চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২৩ মে, ২০২৪

সর্বশেষ:

ঝরনায় গিয়ে প্রতিবছরই কি প্রাণ দিতে হবে পর্যটকদের?

৫ জুলাই, ২০২৩ | ৩:০৬ অপরাহ্ণ

ঝরনায় আর কত প্রাণ দিতে হবে পর্যটকদের? সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই রেঞ্জে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে একাধিক ঝরনা। এর মাঝে নয়স্তর বিশিষ্ট খৈইয়াছড়া, নাপিত্তাছড়া, সহস্রধারা, সুপ্তধারা, বাড়বকুণ্ড, মহামায়া, বাওয়াছরা, রূপসী ঝরনা, ঝরঝরি ঝরনা, বোয়ালিয়া ঝরনা, হরিণাকুণ্ড ঝরনা ও সোনাইছড়ি ঝরনা নজর কেড়েছে ভ্রমণ পিপাসুদের।

 

ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে ঝরনার জন্য সুপরিচিত এ জনপদ। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ঝরনা দেখাতে মিরসরাইয়ে আসেন পর্যটকরা। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পর্যটকদের ঢল নামে এসব ঝরনা।

 

সম্প্রতি পর্যটকদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে জোরারগঞ্জের সোনাপাহাড় এলাকার মেলখুম। প্রায়ই পর্যটকরা এখানে আটকা পড়ছেন ও হারিয়ে যাচ্ছেন। পথটি অত্যন্ত পিচ্ছিল, ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন, আছে গভীর খাদও। এখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। স্থানীয়রা এটিকে মৃত্যুকূপ হিসেবে অভিহিত করেছে। এর প্রবেশ পথের দু’পাশে অন্তত ২০০ ফুট উঁচু পাহাড় আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এটি মহাসড়ক থেকে বেশ দূরে হওয়ায় নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বনবিভাগ থেকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তবুও বন্ধ করা যাচ্ছে না পর্যটকদের যাতায়াত। চলতি বছরের ঈদুল ফিতরের ছুটিতে মেলখুমে বেড়াতে এসে দুই দফায় আটকা পড়েন ১৩ পর্যটক। পরে ৯৯৯ এ কল দিয়ে সহযোগিতা চাওয়া হলে জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ ৮ ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করে।

 

শুধু মেলখুম নয়, সীতাকুণ্ড ও মিরসরাইয়ের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত ঝরনাগুলো দেখতে গিয়ে প্রতি বছর প্রাণ হারাচ্ছে পর্যটকরা। বর্ষায় অসর্তকতার কারণে ঝরছে প্রাণ। সর্বশেষ গত এক ও দুই জুলাই সীতাকুণ্ডের পন্থিছিলা এলাকার ঝরঝরি ঝরনায় একজন এবং মিরসরাইয়ের রূপসী ঝরনায় দু’জনসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। গত কয়েক বছরে এভাবে ২০ জনের মত পর্যটক ঝরনায় পড়ে মারা গেছেন। এছাড়া ২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ফেনী থেকে আসা ফয়েজ আহমদ নামে এক পর্যটক পা পিছলে পড়ে নিহত হন। ২০১৯ সালের ১৫ আগস্ট রুপসী ঝরনায় চট্টগ্রাম থেকে আসা মেহেদী হাসান (২২) নামে এক প্রকৌশল ছাত্রের নির্মম মৃত্যু হয়। একই বছরের ২৬ জুলাই খৈয়াছড়া ঝরনায় ঢাকা থেকে আসা আবু আলী আল হোসাই মেমোরী (৩০) নামে এক প্রকৌশলী অসতর্কভাবে ছবি তুলতে গিয়ে পিছলে পড়ে মারা যান। ২৮ জুন আনোয়ার হোসেন নামে এক পর্যটক উপর থেকে পড়ে নিহত হন। ২ এপ্রিল উপর থেকে পড়ে মো. আশরাফ হোসেনের (৩০) মৃত্যু হয়। ১৭ জুলাই মহামায়া লেকে পানিতে ডুবে নিখোঁজ হয় শাহাদাত হোসেন (২২) নামে এক যুবক। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ১৯ জুলাই পানিতে খুঁজে শাহদাতকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। ২০১৮ সালের ১৫ আগস্ট নাপিত্তাছড়া ঝরনার কূপে ডুবে অনিমেষ দে (২৭) নামে এক পর্যটকের মৃত্যু হয়। একই বছরের ২৪ আগস্ট রূপসী ঝরনায় উপর থেকে পড়ে নিহত হন সাইফুল ইসলাম নামে এক যুবক। ২০১৭ সালের ১০ নভেম্বর নাপিত্তছড়া ঝরনায় সাঁতার কাটার সময় চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন মামুনের (২২) মৃত্যু হয়। এদের মাঝে অনেকেই সাঁতার জানেন না। এ কারণেই মৃত্যু ঘটেছে বেশি।

 

সবগুলো ঝরনায় কূপ রয়েছে। তবে রূপসী ঝরনার উপরের কূপটা আলাদা। কারণ এ কূপের উপরের সবগুলো ঝরনার পানি প্রবল বেগে এ কূপে এসে পড়ে। এর গভীরতাও অনেক । ভিতরে পাহাড়ি খাঁচকাটা মুখটা অনেকটা পানির কলসীর মত। অনেকেই এ কূপের গভীরতা ও আকার না জেনে লাফ দেয়। ফলে তারা পানির প্রবল বেগ ও নিচে খাঁচকাটা ভাজে আটকে যায়। পরে সেখান থেকে আর বের হতে পারে না। ফলে সাঁতার জানলেও কূপ থেকে উপরে উঠতে না পারার কারণে মৃত্যু হয়।

 

নাপিত্তাছড়ার উপরের ঝরনাতেও এমন একটি কূপ রয়েছে। সেখানেও একইভাবে অনেকের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও ঝরনার কাছে এসে সেলফি তুলতে গিয়ে পা পিছলে নিচে পড়ে কয়েকজন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। অনেকেই অতিবৃষ্টিতে ঝরনায় গা ভিজাতে যান। তাদের কেউ কেউ পাহাড়ি ঢলের মুখোমুখি পড়ে উপস্থিত বুদ্ধিতে বাঁচতে পারলেও অনেককে স্রোতে নিয়ে যায়।

 

ইজারাদার কিংবা ট্যুর গ্রুপগুলো এসব মৃত্যুর দায় এড়াতে পারেন না। ইজারাদাররা শুধু টিকেট কাউন্টার থেকে টিকেট দিলেও রাস্তাঘাটের তেমন কোন সংস্কার করে না। যেসব স্থান ঝুঁকিপূর্ণ কিংবা বিপদজনক, সেসব স্থানে সচেতনতা কিংবা নিষেধ করার জন্য ইজারাদারদের কোন লোক থাকে না। তাদের সদিচ্ছাই পারে মৃত্যুঝুঁকি এড়াতে। ট্যুর গাইডরাও তাদের দলের সদস্যদের একসাথে দলবদ্ধভাবে নেন না ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো এড়িয়ে যান না। ফলে গহীন জঙ্গলসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে এলোমেলোভাবে বেড়াতে গিয়ে ছিনতাইয়ের কবলে পড়ছেন অনেকেই। অনেকক্ষেত্রে দর্শনার্থীদের দায়িত্বহীনতা ও অসংযত আচরণই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।

পূর্বকোণ/এসি/এএইচ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট