চট্টগ্রাম শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬

ছয় বছর আগে চট্টগ্রামে পোষা প্রাণীর সংখ্যা ছিল পাঁচ হাজার। সেটি এখন লাখ ছাড়িয়েছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে উঠছে পেট ফুড ও আনুষঙ্গিক সামগ্রীর দোকান

শখ নয়, পোষ্য এখন পরিবারের অংশ

তাসনীম হাসান

১১ এপ্রিল, ২০২৬ | ১২:০৮ অপরাহ্ণ

২৫ ডিসেম্বর ২০২৫। সময়টা দুপুর ১২টার আশপাশে। ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশের মাটি ছুঁয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই ফ্লাইটে তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমান। পরিবারের সঙ্গী হয়ে আসা আরেক ‘সদস্য’ তখনই দৃষ্টি কাড়ে সবার। নাম তার জেবু, একটি পোষা বিড়াল। মুহূর্তেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে প্রাণীটি।

 

দেশের প্রধানমন্ত্রীর মতো প্রাণী পোষার প্রবণতা বাড়ছে দেশজুড়ে। সেই ঢেউ থেকে পিছিয়ে নেই বন্দরনগরী চট্টগ্রামও। পোষ্যদের নিঃস্বার্থ-নিঃশর্ত বন্ধনে জড়িয়ে পড়ছেন নানা বয়সী মানুষ।

 

মাত্র অর্ধযুগ আগেও যেখানে চট্টগ্রামে পোষা প্রাণীর সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ হাজার, এখন তা লাখ ছাড়িয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু সংখ্যায় নয়-এটি যেন মানুষের মানসিকতা, জীবনযাপন আর আবেগের গভীর রূপান্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে উঠেছে পেট ফুড ও আনুষঙ্গিক সামগ্রীর বিস্তৃত বাজার। ছোট দোকান থেকে শুরু করে বড় শপ-সবখানেই এখন পোষা প্রাণীর জন্য আলাদা খাদ্য, খেলনা, গ্রæমিং সামগ্রী ও চিকিৎসা পণ্যের সহজলভ্যতা তৈরি হয়েছে। অনলাইনের পাশাপাশি দোকানে মিলছে নানা ধরনের নানা জাতের পোষা প্রাণীও।

প্রাণী পোষেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় পূর্বকোণের। তাদের কথায় উঠে আসে একই অনুভব-শহুরে জীবনের একাকীত্ব, চাপ ও ব্যস্ততার ভিড়ে এই প্রাণীগুলো হয়ে উঠছে মানুষের নীরব মানসিক আশ্রয়। অনেকের কাছে একটি বিড়াল বা কুকুর এখন আর শুধু প্রাণী নয়-পরিবারেরই একজন।

 

যেখানে পাবেন পোষ্যর খাবার-জিনিসপত্র:
নগরের ২ নম্বর গেট, দেওয়ানহাট, রিয়াজউদ্দিন বাজার, বহদ্দারহাট, মুরাদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এখন পোষা প্রাণীর খাবার ও আনুষঙ্গিক পণ্যের দোকান গড়ে উঠেছে। সুপার শপেও মিলছে এসব খাবার। দেশীয় ব্র্যান্ডের পাশাপাশি আমদানি করা খাবারও পাওয়া যায় এসব দোকানে।

 

বহদ্দারহাট মোড়ে রয়েছে ‘রুপালী অ্যাকুরিয়াম এন্ড বার্ডস সেন্টার’ নামের একটি দোকান। পাখি ও অ্যাকুরিয়ামের মাছ বিক্রি দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এখন এটি পোষা প্রাণীর খাবার ও আনুষঙ্গিক পণ্যের পূর্ণাঙ্গ দোকানে পরিণত হয়েছে।

গত বুধবার রাতে রুপালী অ্যাকুরিয়াম এন্ড বার্ডস সেন্টারে গিয়ে দেখা যায় স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ শফিকের পোষা পার্সিয়ান জাতের বিড়ালটি দোকানজুড়েই ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেড়ালটির দেখাশোনার ফাঁকে বেচাকেনায় ব্যস্ত সময় পার করছিলেন এই তরুণ। মোহাম্মদ শফিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘এখন মানুষদের মধ্যে প্রাণী পোষার প্রবণতা বেড়েছে। আগে অনেকে পোষা প্রাণীকে মাছ, দুধ, কলা এসব খেতে দিতেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিড়ালের খাবার সম্পর্কিত তথ্য দেখার পর পরিবর্তন এসেছে খাদ্যভ্যাসে। আমাদের দোকানে বাইরের পাশাপাশি দেশীয় প্রতিষ্ঠানের তৈরি সব ধরনের খাবার রয়েছে। পাশাপাশি ব্যাগ, সিটবেল্টসহ সব ধরনের জিনিসপত্রও বিক্রি হচ্ছে বেশ।’

 

এই দোকানে পোষা দুই বিড়ালের জন্য খাবার কিনতে এসেছিলেন এক কিলোমিটার এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ জাকির। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমার একটি পার্সিয়ান ও আরেকটি হাইব্রিড জাতের বিড়াল রয়েছে। একটা সময় দেশের বাইরে ছিলাম। দেশে স্থায়ী হওয়ার পর চার বছর ধরে এই দুটি বিড়াল আমার নিত্যসঙ্গী। আগে নিজেরা বানিয়ে তাদের খাবার খাওয়াতাম। তবে এখন দোকানে যেহেতু সবকিছু মিলছে তাই এখান থেকেই নিয়ে যাই। প্রতি মাসে গড়ে দুটি বিড়ালের জন্য ৫-৭ হাজার টাকার খাবার-ওষুধপত্র লাগে।’ দুই নম্বর গেট এলাকার ‘সিটিজি পেট শপ’ওÑএখন এই চাহিদার আরেক বড় কেন্দ্র।

 

দোকানটির ব্যবস্থাপক খালেদ হোসেন বলেন, ‘প্রাণীর জন্য খাবার ও আনুষঙ্গিক সকল কিছু সরাসরি দোকান থেকে কেনার পাশাপাশি আমরা হোম ডেলিভারির সুযোগও রেখেছি। পোষ্যদের গুণগত খাবার, ট্রিটস, খেলনা, গ্রæমিং পণ্য, ওষুধ ও আনুষাঙ্গিক আরও অনেক কিছু রয়েছে আমাদের। এখন যেহেতু ঘরে ঘরে পোষ্য রাখার প্রবণতা বেড়েছে তাই এ সংক্রান্ত ব্যবসার প্রসারও ঘটছে।’

শুধু দোকান নয়, কোথাও গেলে প্রিয় পোষ্যকে একা রেখে যাওয়ার টেনশনও এখন আর নেই। ভ্যাকসিন নিয়েও আতঙ্কের প্রয়োজন নেই। কেননা এখন পোষ্যর যতœ নেয়ার জন্য গড়ে উঠছে ডে কেয়ার সেন্টারের মতো প্রতিষ্ঠানও। চট্টগ্রামের পশ্চিম খুলশীতে ‘পেট কেয়ার সিটিজি’ নামের এই প্রতিষ্ঠানের অবস্থান।

 

দিনে দিনে পোষা প্রাণী রাখার প্রবণতা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘পাঁচ-ছয় বছর আগেও চট্টগ্রামে পোষা প্রাণীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৫ হাজার। এখন সেটি ১ লাখ ছাড়িয়েছে। এদের বেশিরভাগই বিড়াল।’

 

কেন প্রবণতা বাড়ছে এই প্রশ্নে ডা. মো. আলমগীর বলেন, ‘এই পরিবর্তনের বড় অংশই এসেছে করোনার লকডাউন থেকেই, যখন অনেকে একাকীত্ব কাটাতে পোষ্যকে জীবনের অংশ করে নিয়েছিলেন। সেই প্রবণতার প্রসার ঘটেছে এখন।’

 

শখ করে করোনার লকডাউনে বিড়াল পোষা শুরু করেন ফাহমিদা আক্তার। এখন যেখানেই যান সেখানেই সঙ্গে করে নিয়ে যান প্রিয় পোষ্যটিকে। ফাহমিদা বলেন, ‘বিড়ালটি এখন আমার সন্তানের মতো। শুধু আমার না, ঘরের সবারই আবেগের কেন্দ্র সে। ঠিক কোন রসায়নে বিড়ালটি পরিবারের সবচেয়ে ভালোবাসার ধন হয়ে ওঠেছে, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। যা আছে সবটাই অনুভ‚তি।’

 

আসলে কোনো কোনো অনুভ‚তির ব্যাখ্যা হয় না। নীরব উপস্থিতি, নরম পায়ের শব্দ কিংবা এক টুকরো আদুরে দৃষ্টি-সব মিলিয়ে পোষ্যরা যেন হয়ে উঠেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মানসিক আশ্রয়, অভ্যাস হয়ে যাওয়া ভালোবাসা!

 

দৈনিক পূর্বকোণ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট