চট্টগ্রাম বুধবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

উপকূলের ‘জীর্ণশীর্ণ’ বিদ্যালয় থেকে দুই বিসিএস ক্যাডার

ইমরান বিন ছবুর

৩ জানুয়ারি, ২০২৪ | ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ

বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেষে গড়ে ওঠা আনোয়ারার গহিরা গ্রামের একমাত্র উচ্চ বিদ্যালয় ‘উপকূলীয় আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়’। গত মঙ্গলবার থেকেই আনোয়ারাজুড়ে চলছে ‘জীর্ণশীর্ণ’ এ বিদ্যালয় বন্দনা। এর বড় কারণ ওইদিন প্রকাশিত ৪৩তম বিসিএস পরীক্ষার ফলে এ বিদ্যালয়ের দুই কৃতি শিক্ষার্থী একসঙ্গে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তাদের একজন নুরুল আবছার সবুজ। তিনি প্রশাসন ক্যাডারে মেধা তালিকায় ৩৩তম হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। অন্যজন মেহেদী হাসান আমজাদ। তিনি পুলিশ ক্যাডারে মেধা তালিকায় ১৬তম হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। প্রতিষ্ঠার ৬২ বছর পর ২০২০ সালে এ স্কুলের প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন সজীব তালুকদার। তিনি ৩৮তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পেয়ে এখন সাতক্ষীরায় সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব পালন করছেন। চাকরি প্রার্থীদের কাছে সোনার হরিণ হয়ে ওঠা বিসিএসে এবার সজীবের পথেই হাঁটলেন সবুজ ও মেহেদী। নুরুল আবছার সবুজ বাংলাদেশ মেরিন একাডেমীতে ৪৯তম ব্যাচের ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করে দুই বছর মেয়াদি ‘প্রি-সী ট্রেনিং’ শেষ করেন। ট্রেনিং শেষে সমুদ্রগামী মার্সেন্ট জাহাজে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে ১৩ মাস চাকরি করেন। এরপর ‘সার্টিফিকেট অব কমপিটেন্সি’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করেন। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ^বিদ্যালয় থেকে মেরিটাইম সায়েন্স নিয়ে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন সবুজ।

 

সবুজ বলেন, সার্টিফিকেট অব কম্পিটেন্সি তথা মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পর আমি ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে জাহাজে যোগদানের উদ্দেশ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সিভি জমা দেই। চাকরির অফার আসতে দেরি হচ্ছিল দেখে তখন আমার বড় ভাই আবদুল জব্বার ও সজীব ভাইয়ার পরামর্শে বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। ভাইয়া বলেছিলেন ৪১তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পাস করলে রিটেন পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সামনে এগুতে। আর পাস না করলে জাহাজের চাকরিতে যোগদান করতে। তিনি আরও বলেন, বিসিএস প্রিলিমিনারি পাস করার পর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান থেকে ২-৩ হাজার ডলারে চাকরির অফার আসে। মনে মনে রিটেনের পর ভাইভা শেষ করে জাহাজে যোগদানের পরিকল্পনা করি। ততদিনে আবার ৪৩তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পাস করে রিটেন প্রস্তুতিতে ঢুকে পড়ি। আল্লাহর রহমতে ৪৩তম বিসিএসে এসে কাক্সিক্ষত প্রশাসন ক্যাডার পাওয়ায় জাহাজে যোগদান করা হচ্ছে না আর।

 

অন্যদিকে, মেহেদী হাসান আমজাদ বটতলীর শাহ মোহছেন আউলিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং আনোয়ারা সরকারি কলেজের ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর সরকারি কমার্স কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি।

জানতে চাইলে মেহেদী হাসান আমজাদ বলেন, অনার্স শেষ করে কী করবো তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম। আমাদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে বাবা কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তাই বাবাকে কীভাবে আর্থিক সাপোর্ট দেয়া যায় সেটাও ভাবতে হচ্ছে। এরইমধ্যে একদিন টিউশন থেকে ফেরার পথে সজীব তালুকদার ভাইয়ের সাথে দেখা। ভাইয়ের সাথে পথেই দীর্ঘক্ষণ কথা হয়। তিনি সময় নষ্ট না করে বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেন।

 

তিনি বলেন, ওইদিন টিউশন থেকে ফেরার পথে বিসিএস’র প্রস্তুতির জন্য একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হতে যাই। ওই সময় আমার কাছে ছিল চার হাজার টাকা। কিন্তু কোচিংয়ের ভর্তি ফি ছিল ১২ হাজার টাকা। তাৎক্ষণিক আমার এক স্কুলবন্ধু থেকে আট হাজার টাকা ধার নিয়ে কোচিংয়ে ভর্তি হই। সেই থেকে সজীব ভাইয়ের পরামর্শে প্রস্তুতি নিতে থাকি। রেজাল্ট পেয়ে প্রথম কলটি তাকেই দিয়েছিলাম।

 

আমজাদ ও সবুজের ‘আইডল’ হয়ে ওঠা সজীব তালুকদার বলেন, আমার বিদ্যালয় বা এলাকার কোন ছোট ভাই পড়াশোনা কিংবা চাকরির বিষয়ে নক করলে যতই ব্যস্ত থাকি না কেন, আমি রেসপন্স করার চেষ্টা করি। তবে মেহেদী ও সবুজের মেধা, পরিশ্রম ও চেষ্টা অন্যদের চেয়ে বেশি ছিল। তারা পড়াশোনা থেকে শুরু করে ক্যারিয়ার বিষয়ক সবকিছু নিয়ে আমার সাথে যোগাযোগ করতো। আমিও তাদের নিয়ে খুব আশাবাদী ছিলাম। আশা করি সিভিল সার্ভিসে জয়েন করে তারা শুধু আনোয়ারা নয়, পুরো দেশের গর্ব হয়ে উঠবে।

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট