চট্টগ্রাম বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

সর্বশেষ:

সেহরি ও ইফতারিতে যা খেতেন মহানবী সা.

মুহাম্মদ মোরশেদ আলম

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ৪:১৬ অপরাহ্ণ

পবিত্র রমজানুল মুবারক এসে গেছে। আর এ মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে রোজা রাখা মুসলমানদের ওপর ফরজ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য রোজার বিধান দেওয়া হলো, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে করে তোমরা তাকওয়া বা আল্লাহ ভীরুতা অবলম্বন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)।
রোজা ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম। রোজাদারের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত ইফতারের সময়। সারাদিনের রোজার ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করে যখন মোমিন বান্দা ইফতার করে তখন তাদের মনে অপার্থিব আনন্দ-উচ্ছ্বাস নিয়ে আসে। হাদিসে এসেছে, ‘রোজাদারের জন্য দুইটি আনন্দঘন মুহূর্ত রয়েছে। একটি হলো ইফতারের সময় এবং অন্যটি হলো (কেয়ামতের দিনে) নিজ প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়।’ (বুখারি: ৭৪৯২; মুসলিম: ১১৫১; তিরমিজি: ৭৬৬)। ইফতারের সময় আল্লাহতাআলা তাঁর রোজাদার বান্দাদের দোয়া কবুল করেন এবং ইফতারের মাধ্যমেই একজন রোজাদার তাঁর রোজা সম্পন্নের পর মহান আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করেন। মহান আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন, ‘মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য, কিন্তু রোজা কেবল আমারই জন্য, আমিই নিজেই এর প্রতিদান দেবো’ (বুখারি)।
নবী করিম (স.) ইরশাদ করেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। ন্যায়পরায়ণ শাসক, রোজাদার যখন সে ইফতার করে ও নির্যাতিত ব্যক্তির দোয়া’ (ইবনে মাজাহ: ১৭৫২)। তিনি আরও বলেছেন, ‘ইফতারের সময় রোজাদের ন্যূনতম একটি দোয়া অবশ্যই কবুল হয়।’ (ইবনে মাজাহ: ১৭৫৩)।
মহানবী (সা.) সেহ‌রি ও ইফতারের জন্য আলাদা কোনো খাবারের আয়োজন করতেন না। খুব বেশি আয়োজনও থাকতো না তাঁর দস্তরখানে। স্বাভাবিক সময়ে যে খাবারগুলো খেতেন, রমজানের সেহ‌রি ও ইফতারেও তা-ই খেতেন। তবে বিভিন্ন হাদিসে খেজুর দিয়ে সেহ‌রি ও ইফতার করার কথা এসেছে । আর খেজুর পুষ্টি ও শর্করা উপাদানের উৎস হিসেবে কাজ করে। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেন, ‘খেজুর কতই না উত্তম সেহ‌রি!’ (আবু দাউদ : ২৩৪৫)। ইফতারও মহানবী (সা.) খেজুর দিয়ে করতে পছন্দ করতেন। তাঁর ইফতারের পাতে বেশির ভাগ সময় কাঁচা খেজুর থাকত। কাঁচা খেজুর না থাকলে শুকনো খেজুরও খেতেন তিনি। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ‘নবী (সা.) নামাজের আগে কয়েকটি কাঁচা খেজুর খেয়ে ইফতার করতেন। যদি কাঁচা খেজুর না থাকত, তাহলে শুকনো খেজুর দিয়ে। যদি শুকনো খেজুরও না থাকত তাহলে কয়েক ঢোক পানি দিয়ে।’ (তিরমিজি: ৬৩২)। খেজুর ও পানি দ্বারা ইফতার করার পর নবিজি সা. শুকরিয়া আদায় করতেন। হাদিসে এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. যখন ইফতার করতেন তখন বলতেন-‘জাহাবাজ জামাউ; ওয়াবতালাতিল উ’রুকু; ওয়া ছাবাতাল আঝরূ ইনশাআল্লাহ।’ অর্থ : ‘ (ইফতারের মাধ্যমে) পিপাসা দূর হলো, শিরা-উপসিরা সিক্ত হলো এবং যদি আল্লাহ চান সাওয়াবও স্থির হলো ‘ (আবু দাউদ, মিশকাত)।
খেজুর ছাড়াও তৎকালীন আরবে প্রচলিত অন্যান্য খাবারও খেতেন মহানবী (সা.)। আবদুল্লাহ ইবনে আবি আউফ (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রোজায় আমরা রাসুল (সা.)-এর সফরসঙ্গী ছিলাম। সূর্যাস্তের সময় তিনি একজনকে ডেকে বললেন, ছাতু ও পানি মিশিয়ে ইফতার পরিবেশন করো।’ (মুসলিম: ১০৯৯)।
সময় হলে বিলম্ব না করে ইফতার করা মহানবী (স.)-এর গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। এ সময় সাংসারিক কাজ বা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকা সুন্নাত পরিপন্থী কাজ। সারাদিন রোজা রেখে ইফতার সামনে নিয়ে অপেক্ষা করাও সুন্নত। হজরত সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘যতদিন মানুষ অনতিবিলম্বে ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের মধ্যে থাকবে।’ (সহিহ বুখারি: ১৮২১; সহিহ মুসলিম: ১৮৩৮) অন্য হাদিসে নবী করিম (স.) বলেছেন, ‘দ্বীন ততদিন পর্যন্ত ঠিক থাকবে, যতদিন পর্যন্ত মানুষ তাড়াতাড়ি ইফতার করবে। কেননা, ইহুদি-খ্রিস্টানরা বিলম্বে ইফতার করে’ (আবু দাউদ: ২৩৫৫)। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রোজা পালনকালে রসুল সা. মাগরিব ও ইফতার দ্রুত করতেন।’ (মুসলিম, হাদিস: ১০৯৯)। সুতরাং যতটুকু ইফতার করলে তাৎক্ষণিক ক্ষুধা নিবারণ হয়, তা খেয়ে নামাজ পড়ে নেওয়া উত্তম। পরে নামাজ থেকে ফিরে এসে চাহিদামতো আরও খাদ্য গ্রহণ করা যেতে পারে।
ইফতার বা সেহেরিতে অতিরিক্ত খাওয়া বা উদরপূর্তি করে খাওয়া জরুরি নয়। এতে ইবাদতে আলস্য আসতে পারে। পেট খারাপ হওয়ার আশঙ্কা আছে। একইসঙ্গে খেয়ালের ভুলে অপচয় হয়ে যেতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘পানাহার করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ: ৩১)।
মিকদাম ইবন মাদিকারাব (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুল (স.)-কে বলতে শুনেছি, পেটের চেয়ে মন্দ কোনো পাত্র মানুষ ভরাট করে না। পিঠের দাঁড়া সোজা রাখার মতো কয়েক লোকমা খাবারই আদম সন্তানের জন্য যথেষ্ট। আর বেশি খাবার ছাড়া যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য আর বাকি তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য রাখবে।’ (তিরমিজি: ২৩৮৩)
উপরোক্ত হাদিসে পরিমিত খাবারের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। কারণ অপরিমিত খাবার মানুষকে দুর্বল করে ফেলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের ৮০ শতাংশ রোগব্যাধি খাবারের কারণেই হয়ে থাকে। এছাড়া সেহরির সময় শুধু খাওয়ার জন্য নয় বরং আল্লাহর দিকে বিশেষভাবে মনোনিবেশের জন্যও। আল কুরআনে মুমিনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হয়েছে, যা দ্বারা সেহরি সময়ের ফজিলত স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। বলা হয়েছে, ‘মুত্তাকি তারা, যারা রাতে কম ঘুমায় ও সেহরির সময় ক্ষমা প্রার্থনা করে।’ (সুরা যারিয়াত, আয়াত নং-১৮)।
নানা পুষ্টিগুণে ভরপুর খেজুরের পর মহানবী সা. পছন্দ করতেন দুধকে। এ বিষয়ে তিনি বলেছেন, তোমরা গোশত কম খাও গরুর দুধ বেশি খাও। বর্তমানে মেডিক্যাল সাইন্স রেড মিটের অপকারিতা আমাদের যা বলছে তা হাজার বছর আগেই নবীজি (সা.) আমাদের বলে গেছেন। মহানবী (সা.) সাধারণত যে খাবারগুলো খেতেন, তা ইমাম তিরমিজি (রহ.) শামায়েলে তিরমিজি গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। সেগুলো হলো—বার্লির রুটি, মুরগি, মরুর বিশেষ পাখি, জয়তুন, ভুনা মাংস, মাংসের ঝোলে রুটি মেশানো বিশেষ খাবার সারিদ, দুধ, ভাজা গম ও বার্লি, ঘি মাখা খেজুর, কিশমিশ, শসা, ময়দার নাশতা, জমজমের পানি, তরমুজ, খাসির রান, পিঠের মাংস, সিরকা, লাউ, মিষ্টি, মধু, ছাতু, মরিচ, মসলা, ঠান্ডা মিষ্টি পানীয় ইত্যাদি। এসব নিয়মিত খাবারই তিনি রমজানেও খেতেন। তবে খেজুর দিয়ে সেহ‌রি ও ইফতার করা তিনি পছন্দ করতেন।
রোজাদারদের সংবর্ধিত করতে জান্নাতে থাকবে একটি বিশেষ গেট। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘জান্নাতে রাইয়ান নামে একটি দরজা আছে। ওই দরজা দিয়ে কেবল রোজাদাররাই প্রবেশ করবে। ঘোষণা করা হবে, রোজাদাররা কোথায়?
তখন তারা উঠে দাঁড়ালে তাদের জান্নাতে প্রবেশ করতে বলা হবে। তারা প্রবেশ করার পর ওই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং তা দিয়ে আর কেউ প্রবেশ করতে পারবে না।’ (সহিহ বুখারি)।
রাসুল সা. প্রতিটি কাজই মুসলমানদের জীবেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যেসব কাজ করতেন তাই আল্লাহতায়ালা সুন্নত করে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলার আদেশ মতে, যে রসুল সা.-এর আদর্শকে জীবনে বাস্তবায়িত করতে পারবে সেই হবে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলকাম। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে সুন্নাহ অনুযায়ী ইফতার ও সেহেরি খাওয়ার তওফিক দান করুন।

লেখক : মুহাম্মদ মোরশেদ আলম, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাংবাদিক

পূর্বকোণ/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট