
রাঙামাটি জেলাধীন ১০ উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় প্রায় প্রতিটি পরিবারের কৃষিকাজে সম্পৃক্ত সদস্যরা কলা চাষে যুক্ত আছেন সেই দীর্ঘকাল ধরে। কেউ একক বাগান করছেন, কেউ অন্যান্য ফসলের সঙ্গে কলার চাষ করছেন। কৃষকদের কথা হলো, রাঙামাটির মাটি ও আবহাওয়া কলা চাষের জন্য আদর্শ। পরিচর্যা কম লাগে, কীটনাশকও কম ব্যবহার হয়। তাই দিন দিন কৃষকরা কলা চাষে ঝুঁকছেন।
সবুজে মোড়ানো পাহাড়ের বুক জুড়ে সাজানো কলাবাগান। পাহাড়ে ১২ মাস কলা চাষ হয় বলে সব মৌসুমে এখানে কলা পাওয়া যায়। এ অঞ্চলের পাহাড়ি ঢালুতে দেখা যায় কলা গাছের সবুজ পাতার আড়ালে ঝুলে আছে কাঁচা-পাকা কলার ছড়া।
রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, বিগত ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় মোট ১১ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে কলা চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টর জমিতে বছরে প্রায় ৩০ মেট্রিক টন কলা উৎপাদিত হয়। পুরো জেলায় প্রতিবছর ২ লাখ ৭৩ হাজার ৯ শত ৫২ মেট্রিক টন কলা উৎপাদন হয়। এর বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ৪ শত ৫০ কোটি টাকা।
রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখানে বাংলা কলা, চাঁপা কলা, সাগর কলা, সূর্যমুখী ও আনাজি জাতের কলা বেশি চাষ হচ্ছে। তবে ‘বাংলা কলা’র চাহিদা বেশি। নানিয়ারচর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি কলা চাষ হয়। নানিয়ারচর উপজেলায় ২৩২৫ হেক্টরে মোট ৫১৪৯৯ মেট্রিকটন কলা উৎপাদন হয় বছরে। এরপরে রাঙামাটি সদরে ৯৫৫ হেক্টরে ২১৭৭৪ মেট্রিকটন, বরকল উপজেলায় ২০১৫ হেক্টরে ৪৫৩৩৮ মেট্রিকটন, কাউখালীতে ১৫৫৫ হেক্টরে ৩৫২৯৯ মেট্রিকটন, জুরাছড়িতে ১১০০ হেক্টরে ২৭৫০০ মেট্রিকটন, লংগদুতে ১১২৫ হেক্টরে ২৮১২৫ মেট্রিকটন, বাঘাইছড়িতে ১২১৫ হেক্টরে ২৭৯৪৫ মেট্রিকটন, কাপ্তাই উপজেলায় ৭৮৫ হেক্টরে ১৭৬৬৩ মেট্রিকটন, রাজস্থলীতে ৬৬০ হেক্টরে ১৪৭৮৪ মেট্রিকটন এবং বিলাইছড়িতে ১৭৫ হেক্টরে ৪০২৫ মেট্রিকটন।
এ এলাকায় কলা আবাদে কীটনাশক ব্যবহার হয় না বললেই চলে। কলা এমনিতেই পুষ্টিসমৃদ্ধ ফল। তার ওপর বালাইনাশক ব্যবহার না হওয়ায় এ এলাকার কলা পুষ্টিগুণে পরিপূর্ণ। সারাবছর এসব কলার ফলন পাওয়া গেলেও আগস্ট থেকে অক্টোবর মাসে ফলন মেলে সবচেয়ে বেশি।
রাঙামাটি সদরের বন্দুভাঙ্গা ইউনিয়নের কলাচাষি শান্তিময় চাকমা পূর্বকোণকে বলেন, তিনি পাঁচ একর জমিতে চার হাজার কলাগাছ লাগিয়েছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় এক লাখ টাকার কলা বিক্রি করেছেন। আগামী কয়েক মাসে আরও দু–তিন লাখ টাকার কলা বিক্রি করতে পারবেন বলে তাঁর আশা। নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে পাহাড়ে উৎপাদিত কলা যাচ্ছে চট্টগ্রামসহ সমতলের বিভিন্ন জেলায়। এখানে সাপ্তাহিক হাটের দিন বেচাকেনা হয় লাখ লাখ টাকার কলা।
রাঙামাটি সদরের সমতা ঘাট, ট্রাক টার্মিনাল এবং রাঙামাটি জেলাধীন বিভিন্ন উপজেলা বাজার থেকে স্থানীয় পাইকারদের হাত ধরে এসব পাহাড়ি কলা ট্রাক ও পিকআপে বোঝাই করে ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরে নিয়ে যান পাইকারি ব্যবসায়ীরা।
ঢাকা থেকে আসা ব্যবসায়ীরা জানান, রাঙামাটির পাহাড়ি কলা মান ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। এ কারণে চাহিদাও বেশি। তাই প্রতি দিন-সপ্তাহে রাঙামাটি থেকে ট্রাকে ট্রাকে কলা বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যাওয়া হয়।
সময়ের সাথে সাথে ‘পাহাড়ে কলা চাষে অর্থনেতিক স্বচ্ছলতার পথে হাঁটছে চাষিরা’। দশটি উপজেলা নিয়ে গঠিত বিশাল রাঙামাটি জেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত জনপদ থেকে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে বিপুল পরিমাণ কলা বিক্রি হয় রাঙামাটির বিভিন্ন হাট বাজারে।
তথ্য অনুযায়ী, কলা কৃষিপণ্য হলেও কৃষি বিভাগের কোনো সরাসরি ভ‚মিকা নেই। চাষিদের সরকারি সহায়তা বা প্রণোদনা নেই। তবে নিজেদের উদ্যোগে কর্মকর্তা পর্যায়ে কৃষকদের পরামর্শ দেয়া হয়। রাঙামাটি জেলা অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) অরুন চন্দ্র রায় পূর্বকোণ’কে বলেন, আমাদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে থাকে। তিনি জানান, কোন কোন সময় সিগাটোগ নামে কলার একটি রোগ নিরাময় সম্পর্কেও পরামর্শ দেয়া হয়।
পূর্বকোণ/ইবনুর