিপ না করলেও মৎস্য অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিস আলাদা করে জরিপ করেছে। মৎস্য অধিদপ্তরের হালনাগাদ করা তথ্য অনুযায়ী নগরীতে এখন পুকুরের সংখ্যা ৫৯০টি। অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিসের হালনাগাদ করা তথ্য অনুযায়ী নগরীতে এখন পুকুরের সংখ্যা ২৭৩টি।

 

দুই ধরনের পুকুরের তালিকা নিয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক আবদুল মালেক জানান, যেসব পুকুর এখনো টিকে আছে, অগ্নিকাণ্ডের সময় যেসব পুকুরের পানি ব্যবহার করা যাবে সেসব পুকুরের উপর জরিপ চালিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। তবে এর বাইরেও উপকূলীয় এলাকায় বেশ কিছু পুকুর রয়েছে। যেখানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাছ চাষ করা হয়। সেসব পুকুর আমাদের জরিপে আসেনি। কারণ ওইসব এলাকায় মানুষের বসবাস তেমন গড়ে উঠেনি।

 

অন্যদিকে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলী জানান, চট্টগ্রাম নগরীতে দিন দিন পুকুরের সংখ্যা কমছে। সম্প্রতি পুকুর নিয়ে আমরা একটি জরিপ চালিয়েছি। মৎস্য অফিসের সীমিত জনবল নিয়ে জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের জরিপে হালিশহর, পাহাড়তলী, উত্তর হালিশহর, কাট্টলী, ফতেয়াবাদ এলাকার পুকুরের তথ্য উঠে এসেছে বেশি। আমাদের জরিপে সাধারণ পুকুরের পাশাপাশি যেসব পুকুরে মাছ চাষ করা হয়েছে তার পরিসংখ্যানও উঠে এসেছে।

 

কমছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর :

২০১১ সালে নগরীর আগ্রাবাদে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ২৪১ ফুট নিচে। ওই সময়ে পাহাড়তলীতে ১৩৬ ফুট, খুলশীতে ২২০ ফুট ও বায়েজিদে ১৫৫ ফুট নিচে পানির স্তর পাওয়া যায়। তবে মাত্র এক যুগের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ নেমে গেছে পানির স্তর। চলতি বছর আগ্রাবাদে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পাওয়া গেছে ৩০২ ফুট নিচে। এছাড়া পাহাড়তলীতে ২৬০ ফুট, খুলশীতে ৪৪০ ফুট ও বায়েজিদে ২৮০ ফুট নিচে পানির স্তর পাওয়া গেছে। নগরীতে নতুন নতুন ভবনের সঙ্গে গভীর নলকূপের সংখ্যা বাড়ায় এবং পুকুরের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম।

 

অপেক্ষা করছে ভয়াবহ বিপর্যয় :

পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সোবহান জানান, চট্টগ্রাম নগরীর পুকুরগুলো একে একে ভরাট করে ফেলার কারণে বর্ষায় জলাবদ্ধতা প্রকট হচ্ছে। পানি ধরে রাখার জায়গা কমে যাচ্ছে। জলাভূমি কমে যাওয়ায় বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে শহরের উষ্ণতাও বাড়ছে। জলজ উদ্ভিদের উৎস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জীব-বৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। তিনি বলেন, পুকুর রক্ষায় জলাধার সংরক্ষণ আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। সিডিএ, সিটি কর্পোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে দায়িত্ব নিতে হবে। না হয় বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।

 

থেমে নেই পুকুর ভরাট :

এতো কিছুর মধ্যেও থেমে নেই পুকুর ভরাট। সম্প্রতি নগরীর দক্ষিণ পাহাড়তলীতে পাঁচটি পুকুর ভরাট করা হচ্ছে কৌশলে।  এরমধ্যে ঝর্ণাপাড়া নজির আহমদ চৌধুরী রোডে কবির আহমদ ও  হাবিব সওদাগর বাড়ির দুটি ও নবী চৌধুরী রোডে তিনটি পুকুর ভরাট করা হচ্ছে ধীরে ধীরে। স্থানীয় লোকজন জানান, এসব পুকুর ভরাটের নেপথ্যে রয়েছেন মাহাবুব নামে জনৈক ব্যক্তি। তার সাথে নগর পুলিশের কিছু কর্মকর্তার সখ্যতা রয়েছে। যার কারণে স্থানীয় কেউ তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস করেন না। একইভাবে বাকালিয়ার কালামিয়া বাজার এলাকায় ভরাট করা হচ্ছে ১৯ শতকের একটি পুকুর।

 

যা বলছে সিডিএ :

পুকুর কিংবা জলায়শ ভরাট করে ভবন নির্মাণের জন্য অনুমোদন কীভাবে দেওয়া দেয়া এমন প্রশ্নের উত্তরে সিডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসান জানান, বিএস খতিয়ানে পুকুর কিংবা জলাশয় থাকলেও মাস্টারপ্ল্যানের সময় যদি জমি ভরাট অবস্থায় পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে মাস্টারপ্ল্যানে সেটি ভরাট হিসাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। ওই ধরনের জমিতে ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়। এছাড়া কোনো জমি বিএস খতিয়ান ও মাস্টারপ্ল্যানে পুকুর হিসেবে উল্লেখ রয়েছে কিন্ত বর্তমানে ভরাট হয়ে গেছে সেক্ষেত্রেও ভরাট হয়ে যাওয়া জমির পরিমাণ যদি সাড়ে ১২ গণ্ডার নিচে হয় তাও ভবন নির্মাণে অনুমোদন পাবে।

পূর্বকোণ/মাহমুদ

শেয়ার করুন