রাবার ড্যাম যেন হালদার ‘গলার কাঁটা’। হালদার রুই জাতীয় মাছের প্রজননের ক্ষেত্রে পদে পদে সমস্যা তৈরি করছে এ রাবার ড্যাম। চাষাবাদের সুবিধার্থে ভূজপুর ও হারুয়ালছড়ি রাবার ড্যাম দুইটি তৈরি হলেও প্রশাসনের যথাযথ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়ায় হুমকিতে পড়েছে রুই জাতীয় মাছের প্রজনন। প্রশাসনের সিদ্ধান্ত হচ্ছে -রাবার ড্যাম দুইটির উচ্চতা সাড়ে ৪ মিটার থেকে নামিয়ে আড়াই মিটার এবং ৩১ মার্চের মধ্যে নামিয়ে ফেলা। কিন্তু প্রশাসনের এসব সিদ্ধান্ত বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে।
প্রতিবছর শুষ্ক মওসুমে নভেম্বরের শেষের দিক থেকে এপ্রিল পর্যন্ত উজান থেকে নেমে আসা পানি এ দুইটি রাবার ড্যামে ধরে রেখে চাষাবাদ করে স্থানীয় কৃষকেরা। তাছাড়া স্থানীয় চা বাগানেও ব্যবহার হয় রাবার ড্যামের পানি। এ কারণে উজানের পানি হালদার ভাটি অঞ্চলে নামতে পারে না। তাতে নদীর স্্েরাত কম থাকায় বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত পানি জোয়ারে সময়ে কর্ণফুলী নদী হয়ে হালদার উপরের দিকে ওঠে আসে। এ অবস্থায় হালদার রুই জাতীয় মাছ (রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউশ) লবণ পানির আগ্রাসন সইতে না পেলে উজানের দিকে চলে যায়। তাতে একদিকে অসাধু শিকারির হাতে ধরা পড়ে মা মাছ, অপরদিকে রুই জাতীয় মাছের ডিম দেওয়ার আগ মুহূর্তে রাবার ড্যামগুলোর পানি ছেড়ে দেওয়ার কারণে প্রজননের সময়ে নতুন করে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ ড্যামে উপরের পানিতে আগে থেকে জমে থাকা বিপুল পরিমাণের বিভিন্ন রাসায়নিক বর্জ্য সরাসরি হালদার নিচে দিকে চলে আসে। তাতে বিষক্রিয়ায় মারা যায় রুই জাতীয় মা মাছ ও ডলফিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কৃষি জমিতে চাষাবাদে সেচ সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে হালদার উজানে ২০১১ সালে ফটিকছড়ি উপজেলার ভূজপুর থানার পূর্ব পাশে ডলু কৈয়াছড়া-আছিয়া চা বাগান সংলগ্ন এলাকায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে হালদা নদীর উপর এ রাবার ড্যাম তৈরি করে এলজিইডি। এটির দৈর্ঘ্য ৫৫ মিটার এবং উচ্চতা ৪ দশমিক ৫ মিটার। রাবার ড্যাম কর্তৃপক্ষের মতে, এ রাবার ড্যামের পানি দিয়ে ১১টি মৌজায় প্রায় ১০ হাজার একর কৃষি জমিতে বোরো চাষ হয়। এছাড়াও পার্শ্ববর্তী হালদা ভ্যালি, আছিয়া, খৈয়াছড়া চা বাগানসহ কয়েকটি বাগান কর্তৃপক্ষ এ রাবার ড্যাম থেকে পানি উত্তোলন করে। তাছাড়া প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১২ সালে হালদার উজানে ভূজপুর থানার হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের হারুয়ালছড়ি খালে নির্মিত হয় হারুয়ালছড়ি রাবার ড্যাম। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের (এলজিইডি) উদ্যোগে নির্মিত এ রাবার ড্যামের দৈর্ঘ্য ৩০ মিটার এবং উচ্চতা ৪ দশমিক ৫ মিটার। হালদা নদীর পানির অন্যতম উৎস হারুয়ালছড়ি খাল। স্থানীয়দের মতে, এ রাবার ড্যাম নির্মিত হওয়ায় পাশের বিভিন্ন এলাকাসহ হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০০ একর জমি বোরো আবাদের আওতায় এসেছে। এরআগে পাকিস্তান আমলে হালদার আরেক শাখা ধুুরুং খালে ফটিকছড়ি সদর এলাকায় কংক্রিট বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এই দুইটি রাবারড্যাম ও একটি কংক্রিট বাঁধের মাধ্যমে শুষ্ক মওসুমে উজানে পানি ধরে রাখার কারণে হুমকির মুখে পড়ে হালদা। পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর প্রজনন ছাড়াও জীববৈচিত্র্যও ধ্বংস হচ্ছে। এমনকি ২০১৬ সালে হালদায় ডিম দেয়নি রুই জাতীয় মা মাছ। অনেকটা একই অবস্থা দেখা গেছে ২০২৪ সালেও। ওইবছর হালদায় তুলনামূলক কম ডিম দিয়েছে রুই জাতীয় মা মাছ।
জানতে চাইলে ভূজপুর রাবার ড্যাম পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও ভূজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাহান চৌধুরী দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী রাবার ড্যামের উচ্চতা সাড়ে ৪ মিটার থেকে নামিয়ে আড়াই মিটারের নিচে রাখা হয়েছে। রাবার ড্যামের নিচে বর্তমানে পানি নামছে।’ তবে শাহজাহান চৌধুরীর বক্তব্যে একমত হতে পারেননি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া।
দৈনিক পূর্বকোণকে তিনি বলেন, ‘রাবার ড্যাম দুইটির সাড়ে ৪ মিটার উচ্চতায় নির্মাণ হলেও প্রশাসন থেকে এগুলোর উচ্চতা আড়াই মিটারের মধ্যে রাখার নির্দেশনা রয়েছে। একইসাথে ৩১ মার্চের মধ্যে ড্যামের উচ্চতা সম্পূর্ণ নামিয়ে ফেলার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু বরাবরই প্রশাসনের এসব নির্দেশনা উপেক্ষিত থাকার কারণে হালদার রুই জাতীয় মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। তাছাড়াও উজানের পানি রাবার ড্যামের মাধ্যমে ধরে রাখায় নদীতে সাগরের লবণ পানির আগ্রাসন হচ্ছে। তাতে বিশাল এই হালদার দুইপাড়ে কৃষি ও চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।’
বেসরকারি সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (আইডিএফ) নির্বাহী পরিচালক জহিরুল আলম দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘চাষাবাদের জন্য রাবার ড্যাম দুইটি নির্মিত হলেও এগুলো প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী যথাযথ ব্যবহার হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া হালদায় ডিম ছাড়ার সময়ে রাবার ড্যাম দুইটির পানি ছেড়ে দেওয়ার কারণে সেখানে জমে থাকা রাসায়নিক বর্জ্যে প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে।’
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অফিসার শ্রীবাস চন্দ্র চন্দ দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘হালদার প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি ও স্টিয়ারিং কমিটির সিদ্ধান্ত হলো রাবার ড্যাম দুইটির উচ্চতা আড়াই মিটারের মধ্যে রাখা এবং ৩১ মার্চের মধ্যে ড্যাম নামিয়ে ফেলা। কিন্তু সিদ্ধান্তগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে এসব সমস্যা হতো না।’
হালদা প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান দৈনিক পূর্বকোণকে বলেন, ‘রাবার ড্যাম দুইটি হালদার ‘গলার কাটা’। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সুশীল সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সকলের মতামতের ভিত্তিতে রাবার ড্যাম দুইটি অপসারণের সিদ্ধান্ত দিতে মৎস্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
পূর্বকোণ/পিআর