
ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার কলসিন্দুর বাংলাদেশের নারী ফুটবলের অন্যতম ‘আতুরঘর’ হিসাবেই পরিচিত। যেখান থেকে উঠে এসেছেন মারিয়া মান্দা, সানজিদা আক্তার, তহুরা খাতুনসহ সাফজয়ী বহু তারকা। তাদের অনেকেই এখনও ফুটবল মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তবে নারী ফুটবলে ‘আতুরঘর’ এখন যতটা কলসিন্দুর তারচেয়ে ঢের বেশি অবদান রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির। পার্বত্য এই দুটি জেলায় নারী ক্রীড়ায় অপার সম্ভাবনা থাকলেও অবকাঠামোগত দুর্বলতা, পরিকল্পনার অভাব, লিগ/টুর্নামেন্ট না থাকায় ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন ক্রীড়াবোদ্ধারা।
বর্তমানে দেশের নারী ফুটবলে পথিকৃত রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়। জাতীয় নারী ফুটবল দলের নিয়মিত সদস্য রূপনা চাকমা, ঋতুপর্ণা চাকমা (বেগম রোকেয়া পদকপ্রাপ্ত), মনিকা চাকমা, আনাই মগিনি (অবসর) ও আনুচিং মগিনি (অবসর) বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী ছিলেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চন্দ্রা দেওয়ান, কোচ শান্তি মনি চাকমা বাধা বিপত্তির সাথে লড়াই করে কাজ করে যাচ্ছেন উন্নত আগামীর। আলোচনায় আসবে একই উপজেলার সুইহলামং ফুটবল একাডেমির কথাও। সুইহলামং মারমার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই একাডেমি নারী ও পুরুষ উভয় বিভাগে তরুণ ফুটবলার তৈরিতে কাজ করছে।
পিছিয়ে নেই খাগড়াছড়িও। জেলাটিতে ফুটবলের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে খাগড়াছড়ি ফুটবল একাডেমি। আবাসিক সুযোগ সুবিধা নিয়ে একডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও খাগড়াছড়ি জেলা ক্রীড়া সংস্থার এডহক কমিটির সদস্য জ্যোতিষ বসু ত্রিপুরা প্রতিক‚লতার পাহাড় ডিঙ্গিয়ে উপহার দিচ্ছেন নারী ফুটবলে সুন্দর আগামী। ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালনা করছেন একাডেমির দুটি শাখা (প্রায় ৩০ জন)। যেখানে ঠাকুরছড়া উচ্চবিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় ফুটবলাররা পাচ্ছেন আবাসিক সুবিধাও। এই একাডেমি থেকে ঢাকায় খেলছেন ৫ জন, নারী জাতীয় দলসহ বয়সভিত্তিক দলেও আছেন অনেকে। নারী ফুটবলে এই উন্নয়নযজ্ঞে যুক্ত হয়েছেন জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার এডহক কমিটির সদস্য সচিব হারুন অর রশিদ ২০২৪’র শেষদিকে দায়িত্ব গ্রহণের পর ক্রীড়া গতিকে আরও বেগবান করার চেষ্টা করছেন। দুটি জেলাতেই নারী ফুটবলসহ খেলাধুলায় ভুমিকা রাখছে পার্বত্য জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনসহ সেনা রিজিওন। বিস্ময়কর হলেও সত্য খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যক্রম উল্লেখ করার মতো নয়। ২০২৪ সালের শেষ দিকে কমিটি ভেঙ্গে দেয়ার পর জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার কোন এডহক কমিটিও গঠিত হয়নি। এছাড়া জাতীয় পর্যায়ের দু’একটি আয়োজন ছাড়া কোন কার্যক্রমের তথ্যও পাওয়া যায়নি। বাফুফে কিংবা বিসিবি, দেশের অন্যতম দুটি ফেডারেশনের সাথে অন্য কোন ফেডারেশনেরও পরিকল্পিত কোন উদ্যোগ কিংবা পরিচর্যার উদ্যোগ নজরে পড়েনি।
১৭ থেকে ১৯ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি অবস্থানকালে দেখা গেছে ফুটবল ও ক্রিকেটে মেয়েরা নিয়ম মেনে অনুশীলন করছে। ক্রিকেটে সংখ্যাটা কম হলেও জেলা দুটির মেয়েরা খেলছে ঢাকা লিগেও। ফুটবলে চর্চা যেমন বেশি তেমনই শুধু ঢাকা লিগই নয় নারী জাতীয় দলের বর্তমান অবস্থানসহ পাইপলাইনও বেশ সমৃদ্ধ করে চলেছে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি। সংখ্যাটা আরও বাড়তে পারতো, যদি কিনা জেলা দুটিতে নারী ক্রীড়ায় নিয়মিত টুর্নামেন্ট হতো।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের মুখ্য সচিব মো. নোমান হোসেন বলেন, জেলার মেয়েরা ক্রীড়াঙ্গনে দারুণ সাফল্য বয়ে আনছে। তাদের মাঝে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। এই পথে দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা ও দারিদ্রতাই অন্যতম বাধা। জেলা পরিষদ চেষ্টা করছে আর্থিক সহযোগিতাসহ সম্ভাব্য সকলরকমভাবে প্রতিভাবান নারী ফুটবলারদের তুলে আনার। সম্ভাব্য ক্ষেত্রে খÐকালীন চাকরি দিয়েও সহযোগিতার চেষ্টা করছে জেলা পরিষদ। এক্ষেত্রে তিনি উদাহরণ হিসাবে সামনে আনলেন সাবেক ফুটবলার আনাই মগিনির কথা (বর্তমানে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদে কর্মরত)।
খাগড়াছড়িতে প্রত্যন্ত এলাকার মেয়েরাও দারুণ ফুটবল উপহার দেয়। স্কুল, কলেজ কিংবা পাড়া/মহল্লায়ও ভালো ফুটবল খেলা মেয়েদের তুলে আনার জন্য খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ নিয়মিতই ট্যালেন্ট হান্ট কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। তবে এ অঞ্চলে নারী ফুটবলে সাফল্য ধরে রাখতে হলে উপজেলা ভিত্তিক অবকাঠামোর দিকে নজর দেয়া জরুরি। জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসন চেষ্টা করছে, কিন্তু বাজেট সীমিত থাকায় আগ্রহ থাকলেও অনেক সময় সম্ভাব্য সেরাটা দেওয়া হয়ে উঠছে না। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) যদি উপজেলা ভিত্তিক মিনি স্টেডিয়ামগুলো খেলাধুলার জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তুলে তাহলে খাগড়াছড়ির খেলাধুলার দৃশ্যপটই পাল্টে যাবে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)’র দৃষ্টি আকর্ষণ করে মো. নোমান হোসেন বলেন, বাফুফে যদি নিয়মিত কোন ক্যাম্পিংয়ের আওতায় কার্যক্রম চালায় এবং ফুটবলারদের একটি তালিকা করে তাদের সার্বিক সহযোগিতার আওতায় আনে তাহলে খেলোয়াড়রা উপকৃত হবে। একইসাথে জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনসহ যারা কাজ করছে তাদের নিয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা যায় কিনা আমি ভেবে দেখার অনুরোধ করবো। নারী ফুটবলারদের উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি ঘোষনা দিলেন, দ্রুততম সময়ে নারী ক্রীড়া ইভেন্টে টুর্নামেন্টের দেখা মিলবে খাগড়াছড়িতে।
একই আশাবাদ খাগড়াছড়ি জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার এডহক কমিটির সদস্য সচিব (যুগ্ম দায়িত্ব: রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থা) হারুন অর রশিদেরও। বলেন, অপ্রতুল অবকাঠামো নিয়ে প্রশাসনসহ ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা নিয়ে চেষ্টা করছি জেলার খেলাধুলার গতি বেগবান করতে। বছরপূর্বে দায়িত্ব নেয়ার পর বিভিন্ন ইভেন্ট নিয়মিত করতে পারলেও ক্রিকেট কিংবা ফুটবল লিগ বাজেটগত কারণে থমকে আছে। ক্লাবগুলো আগ্রহী হলেও স্পন্সরের অভাবে নারী ক্রীড়াসহ জেলার অন্যান্য খেলাধুলাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যতটুকু সাফল্য আসছে সেটার অনেকটা জুড়ে সেনা রিজিওন, পার্বত্য জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন, পৌরসভাসহ ব্যক্তিগত পর্যায়ের কিছু অবদানে। নারী ফুটবলে জেলাটির অবদানের জন্য তিনি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মেয়েদের সাহসী পথচলা, দারিদ্রতাকে জয় করার তাড়না ও একজন আনাই মগিনি ও আনুচিং মগিনি কিংবা মনিকা চাকমা হওয়ার সুপ্ত বাসনাও কাজ করে। সে পথে কিছু একাডেমি স্বপ্ন দেখাচ্ছে তাদের। নিয়মিত টুর্নামেন্ট হলে স্বপ্ন নিশ্চিতভাবেই বাস্তবায়িত হবে। চেষ্টা করছি, জানুয়ারির শেষ কিংবা ফেব্রæয়ারির শুরুতে আমরা নারীদের একটি টুর্নামেন্ট মাঠে নামানোর।
রাঙামাটির নারী ক্রীড়ার হালচাল ঘুরে দেখতে গিয়ে কথা হয় রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুদ্দীন মুহাম্মদ শিবলী নোমানের সাথে। ক্রীড়া অন্তঃপ্রাণ বিচক্ষণ এই কর্মকর্তা ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে জানান, পাহাড়ি এই অঞ্চলে খেলাধুলার পরিবেশ দুর্দান্ত। প্রাকৃতিক কারণে শিশুকাল থেকেই পরিশ্রমী সকলেই মানসিকতায় দারুণ উদার, তাদের ফিটনেসও ভালো। জেলা পরিষদ নিয়মিতভাবেই প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের সহযোগিতা করছে। রূপনা চাকমা, ঋতুপর্ণা চাকমা (বেগম রোকেয়া পদকপ্রাপ্ত), মনিকা চাকমা তাদের সাফল্যে সংবর্ধনা ও আর্থিক সহযোগিতাও করেছে জেলা পরিষদ। ঋতুপর্ণা চাকমাদের বাড়িতে যাওয়ার রাস্তার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তার বাড়ির ব্যাপারেও কাজ করছে জেলা পরিষদ। ভবিষ্যত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো নিয়মিত ক্যাম্প আয়োজনসহ স্কুল পর্যায়ে পঞ্চম শ্রেণি থেকে প্রতিভাবানদের উপর বিশেষ নজর দিলে বাংলাদেশের ফুটবলে খেলোয়াড়ের মূল পাইপলাইন হতে পারে রাঙামাটিসহ পার্বত্য জেলাগুলো। অর্থ দিয়েই সবকিছু হয় না, ফুটবলাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, স্বপ্ন দেখতে হবে। একজন ঋতুপর্ণা এমনিতেই তৈরি হয়নি। মগিনি বোনরা, রুপনা, মনিকারা কঠোর পরিশ্রম করে আজকে নিজেদের তারকা পর্যায়ে তুলে এনেছে। তাই, সংশ্লিষ্ট মেধার পরিচর্যা করতে পারে, বাফুফে বা বিসিবি মাঠে রাখতে পারে নিয়মিত টুর্নামেন্ট। মেধাবী যারা আছেন তারা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের স্বপ্নডানার সারথী করতে পারলে বাংলাদেশের ক্রীড়াক্ষেত্রই লাভবান হবে।
রাঙামাটি জেলা স্টেডিয়ামে একইসাথে অনেকগুলো ইভেন্টই চলে। সরেজমিনে দেখা গেলো, অনুশীলন করছেন জেলা কাবাড়ি দলের মেয়েরা, অনুশীলনে ছিলেন সাবেক ফুটবলার বরুণ দেওয়ান ও তার একাডেমির ছেলেমেয়েরা, জেলা ক্রিকেট কোচ মহিতোষ দেওয়ান ব্যস্ত ছিলেন জেলা অনূর্ধ্ব-১৮ ক্রিকেটারদের সাথে। একটি নতুন ক্রিকেট পিচ দেখা গেলেও বিস্ময়কর হলো সেখানে এনএসসির কোন গ্রাউন্ডস ম্যান নেই। সার্বিক বিষয়ে কথা হয় রাঙামাটি জেলা ক্রীড়া সংস্থার অফিস সচিব আব্দুল করিম লালু’র সাথে। ২০১৭ সালে দায়িত্ব নেয়া সাবেক এই ক্রিকেটার বলেন, জেলা ক্রীড়া সংস্থা ৪৩টি ক্লাবের সাথে কাজ করছে। বাজেট সংক্রান্ত কারণে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও সবাই মিলে খেলাধুলার গতিকে আমরা ধরে রাখার চেষ্টা করছি। জেলায় নারী ফুটবলে সিনিয়র কোন দল না থাকলেও অনূর্ধ্ব-১৭ পর্যায়ে রয়েছে জেলা মহিলা দল। রাঙামাটি জেলা মহিলা কাবাড়ি ও হ্যান্ডবল দল জাতীয় পর্যায়ে সেরা সাফল্য এনেছে বেশ ক’বার। সঠিক পরিকল্পনা ও নিয়মিত লিগ আয়োজনে এখানকার ক্রীড়া চর্চা আরও বেগবান হবে।
পূর্বকোণ/ইবনুর