চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪

যুদ্ধের শেষ দিন ৩৭৫ জন নির্যাতিত নারীকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে উদ্ধার করি

যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ হোসেন

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড

২ ডিসেম্বর, ২০২৩ | ১:২২ অপরাহ্ণ

১৬ ডিসেম্বর নিজ এলাকা হানাদার মুক্ত করে আমরা যখন অস্ত্র জমা দেবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি তৎকালীন সীতাকুণ্ডে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা এম.আর ছিদ্দিকী এসে বলেন, কাস্টমস এক্সাইজ এন্ড ভ্যাট স্টেশনে (বর্তমানে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে) পাকবাহিনীর অত্যাচারের শিকার বেশ কিছু নারী আটক আছে। তাদেরকে উদ্ধার করতে হবে। এই কথা শোনা মাত্র নিজের এস.এল.আর অস্ত্রটি রেখে একটি বেনেট নিয়ে এম. আর ছিদ্দিকীর নেতৃত্বে বীর মুক্তিযোদ্ধা ইউসুফ সালাউদ্দিনসহ সেখানে যাই। দেখতে পাই শত শত নির্যাতিত নারীকে বেঁধে রাখা হয়েছে। তাদের কারো শরীরে ছেঁড়া বস্ত্র, কারো শরীর একেবারেই বস্ত্রহীন। পরে এম.আর ছিদ্দিকীর নির্দেশ মতো চট্টগ্রামের বক্সিরহাটের আওয়ামীলীগ নেতা নারায়ণ দত্তের দত্ত বস্ত্রালয় ও আফগান স্টোর থেকে কাপড় কিনে নিয়ে ৩৭৫ জন নারীকে সেই কাপড় পরিয়ে আমরা উদ্ধার করি। এরপর চট্টগ্রামের ৩০ জন নারীকে তাদের পরিবার নিয়ে যায়। অন্যদের ঢাকায় পিজি হাসপাতালে পাঠানো হলে ৬ জন মারা যান। এছাড়া সুস্থ হয়ে ওঠা অন্যদের নিয়ে যাওয়া হয় সংসদ ভবন সংলগ্ন একটি বাড়িতে (বীরাঙ্গনা হাউস)। পরবর্তীতে ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরলে বীরাঙ্গনা হাউসে গিয়ে তাদের জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলেন, তোমরাই তো দেশ স্বাধীন করেছ। তোমরা আমারই সন্তান। তিনি তাদের প্রত্যেককে বিয়ে দেন এবং স্বামীদের সরকারি চাকুরি দেন। যা একটি অনন্য উদাহরণ বিশ্বের জন্য।

 

সীতাকুণ্ডের যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আলতাফ হোসেন (৮০) মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণে এ তথ্য জানান। তিনি ভাটিয়ারীর ইউনিয়নের বাজারপাড়ার মৃত আজিজুর রহমানের পুত্র। তিনি বলন, ১৯৬৮ সালে ডিগ্রি পাস করি । রাজনীতিতে জড়িয়ে যাই তারও আগে। এই ধারাবাহিকতায় ’৬৯-এ গণআন্দোলনে সক্রিয় ছিলাম। পরে জাতির পিতার আহ্বানে যুদ্ধে অংশ নেবার লক্ষে প্রশিক্ষণ নিতে তিনি ফেনী হয়ে ভারতের ত্রিপুুরার হরিণা ক্যাম্পে যাই। সেখানে এম.এ আজিজ ব্যারাকে দেড় মাস গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে দেশে এসে  কমান্ডার ইসমাইলের নেতৃত্বে যুদ্ধ শুরু করি। ’৭১-এর আগস্টের দিকে এখানে কিছু রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ করছিলেন। আলতাফ ও তার সঙ্গীরা তাদের উপর নজরদারি রেখে একে একে তিনজন রাজাকার সন্দ্বীপের হানিফ ও মহসিন, হাতিয়া থেকে আসা রাজাকার মোজাম্মেলকে পৃথক পৃথক সময়ে আটক করে স্থানীয় জেলে ধ্রুব জলদাশের নৌকা যোগে সাগরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা শেষে ফেলে দেন। এরও পরে মাদামবিবির হাটের হাসেম রাজাকারকে আটক ও ভাটিয়ারীর এতিম আলীর রাইফেল কেড়ে নিয়ে তাকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেন। আগস্টের শেষ দিকে মেজর রফিকের নেতৃত্বে তারা চলে যাই ফেনীর জোড়া খেজুর গাছ এলাকায়। সেখানে পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হলে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল শহীদ হন আর আমি পায়ে সেলিংয়ের আঘাতপ্রাপ্ত হই। বীর মুক্তিযোদ্ধা আলতাফ আরো বলেন, সবচেয়ে বড় আঘাত পেলাম ১৯৭৫-এ জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করলে। সেদিন তিনিসহ ভাটিয়ারীর সুলতান আহমেদ, মুসা আহমেদ এবং তার মুক্তিযোদ্ধা দুই ভাই আবুল কাসেম ও আবুল কালাম গায়েবানা জানাজা পড়েন। এর ফলস্বরূপ এক মাস পর তাকে জেলে যেতে হয়। তিন মাস জেলে আটকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। পরে মুক্তিযুদ্ধে পরিচিত এক মেজর তাকে মুক্ত করেন। আলতাফ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বিয়েতে আমি স্বেচ্চাসেবকের কাজ করেছিলাম। কিন্তু আফসোস হয়, নেত্রী প্রধানমন্ত্রী হবার পর একবারও তার সাথে দেখা করতে পারিনি। নেত্রী যদি কোনদিন দেখা করার সুযোগ দেন ধন্য হতাম। আর প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটাই চাওয়া ‘এখনো দেশে রাজাকারদের আস্ফালন আছে, এসব যেন তিনি বন্ধ করেন। আর তা হলেই তাদের স্বপ্ন পূরণ হবে।’

পূর্বকোণ/পিআর 

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট