
পিতা-মাতার প্রতি অভিযোগ জানিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির মানবিক বিভাগে অধ্যায়নরত আতিয়া ইবনাত চৌধুরী জয়িতা (১৯)।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) বিকাল ৫টার দিকে উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড উত্তর বাজালিয়া গ্রামের নিজ কক্ষের একটি গাছের সঙ্গে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। পরে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। এসময় জয়িতার শয়ন কক্ষের একটি ব্যাগ ও সার্টিফিকেটের ফাইল থেকে মা-বাবার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখা একাধিক চিঠি উদ্ধার করা হয়। চিঠিগুলো দেখে ধারণা করা হচ্ছে সেগুলো বেশ কিছুদিন আগে লিখেছিল জয়িতা।
তার শয়ন কক্ষ থেকে উদ্ধারকৃত চিঠিগুলোতে জয়িতা লিখেন, আমার মা-বাবার বিচ্ছেদের কিছুদিন পর থেকে আমার মায়ের আমার প্রতি অসস্তুষ্টি দেখা দেয়। প্রায়শ অশ্লীল গালাগালি ও মারধর। ঘরের অধিকাংশ কাজ সেরে বসে থাকলেও অসন্তুষ্টি। কোনো ছোটখাটো দোষেই বাবাকে নিয়ে। পরপুরুষ নিয়ে আমার নামে খারাপ কথা বলে এবং আমাকে গালাগালি করে। উঠতে বসতে শুধু অশ্লীল কথা। বাবাকে যদি যখন এসবের কথা বলি বাবা বিশ্বাস করে না। বান্ধবীদের বললে তারা বিশ্বাস করে। কেননা এসব কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তারজন্য মায়ের যেসব অশ্লীল গালিগালাজ আমি ২ বছর ধরে রেকর্ডিং করতে থাকি।
তিনি আরও লিখেন, রেকর্ডিং এর ব্যাপারে জানতে পারলে মেমোরি কার্ড নিয়ে ফেলে এবং আমার ভাই ও মা মোবাইল ভেঙ্গে ফেলে। তারপর থেকে এসব অশ্লীল গালিগালাজ আমি রেকর্ডিং এর বদলে খাতায় লিখতে থাকি। তখন মা সবাইকে জানিয়ে দেয় আমি ছেলেদের সঙ্গে কথা বলছি তাই মোবাইল ভেঙেছে। অবশেষে একদিন লুকাতে না পারা খাতাগুলো পায় এবং পুড়িয়ে ফেলে। এ ছাড়াও গালিগালাজ ও মারধর করে। তার প্রত্যেক গালিগালাজ ছিল ধর্মবিরোধী। একদিন সকালে অসুস্থ বোধ করায় উঠতে না চাওয়ায় আমাকে জোর করে ইচ্ছামত কাজ করায়। আমাকে বলে আমি মায়ের কামাই খাচ্ছি। মায়ের স্বামীর ভাগ খুঁজছি। সেই সাথে সে বাবাকে দিয়ে ধর্ষণের হুমকিও দেয়। এসব কথা আমি জনগণকে বলে দিবে বললে, আমি হুমকি দিচ্ছি বলে আমাকে মারতে থাকে৷ কোনদিন তার বদনাম করতে দেখিনি। তবে সে যে আমার সাথে এমন করে তা বান্ধবীদের বলি ও সে তা আচঁ করতে পারে এবং অপবাদ দেয় প্রেম করি। সেটা পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজন সবাইকে বলে। আমি যদি প্রেম করতাম তাহলে আইনের সাহায্য তো চাইতাম না। অপর একটি চিঠিতে বাবার কাছে কেন যাচ্ছি না শিরোনামে জয়িতা লিখেন, মা আমার বাবাকে আমার নামে যা বলে তা বাবা শুনে। তবে আমি কিছু বলতে চাইলে কখনো কখনো মারধর করে কিছু বলতে দেয় না। বাবাকে একবার আমি লজ্জা ভেঙে এসব বলেছিলাম। বাবা বলে মায়ের অভিশাপ নিচ্ছিস। মায়ের কথা ধরে বাবা আমাকে মারে, তবে তা ব্যাপার না। বাবা তো এমনিই খারাপ।
তিনি লিখেন, পৃথিবী আমার জন্য নিরাপদ নই। আমার থেকে চুরি করে কিছু খেতে হবে না। আমি মোবাইল নিলে বকা দিতে হবে না। আমার ভাগের খাবারগুলো তোমরা খাও। আমার ধর্ম পবিত্র, তোমাদের ধর্ম অপবিত্র। আমার টাকাগুলো তোমাদের রুহতে থাক। আমি কাউকে ভুলে যায় না। আমাকে বাঁচতে দাও। আমার বিড়াল কষ্ট পাবে, বাঁচবে না, তো আমিও মরব। সৃষ্টিকর্তা আমার পাশে থাকুন, আমাকে ক্ষমা করুন।
জয়িতা উত্তর বাজালিয়া গ্রামের আবু বোরহান মো. জাহাঙ্গীর চৌধুরীর কন্যা। তার মায়ের নাম জান্নাতুল ফেরদৌসী। ২০১৮ সালে তার মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়। তখন জয়িতা চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। এরপর থেকে তিনি লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ এলাকায় তার মায়ের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। ২০২৪ সালে তিনি এসএসসি পাস করেন। তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তার বাবা তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেখানে তার সৎমা সাকিলা সুলতানা পুষ্প ও এক শিশু সৎবোনসহ একসঙ্গে থাকতেন তিনি।
জয়িতার বাবা আবু বোরহান মো. জাহাঙ্গীর চৌধুরী বলেন, আমি আসরের নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম। এরপর আমার স্ত্রীর ফোন পেয়ে বাড়িতে এসে দেখি আমার মেয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। করে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে মৃত ঘোষণা করেন। আমার মেয়ে দীর্ঘদিন তার মায়ের সাথে ছিল। কয়েক মাস আগে তাকে আমি নিয়ে এসেছি। সে এখানে থেকে পড়ালেখা এবং কোচিং করত। কিন্তু হঠাৎ করে কেন আত্মহত্যা করেছে কিছুই বলতে পারছি না। তবে আমার সংসারে কিছুটা অভাব-অনটন ছিল।তার মায়ের কাছে থাকা অবস্থায় সে জয়িতাকে নির্যাতন করতো।
জয়িতার মা জান্নাতুল ফেরদৌসী বলেন, আমার মেয়ে জয়িতা কোন ধরনের আত্মহত্যা করে নাই,তাকে তার পিতা ও ২য় স্ত্রী মিলে প্রচন্ড অত্যাচার করে খুন করে একটি ঘরের গাছের ভিমের সাথে ঝুলিয়ে দিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাঁজিয়েছে। আমার স্বামী আমাকে না জানিয়ে নতুন বিয়ে করেছিল,অথচ আমাকে ডির্ভোস পর্যন্ত দেয় নাই যেটার মামলা আদালতে এখনো চলমান এবং সেটার স্বাক্ষী আমার মেয়ে চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় আতিয়া ইবনাত চৌধুরী জয়িতা (১৯)। আমি লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া এলাকায় একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কাজ করি।আমার মেয়ের প্রতিটি অভাব মিটিয়ে আমি সবসময় তাকে হাসি খুশি রেখেছি । কিন্ত ২০২৫ সালের ডিসেম্বের ৫’তারিখ সে তার বাবার কাছে আসে বাজালিয়া এলাকায়। এরপর থেকে তার উপর অত্যাচার শুরু করে তার সৎ মা ও তার নিজের বাবা। কেন তার বাবার বিরুদ্ধে মামলার স্বাক্ষী হয়েছে আর তাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতেই হত্যা করে ঘরের গাছের সাথে ঝুলিয়ে দিয়েছে।
সাতকানিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি আত্মহত্যা। ভিকটিমের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। তার শয়ন কক্ষ থেকে উদ্ধারকৃত চিঠিগুলো কখন লেখা হয়েছে এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনার মূল রহস্য বেরিয়ে আসবে।
পূর্বকোণ/পিআর