
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার বনাঞ্চলে প্রাকৃতিক পরিবেশে উৎপাদন হচ্ছে নানা প্রজাতির মূল্যবান বাঁশ। পরিবেশবান্ধব এসব বাঁশের মধ্যে মুলি বাঁশ, ডলু বাঁশ, মিতিঙ্গ্যা বাঁশ, কালিছুরি বাঁশ, ফারুয়া বাঁশ, বাইজ্জা বাঁশ, বেথুয়া বাঁশ ও বরাক বাঁশ অন্যতম। তাছাড়াও নাম না জানা আরও বহু প্রজাতির বাঁশ উৎপাদন হয় পাহাড়ের বনাঞ্চলে। তবে এ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় মুলি বাঁশ। বনাঞ্চলের পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাসা বাড়ির আঙ্গিনায়ও মুলি বাঁশের অস্তিত্ব দেখা যায়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, গৃহ নির্মাণ এবং হস্তশিল্পসহ দৈনন্দিন নানা কাজে এসব বাঁশের গুরুত্ব অপরিসীম। তাছাড়াও প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠা বনাঞ্চলের নানা প্রজাতির এই মূল্যবান বাঁশ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন উপজেলার অসংখ্য মানুষ। শুধু তাই নয় সবজি হিসাবেও কচি বাঁশের ডগা (কোড়ল) এ অঞ্চলের মানুষের প্রিয় খাবার। দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে বনাঞ্চলের এই মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। তারপরও গুরুত্বপূর্ণ এই প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে নেই সুদূর প্রসারি কোনো পরিকল্পনা কিংবা উদ্যোগ। যার ফলে পরিবেশ বিনাশী সনাতন পদ্ধতির জুমচাষ, সবজি হিসাবে কচি বাঁশের ডগা নিধন এবং বাণিজ্যিক ফলজ বাগান সৃজনসহ নানা অজুহাতে উজাড় করা হচ্ছে পাহাড়ের এই প্রাকৃতিক বাঁশ বন। এ ক্ষেত্রে স্থানীয়দের অসচেতনতা এবং উদাসীনতা অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করছেন সচেতন মহলের অনেকে। পরিবেশবাদীদের মতে পাহাড়ের পরিবেশের জন্য বাঁশ অত্যন্ত উপকারী একটি প্রাকৃতিক উদ্ভিদ। কারণ বাঁশ প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষন করে এবং অক্সিজেন সরবরাহের মাধ্যমে বায়ুমন্ডলের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, বাঁশ দ্রুত বর্ধনশীল, নবায়নযোগ্য ও টেকসই একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। যা পাহাড়ের মাটি ক্ষয়রোধ, পানির উৎস সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বনাঞ্চলের এই প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে সঠিক পরিকল্পনা এবং উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। স্থানীয় বন বিভাগের তথ্যমতে উপজেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সরকার সংরক্ষিত বনাঞ্চলে দুটি বাঁশকূপ রয়েছে। নাড়াইছড়ি রেঞ্জের আওতাধীন এই বাঁশকূপ থেকে প্রতি বছর নানা প্রজাতির বাঁশ আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন এ অঞ্চলের হাজারো মানুষ। সরকার নির্ধারিত রাজস্ব পরিশোধের মাধ্যমে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর এ দুটি কূপ থেকে কয়েক লাখ বাঁশ আহরণ করেন বলে জানা যায়। নাড়াইছড়ি থেকে নদীপথে বাবুছড়া এবং বাবুছড়া থেকে সড়ক পথে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয় এই প্রাকৃতিক সম্পদ। এ কাজে কাটার, চালি বাহক ও গাড়ি লোডিংসহ সহস্রাধিক শ্রমিক এই বাঁশ শিল্পের সাথে সম্পৃক্ত বলে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়।
এক সময় কাঁচামাল হিসাবে এ দুটি বাঁশকূপ থেকে নদীপথে বাঁশ আহরণ করে চন্দ্রঘোনা পেপার মিলে সরবরাহ করা হতো বলে এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে। এদিকে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সবজি হিসাবে বাঁশ কোড়লের ব্যবহার। এক সময় বাঁশ কোড়ল পাহাড়ের মানুষের প্রিয় খাবার হিসাবে পরিচিতি থাকলেও বর্তমানে পর্যটক এবং সমতলের মানুষের সুস্বাদু খাবারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে পাহাড়ের এই বাঁশ কোড়ল। তাই চাহিদা পূরণ করতে আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে কচি বাঁশের ডগা নিধনযজ্ঞ। স্থানীয় হাট-বাজারে প্রতি কেজি বাঁশ কোড়ল বিক্রি হয় ৪০ থেকে ৫০ টাকা মূল্যে। সবজি হিসাবে বাঁশ কোড়ল ব্যবহারের কারণে বাঁশের বংশ বিস্তার রোধের পাশাপাশি সরকার মোটা অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাই বনাঞ্চলের এই মূল্যবান প্রাকৃতিক বাঁশ বন সংরক্ষণের পাশাপাশি পরিবেশের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় ব্যক্তি মালিকানাধীন বাঁশ বাগান সৃজনে জনসচেতনতা সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল ।
পূর্বকোণ/পিআর