চট্টগ্রাম শনিবার, ০৩ জানুয়ারি, ২০২৬

‘সুইহলামং ফুটবল একাডেমি’ পাহাড়ে নারী ফুটবলের হাব

‘সুইহলামং ফুটবল একাডেমি’ পাহাড়ে নারী ফুটবলের হাব

হুমায়ুন কবির কিরণ (রাঙামাটি থেকে ফিরে)

৩ জানুয়ারি, ২০২৬ | ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ

রাঙামাটির পাহাড় আর সবুজের আচ্ছাদন যে কাউকেই মুগ্ধ করবে। অপার সৌন্দর্যের এই পার্বত্য জেলার কাউখালী উপজেলাকে বিশ্বপরিমণ্ডলে তুলে এনেছে নারী ফুটবলাররা। ঋতুপর্ণা, রুপনা ও মনিকা চাকমাদের ফুটবল প্রতিভা দেশের গণ্ডি পেরিয়েছে অনেক আগেই। তাদের সাফল্যে পুরো দেশের নারী ফুটবল যেমন ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে, তেমনি পাহাড়ের মেয়েদের মাঝেও রোপণ করেছে স্বপ্নবীজ। রাঙামাটির কাউখালীতে নারী ফুটবল নিয়ে অক্লান্ত কাজ করে চলেছেন সাবেক ফুটবলার সুইহলামং মারমা। জাতীয় ফুটবল দলে খেলার স্বপ্ন পূরণ না হলেও নিজের নামেই গড়া ‘সুইহলামং ফুটবল একাডেমি’র তরুণ-তরুণীদের তিনি দেখতে চান শীর্ষ পর্যায়ে। এই একাডেমি পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারী ফুটবলার তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। সুবিধাবঞ্চিত আদিবাসী মেয়েদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ও এশিয়ান কাপের মতো

 

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলছে ‘সুইহলামং ফুটবল একাডেমি’। প্রতিষ্ঠাতা কোচ সুইহলামং মারমা নিজেই প্রতিভা অন্বেষণের কাজটি করেন। রাঙামাটি ও এর আশেপাশের দুর্গম এলাকা থেকে নারী ফুটবলার খুঁজে বের করে তাদের সুশৃঙ্খল প্রশিক্ষণ প্রদান করাসহ তাদের তৈরি করার কাজটি তিনি করে চলেছেন নিরন্তর। শুধু প্রতিভা খুঁজেই কাজ শেষ করেন না কোচ সুইহলামং। খেলোয়াড়দের জন্য থাকা-খাওয়া, পড়াশোনা ও খেলাধুলাসহ যাবতীয় খরচ নিজেই বহন করেন তিনি।

 

বর্তমানে একাডেমি থেকে জাতীয় দল ও জাতীয় বয়সভিত্তিক দলে খেলছে ৬ জন। তারা হলেন উমেলা, তৃনু, মামনি চাকমা, পূর্ণিমা, থানু চিং ও হালাথুই চাকমা। সেনাবাহিনীতে চাকরি করছেন ৪ জন, বিকেএসপিতে ভর্তি হয়েছেন ৭ জন।

 

কাউখালী উপজেলা সদরের বহুতল ভবনের একটি ফ্লোরে সুইহলামং ফুটবল একাডেমির কার্যক্রম চলছে। একাডেমির তিনটি কক্ষে প্রশিক্ষণ নেওয়া নারী ফুটবলাররা থাকেন এবং একটি কক্ষে তারা পড়াশোনা করেন। এই একাডেমিক ভবন থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরত্বে কাউখালী উপজেলা মাঠ। সেখানে প্রতিদিন বিকেল ৪টা থেকে ৬টা পর্যন্ত প্রশিক্ষণ দেন সুইহলামং মারমা। শুধু মেয়েদেরই নয়, তার একাডেমিতে প্রশিক্ষণ পান ছেলেরাও। শুধু তাই নয়-বর্তমান জাতীয় নারী ফুটবল দলের তারকা ঋতুপর্ণা, রুপনা, মনিকা, আনাই (অবসর) ও আনুচিং মোগনি (অবসর)’দের কোচ হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি (২০১১-২০১৬ সালে)। এদের মধ্যে ঋতুপর্ণা, রুপনা, মনিকা চাকমাদের তুলে আনার কাজটি করেন রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার মগাইছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক বীরসেন চাকমা। তাদের ফুটবল দীক্ষার শুরু সাবেক ফুটবলার বরুণ দেওয়ান ও অরুন বিকাশ দেওয়ানদের মাধ্যমে। সুইহলামং মারমা মঘাছড়ি বিদ্যালয়ের খুদে খেলোয়াড়দের বিনা পারিশ্রমিকে ফুটবল খেলার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তার কোচিংয়ে আনাই, আনুচি, মনিকা, ঋতুপর্ণা ও রুপনাদের ফুটবলার হওয়ার প্রাথমিক যাত্রা। মঘাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন টিমেরও কোচ ছিলেন সুইহ্লামং মারমা। তাদের সহযোগিতা করেছিলেন জেলার জুড়াছড়ি উপজেলায় কর্মরত উপজেলা শিক্ষা অফিসার কৌশিক চাকমা।

 

সুইহলামং মারমা ২০০৫ সাল থেকে বাংলাদেশ আনসার ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর ফুটবল দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৮ সালে মাত্র ১৪ জন নারী খেলোয়াড় নিয়ে যাত্রা শুরু করে তার সুইহলামং ফুটবল একাডেমি। বর্তমানে এই সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৫০-এ। ফুটবলার তৈরির প্রাথমিক ধাপ হিসাবে বাফুফের অনূর্ধ্ব-১৪ নারী ফুটবল টুর্নামেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মূলত এই টুর্নামেন্টে সফলরাই এক সময় জায়গা করে নেয় জাতীয় দলে। এমনটাই জানালেন সুইহলামং মারমা।

 

একাডেমির সব খরচ নিজেই চালান। বর্তমান অবস্থায় আর্থিক সংকট থাকলেও একাডেমি পরিচালনায় শুরু থেকেই তাকে সহযোগিতা করছেন স্ত্রী, স্থানীয় অনেকেই। সহযোগিতা পাচ্ছেন জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও। সুইহলামং মারমা জানালেন, প্রতি মাসে খরচ হয় প্রায় এক লাখ টাকারও বেশি। প্রায়ই পরিচালনা ব্যয়ে হিমশিম খেতে হয়। কিশোরী-তরুণীদের স্বপ্নবুননে অর্থের কাছে হেরে যেতে চান না সুইহলামং। সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী আতিকুর রহমানের নাম বিশেষভাবে স্মরণ করে সুইহলামং যোগ করেন, একাডেমির কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন পরিচালনায় আবাসন সমস্যার সমাধান জরুরি হয়ে পড়েছে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, শুধু আমার একাডেমিই নয়, সারা দেশের একাডেমিগুলোকে স্পন্সরের আওতায় আনা গেলে দেশে নারী ফুটবলারের অভাব হবে না। এছাড়া নিয়মিত ঘরোয়া লিগ বা টুর্নামেন্টও খুব দরকার। সুইহলামং একাডেমি নিজেদের উদ্যোগে বিভিন্ন প্রীতি ম্যাচ বা টুর্নামেন্টে খেললেও সার্বিকভাবে নারী ফুটবলের উন্নয়নে জেলাভিত্তিক টুর্নামেন্ট ও আন্তঃ স্কুল/কলেজ টুর্নামেন্ট জরুরি।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট