
চট্টগ্রামে ২০২৩ সালে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল বিগত বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে পরবর্তী ২০২৪ সালে এসে রোগীর সংখ্যা প্রায় ৭০ শতাংশ কমে আসে। কিন্তু মৃত্যুর চিত্র ছিল চোখে পড়ার মতো। সদ্যবিদায়ী ২০২৫ সালে মৃত্যুর চিত্র আগের বছরের তুলনায় স্বস্তিকর হলেও হাসপাতালে রোগীর চাপ ছিল উদ্বেগজনক। যা আগের বছরের তুলনায় সাড়ে ১২ শতাংশ বেশি।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষাকালীন ও পরবর্তী মাসগুলোতে সবচেয়ে বেশি রোগী আক্রান্ত হয়েছিল। এছাড়া মৃত্যুর সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে জুলাই থেকে নভেম্বর-এই চার মাস আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার ছিল সবচেয়ে বেশি।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলেন, ২০২৪ সালে রোগী তুলনামূলক কম হলেও অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে হাসপাতালে আসা ও অন্য রোগের জটিলতায় মৃত্যুর কারণ হয়েছিল। ২০২৫ সালে সে প্রবণতা কিছুটা কম ছিল।
বছরশেষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন মোট ৪ হাজার ৮৬৪ জন। যা ২০২৪ সালের ৪ হাজার ৩২৩ জনের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। মৃত্যুহার অবশ্য কমেছে। ২০২৪ সালে ৪৫ জন মৃত্যুবরণ করলেও ২০২৫ সালে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭ জনে।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালে মোট আক্রান্ত রোগীর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫২৯ জন, নারী ১ হাজার ৪৩৯ জন এবং শিশু ছিল ৮৯৬ জন। মোট মৃত্যু হওয়া ২৭ জনের মধ্যে ১৫ জন ছিলেন প্রাপ্তবয়ষ্ক পুরুষ, ৭ জন নারী এবং ৫ জন শিশু। রোগীর চিত্রও ছিল উদ্বেগজনক। বেশিরভাগ রোগী ছিল ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী। যারা ডেঙ্গুর প্রাথমিক উপসর্গকে তুচ্ছ মনে করে দেরিতে চিকিৎসা নিয়েছেন। শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে জটিলতা বেশি ছিল।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ২০২৫ সালে মৃত্যুহার কমে যাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ছিল। তবে সংক্রমণ আগের বছরের তুলনায় কিছু বেশি ছিল এবং বর্ষা-পরবর্তী মাসগুলোতে হাসপাতালের চাপ সবচেয়ে বেশি ছিল। রোগীদের সময়মতো হাসপাতালে আসা ও চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। এছাড়া মশক নিয়ন্ত্রণ, পানি জমা রোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করার ওপর আমাদের জোর দিতে হবে।
ঝুঁকির মাস জুলাই-নভেম্বর : ডেঙ্গুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি ছিল জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত। এই সময় রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং হাসপাতালে চাপও তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়। জুলাইতে ৪৩০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, আগস্টে ৭০৫ জন, সেপ্টেম্বরে ৯৩৫ জন, অক্টোবরে ৯৯০ জন এবং নভেম্বরে ১ হাজার ৭ জন। মৃত্যুর সংখ্যাও অন্য মাসের তুলনায় এই সময়ে বেশি ছিল। জুলাই মাসে ৭ জন, আগস্টে ৬ জন, সেপ্টেম্বর ৪, অক্টোবর ১ এবং নভেম্বরে ৬ জনের মৃত্যু হয়।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আবুল ফয়সাল মো. নুরুদ্দিন চৌধুরী বলেন, ২০২৫ সালে মৃত্যুহার কমে আসার কারণ হলো রোগীরা আগের বছরের তুলনায় দ্রæত হাসপাতালে পৌঁছেছে। চিকিৎসা ব্যবস্থা কিছুটা উন্নত হয়েছে। তবে এটিকে আত্মতুষ্টির জায়গা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং সংক্রমণ এখনও অব্যাহত। বর্ষা মৌসুমে রোগীরা প্রায়শই ঘরে বসে চিকিৎসা শুরু করে, যা ঝুঁকি বাড়ায়। তাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, বিশেষ করে মশক নিয়ন্ত্রণ ও পানি জমা রোধ, অপরিহার্য।
গ্রামে-নগরে রোগী সমান, সর্বোচ্চ সীতাকুণ্ডে : ২০২৫ সালে ডেঙ্গুর সংক্রমণ গ্রামের তুলনায় নগর এলাকায় অল্প বেশি হলেও দুইদিকে রোগীর হার প্রায় সমান। মহানগর এলাকায় রোগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৬৫৭ জন এবং উপজেলায় ছিল ২ হাজার ২০৭ জন।
উপজেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সর্বাধিক রোগী ছিল সীতাকুণ্ডে। যেখানে ৯৬২ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। এরপর বাঁশখালী ২২১, লোহাগাড়ায় ১৪৮ এবং কর্ণফুলীতে ১৬৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। অন্য উপজেলাগুলোর মধ্যে সাতকানিয়া, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, পটিয়া, বোয়ালখালী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, মিরসরাই এবং স›দ্বীপে মোট ৯৫৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
ডেঙ্গু ঝুঁকি বাড়ার শঙ্কা গ্রামাঞ্চলেও: এক সময়ে ডেঙ্গুকে ‘শহুরে রোগ’ বলা হলেও ধীরে ধীরে গ্রামাঞ্চলেও এর প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, কয়েক বছরের ব্যবধানে এর ভয়াবহ বিস্তার করতে পারে গ্রামীণ জনপদে। তাই এখনই সতর্কতা অবলম্বন না করলে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে নিয়মিত মশা নিধন কার্যক্রম নেই। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কোনো সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। ফলে ভবিষ্যতে গ্রামে গ্রামে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরও বাড়বে।
পূর্বকোণ/ইবনুর