চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ২১ মে, ২০২৪

সর্বশেষ:

উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি ১ যুগেও

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধিস্থলে স্মৃতি কমপ্লেক্স গড়তে আর কত অপেক্ষা

মো. নিজাম উদ্দিন লাভলু, বুড়িঘাট (নানিয়ারচর) থেকে ফিরে

২০ এপ্রিল, ২০২৪ | ২:২৯ অপরাহ্ণ

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফের নামে স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা দীর্ঘ প্রায় এক যুগেও বাস্তবায়ন হয়নি। রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাটের দ্বীপভূমিতে অবস্থিত বীর শহীদের সমাধিস্থলে তার নামে এ কমপ্লেক্স তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০১২ সালে।

 

১৯৭১’র এই দিনে (২০ এপ্রিল) খাগড়াছড়ির মহালছড়ি ও রাঙামাটির নানিয়ারচর সীমান্ত এলাকায় কাপ্তাই লেকঘেরা এক দ্বীপভূমিতে পাকহানাদার বাহিনীর সাথে প্রচন্ড সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন তিনি। অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যুক্ত ইপিআর সদস্য অকুতোভয় বীরযোদ্ধা ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ সেদিন নিজে প্রাণ দিয়ে বহু সহযোদ্ধার জীবন বাঁচিয়েছিলেন।

 

দেশের স্বাধীনতায় তার আত্মদান ও সহযোদ্ধাদের প্রাণ বাঁচানোর অসাধারণ ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ  সরকার তাকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করে। দেশ স্বাধীনের দীর্ঘ ২৫ বছর পর ১৯৯৬ সালে নানিয়ারচর উপজেলার ৩নং বুড়িঘাট ইউনিয়নের নির্জন কমতলী দ্বীপে এ বীর শহীদের কবরের সন্ধান মেলে।

 

শহীদ মুন্সী আব্দুর রউফের মরদেহ কবরস্থকারী ভাঙ্গামুড়া গ্রামের বাসিন্দা দয়াল কৃষ্ণ চাকমা কবরটি চিহ্নিত করে দেন। ২০০৬ সালের ২৫ মার্চ তৎকালীন বিডিআরের (বর্তমান বিজিবি) রাঙামাটি সেক্টরের তত্ত্বাবধানে দ্বীপভূমিতে তার কবর পাকাকরণসহ রাইফেলের ভাস্কর্যসংবলিত স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। এরপর থেকে প্রতিদিন দেশের দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষ এ সূর্য্যসন্তানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং ওখানকার প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে তার সমাধিস্থলে ছুটে যান।

জানা যায়, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধিস্থলের উন্নয়ন ও এ সমাধি ঘিরে পর্যটনের অবারিত সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করে ২০১২ সালে ঐ দ্বীপভূমিতে ‘বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ কমপ্লেক্স’ নির্মাণের একটি বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়। কিন্তু এর এক যুগ পরও সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। অনুসন্ধানে পাওয়া প্রস্তাবিত কমপ্লেক্স তৈরির নকশায় দেখা যায়, তিনশতক আয়তনের ঐ দ্বীপের নিকটবর্তী অন্য দ্বীপের সাথে সংযুক্ত করে একাধিক ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ, ফুটজোনে ক্যাফেটরিয়া, রিসোর্ট, টয়লেট, দ্বীপে নৌযান ভিড়ানোর ঘাট তৈরি ইত্যাদি রয়েছে।

সমাধিস্থলের কেয়ারটেকার হিসেবে কর্মরত বিনয় চাকমা বলেন, ২০১৪ সালে তৎকালীন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বীরশ্রেষ্ঠ’র এ সমাধিস্থল পরিদর্শনে এসে ২০১২ সালের নেওয়া পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ঐসময় তিনি প্রস্তাবিত কমপ্লেক্স তৈরির পরিকল্পনায় আরও দুটি ঝুলন্ত সেতু, ইবাদতখানা নির্মাণ অন্তর্ভূক্ত করার নির্দেশ দেন।

বিনয় চাকমা বলেন, ১৯৯৬ সালে কবরের সন্ধান পাওয়ার পর ১৯৯৭ সাল থেকে তিনি এখানে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। সরকারের বিভিন্ন ঊর্ধতন কর্মকর্তা বীরশহীদের সমাধিতে আসেন শ্রদ্ধা জানাতে। কমপ্লেক্স তৈরির উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য তিনি সবার কাছে আবেদন-নিবেদন করেন। আশ্বাস দিয়ে গেলেও বাস্তবায়নের কোন কিছু এখনও দেখা যায়নি। তিনি বলেন, মাসিক ১০ হাজার টাকা বেতনে তিনি ও অপর একজন এখানে দায়িত্ব পালন করেন। এ বেতনে তাদের সংসার চলে না।

গত ১৬ এপ্রিল বীর শহীদের সমাধিস্থল সরেজমিনে পরিদর্শনকালে দেখা যায়, লেকে নৌযান ভিড়ানোর কোন ঘাট নেই। দ্বীপভূমির পাদদেশের চারপাশে ফেলা সিমেন্ট-কংক্রিটের ব্লকগুলোর ওপর দিয়ে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে দর্শনার্থীরা সমাধিস্থলে যেতে হয়। দ্বীপের চূড়ায় শহীদের কবরের চারপাশে চলাচলের জন্য তৈরি করা ইস্পাতের পাতের সরু পথটি নড়বড়ে হয়ে গেছে। রোদের তাপে ইস্পাতের পাত প্রচন্ড গরম হয়ে যাওয়ার কারণে খালি পায়ে হাঁটা যায় না।

সমাধির অদূরে টয়লেট থাকলেও পানি না থাকায় ব্যবহার করা যায় না। দর্শনার্থীদের জন্য নামাজের কোন ব্যবস্থা নেই। এছাড়া পানি সরবরাহ ব্যবস্থা না থাকায় কবর জেয়ারতের জন্য ঝুঁকি নিয়ে নিচে লেকে নেমে ওজু করতে হয়। রোদ-বৃষ্টিতে নিরাপদ অবস্থান বা বিশ্রামের জন্য কোন ছাউনি তৈরি করা হয়নি। কেয়ারটেকার বিনয় চাকমা জানান, রাঙামাটি সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার, নানিয়ারচর উপজেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার ও বুড়িঘাট বাজার থেকে ৫-৬ কিলোমিটার জলপথ পাড়ি দিয়ে স্পিডবোট, ইঞ্জিনবোট বা নৌকা নিয়ে দর্শনার্থীরা সমাধিস্থলে আসেন।

চট্টগ্রাম থেকে সপরিবারে ঘুরতে আসা পর্যটক নাহিদুজ্জামান বলেন, দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী একজন বীরশ্রেষ্ঠ’র প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এবং এখানকার নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে তারা এসেছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় সুবিধা না থাকায় বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিয়ে এসে তারা বেশ ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।

এদিকে, নানিয়ারচর উপজেলা সদরের সাথে দেশের সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের জন্য চেঙ্গী নদীর ওপর ২০২২ সালে ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৫শ মিটার দীর্ঘ সেতুটির নামকরণ ‘বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ’ করার দাবিও বাস্তবায়ন হয়নি। নানিয়ারচর প্রেসক্লাবের সভাপতি মেহেদি ইমাম বলেন, এ দাবিতে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচিও পালিত হয়েছিল। কিন্তু তা পূরণ হলো না।

অন্যদিকে, নানিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুল এহসান খাঁন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধিস্থলে তার নামে কমপ্লেক্স তৈরির পরিকল্পনার বিষয়ে বলেন, আমি এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবো।

 

তিনি বলেন, এ সমাধিস্থল ঘিরে পর্যটনের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মহোদয়ও বীরশ্রেষ্ঠ শহীদের সমাধিস্থলের ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক। বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের নামে নানিয়ারচর সেতুর নামকরণের দাবির বিষয়েও খতিয়ে দেখবেন বলে তিনি জানান।

পূর্বকোণ/এসএ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট